প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা সাম্প্রদায়িক তত্পরতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণের পাশাপাশি যে কোনো পরিস্থিতি সহনশীলতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে দলের নেতা-কর্মীদের নির্দেশনা দিয়ে বলেছেন, ‘সবাইকে যে কোনো পরিস্থিতি সহনশীলতার সঙ্গেই মোকাবিলা করতে হয়, সেটাই করতে হবে। আর কে কী বলল না-বলল, সেগুলো শোনার থেকে আমরা কতটুকু দেশের জন্য করতে পারলাম, সেটিই আমাদের চিন্তায় থাকবে। তাহলেই আমরা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারব, সঠিক কাজ করতে পারব। সেভাবেই আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’
মহান বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে গতকাল বুধবার বিকালে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনাসভায় সভাপতির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত আলোচনাসভায় ভার্চুয়ালি অংশগ্রহণ করেন।
দেশবাসীকে মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনায় দৃঢ় থাকার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নিয়ে কথা ওঠানোর চেষ্টা হয়েছে। বাংলাদেশ অসাম্প্রদায়িক চেতনার দেশ। এই দেশের মাটিতে ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবাই সমান অধিকার নিয়ে বসবাস করবে। মনে রাখতে হবে, সবাই এক হয়ে মুক্তিযুদ্ধে রক্ত ঢেলে দিয়ে এদেশ স্বাধীন করেছে। যার যা ধর্ম তা পালনের স্বাধীনতা সবারই থাকবে। আমরা সেই চেতনায় বিশ্বাস করি এবং ইসলাম আমাদের সেই শিক্ষাই দিয়ে থাকে।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একটা কথা বলব, এই মাটিতে হিন্দু, মুসলমান, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধসহ সব ধর্ম; অর্থাত্ আমরা মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ আছি বলে অন্য ধর্মের মানুষকে অবহেলার চোখে দেখব তা নয়। হজরত মোহাম্মদ (স.)ও আমাদের সেই শিক্ষাই দিয়ে গেছেন।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘১৯৭১ সালের মহান বিজয়ের প্রাক্কালে আমাদের বুদ্ধিজীবীদের হত্যার ষড়যন্ত্র হয়েছিল; যাতে বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য জ্ঞানী-গুণী কেউ না থাকে। ঠিক যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বিশেষ করে ৮ ও ৯ ডিসেম্বর ব্যাপকভাবে বুদ্ধিজীবী হত্যা চলে এবং আমরা ১৪ ডিসেম্বর দিনটিকে শহিদ বুদ্ধিজীবী দিবস হিসেবে পালন করি।’ নিজে একজন স্বজনহারা, তাই স্বজনহারার বেদনা তাকে স্পর্শ করে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সে সময় অনেকে তাদের পরিজনের লাশও পাননি। আবার পঁচাত্তরে জাতির পিতাকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যার পর আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগসহ সংগঠনের বহু নেতা-কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে, যাদের লাশও পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, ‘এই নির্যাতন তো চলছে। অগ্নিসন্ত্রাস থেকে শুরু করে নানাভাবে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস সবকিছু আমরা দেখেছি।’ তিনি বলেন, যে নাম ’৭৫-এর পরে মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছিল, সেখানে আজ ইউনেস্কো ঘোষণা দিয়েছে—জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে অর্থনীতির ক্ষেত্রে যারা অবদান রাখতে সমর্থ হবেন, তাদের আন্তর্জাতিক পুরস্কার দেওয়া হবে। বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, ‘এটা মুজিব শতবর্ষে সমগ্র বাঙালি জাতির জন্য বড় একটি উপহার বলে আমি মনে করি।’ তিনি এ সময় কোভিড-১৯ বিষয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি আওয়ামী লীগকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করতে দলের নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান। শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি সবাইকে অনুরোধ করব আমাদের সংগঠনটাকে শক্তিশালী করতে হবে। জাতির পিতার আদর্শকে মানুষের কাছে নিয়ে যেতে হবে।’
বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, ‘আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদেরও বলব, প্রতিটি সময় আপনারা মানুষের পাশে দাঁড়ান। এই করোনা ভাইরাসের সময় আমাদের প্রতিটি সংগঠনের নেতাকর্মীরা মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। অনেকে মানুষের সেবা করতে গিয়ে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। অনেকে মৃত্যুবরণ করেছেন।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মানুষের সেবা করা আওয়ামী লীগের কাজ এবং সেই সেবা আমরা করে যাচ্ছি।’
আলোচনাসভায় সশরীরে উপস্থিত থাকতে না পারার বেদনার কথা তুলে ধরতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমার খুব কষ্ট লাগছে দুঃখ লাগছে যে সবাই ওখানে (আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে) বসে আছে। আর আমি দূরে জেলখানার মতো আরেকটা বন্দিশিবিরে (গণভবন) বসে আছি। এই বন্দিশিবির কত দিন? করোনা নামক এই বন্দিত্ব থেকে দেশ যেন দ্রুত মুক্তি পায়, আমরা আল্লাহর দরবারে সেই প্রার্থনাই করি।’ দ্রুতই করোনার ভ্যাকসিন বাংলাদেশে আসবে এমন আশাবাদ ব্যক্ত করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বের একই অবস্থা। কাজেই এখান থেকে কীভাবে মুক্তি আসবে সেটিই বড় কথা। তবে করোনার ভ্যাকসিন আনার ব্যবস্থা আমরা করে দিয়েছি। ইতিমধ্যে আমাদের চুক্তিও হয়ে গেছে। ডব্লিউএইচও এরই মধ্যে অনুমোদনও দিয়ে দিয়েছে। কাজেই আমরা মনে করি এবং আশা করি, খুব তাড়াতাড়িই আমরা ভ্যাকসিন পেয়ে যাব।’
অযথা ঘোরাঘুরি না করে স্বাস্থ্য সুরক্ষাবিধি মেনেই সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য দলের নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘শুধু দলের নেতাকর্মীই নয়, দেশবাসীকেও বলব স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে। সব থেকে বড় সুরক্ষা হচ্ছে সবার একটু মাস্ক পরে থাকা, হাতটা পরিষ্কার রাখা এবং দূরত্ব বজায় রাখা। ঘোরাঘুরিটা কম করা, বেশি ঘুরঘুর না করে যার যার জায়গায় থেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিয়ে সবাইকে চলতে হবে। এটা আমাদের সংগঠনের নেতাকর্মীদের জন্য যেমন দরকার, তেমনি দেশের মানুষের জন্যও দরকার।’
দীর্ঘ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় আসার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় আসে, তখন দেশের মানুষ উপলব্ধি করতে পারে যে সরকার হচ্ছে জনগণের সেবক। সরকার জনগণের সেবা করে, জনগণের মঙ্গল করতে পারে, দেশকে উন্নতির দিকে নিয়ে যেতে পারে। আজ আমরা দেশকে উন্নয়নের পথে নিয়ে যেতে পেরেছি। কেননা, আমরা জাতির পিতার আদর্শ নিয়ে কাজ করছি।’
দেশ ও দেশের মানুষের উন্নয়নে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ ও ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা দলীয় নেতাকর্মীদের সামনে তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজকে যে শিশুটি এই মুহূর্তে জন্মাবে, তার ভবিষ্যত্টা কী হবে, সেটা বিবেচনা করেই আমাদের কর্মসূচি আমরা নিয়েছি। এটা তো আওয়ামী লীগের দায়িত্ব, আওয়ামী লীগের কর্তব্য। জাতির পিতা আমাদের সেই শিক্ষা দিয়ে গেছেন।’ সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় চার নেতা, ৩০ লাখ শহিদ, সম্ভ্রম হারানো ২ লাখ মা-বোনের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। আলোচনাসভায় শেখ হাসিনা জাতির পিতার সংগ্রামমুখর জীবন তুলে ধরেন।
আলোচনাসভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী, ড. আব্দুর রাজ্জাক, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আব্দুর রহমান, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ও তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম প্রমুখ।
