রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশনের মূল ভবনের দোতলায় অবস্থিত নিয়ন্ত্রণ কক্ষে (রিলে রুম) গত বুধবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। যেহেতু ইহার পাশেই কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ এবং ইহা হইতে ডিজিটাল পদ্ধতিতে কমলাপুর হইতে ছাড়িয়া যাওয়া ও আসার ট্রেনগুলি নিয়ন্ত্রণ করা হয়, তাই সতর্কতাস্বরূপ কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ হইতে ডিজিটাল পদ্ধতিতে ট্রেন চলাচল ব্যবস্থা সাময়িকভাবে বন্ধ করিয়া দেওয়া হয়। ইহার কারণে বিমানবন্দর রেলস্টেশনে থামাইয়া দেওয়া হয় পঞ্চগড় হইতে ঢাকাগামী দ্রুতযান এক্সপ্রেসটি। কমলাপুর হইতে খুলনাগামী চিত্রা এক্সপ্রেসসহ চারটি ট্রেন ছাড়িয়া যায় বিলম্বে। কয়েক মিনিটের মধ্যে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসিয়া যাওয়ায় তেমন ক্ষয়ক্ষতি হয় নাই। তবে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর অফিসে আগুন লাগাটাই অপ্রত্যাশিত ও অনাকাঙ্খিত। এই সংক্রান্ত তদন্ত কমিটিকে বিষয়টির গভীরে গিয়া ইহার সঠিক কারণ নির্ণয়পূর্বক ভবিষ্যত্ করণীয় ঠিক করিতে হইবে।
উল্লেখ্য, একই দিনে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ফৌজদারহাট এলাকায় একটি তেলের ডিপোতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। মুহূর্তের মধ্যে এই আগুনের লেলিহান শিখা চারিদিকে ছড়াইয়া পড়িলে ১২টি পরিবারের ঘরবাড়ি পুড়িয়া ছাই হইয়া যায়। আবার গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর উত্তরার ৪ নং সেক্টরে রেললাইন সংলগ্ন বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটিলে অর্ধশতাধিক বাড়িঘর ও গ্যারেজ পুড়িয়া যায়। কেহ হতাহত না হইলেও ইহাতে আর্থিকভাবে ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হইয়াছে। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী গতকাল চট্টগ্রামের ভিক্টোরিয়া জুটমিলেও ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটিয়াছে। সাধারণত শীতকালে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বেশি থাকে। কারণ এই সময়ে বাতাসে আর্দ্রতা থাকে কম। আবার ঝুঁকিপূর্ণ বৈদ্যুতিক সংযোগ এবং গ্যাস বা বৈদ্যুতিক চুলা হইতেও অনেক সময় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হইতে পারে। দমকল বাহিনীর এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে প্রতি বত্সর যত অগ্নিকাণ্ড ঘটে, তাহার ৪০ হইতে ৫০ ভাগই বৈদ্যুতিক শটসার্কিট হইতে সৃষ্টি হয়। কারণ মূল সড়ক হইতে শুরু করিয়া বাসাবাড়ি বা আধুনিক শপিংমল—বেশিরভাগ স্থানেই বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা অনেকটাই নাজুক ও উপেক্ষিত। চিকিত্সকরাও বলিতেছেন, তাহারা যে পরিমাণ দগ্ধ রোগী পান, তাহার বড় অংশই বৈদ্যুতিক আগুনে পোড়া মানুষ। অনেক সময় প্রাকৃতিক কারণেও ঘটিতে পারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। আবার স্যাবোটাজ বা নাশকতার কারণেও অগ্নিকাণ্ড ঘটিতে পারে। কেহ কেহ ইন্সুরেন্সের অর্থ পাইতে বা ব্যাংক ঋণ মওকুফ করিবার অভিপ্রায়ে অপকৌশলের আশ্রয় লইয়া নিজ প্রতিষ্ঠানে নিজেরাই অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত ঘটায় বলিয়াও অভিযোগ রহিয়াছে।
বস্তুত অগ্নিকাণ্ডের কারণে দেশে ব্যাপক হারে ঘটিতেছে প্রাণ ও সম্পদহানির ঘটনা। এই ব্যাপারে তাই সবচাইতে বেশি দরকার গণসচেতনতা। কয়েক বত্সর পর পর বৈদ্যুতিক ও গ্যাসের লাইন এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা একান্ত প্রয়োজন। দরকার যত্রতত্র বৈদ্যুতিক তারের জঞ্জালের অবসানও। বিশেষ করিয়া নকল ও নিম্নমানের বৈদ্যুতিক তার ও সরঞ্জাম ব্যবহার বন্ধ করিতে হইবে। দিয়াশলাই, মোমবাতি, কয়েল, সিগারেট প্রভৃতি অগ্নি উদ্গারক বস্তু ব্যবহারে হইতে হইবে সজাগ ও সচেতন। সর্বোপরি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্ট প্রকাশ ও তাহার সুপারিশ বাস্তবায়নে আমাদের মনোনিবেশ করা উচিত।
