বন্যপ্রাণী ও অতিথি পাখি সংরক্ষণ

আপডেট : ১৭ ডিসেম্বর ২০২০, ২১:৪৬

সম্প্রতি সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার হরিপুর বাজারে সিলেট সিটি করপোরেশনের পাঁচ কাউন্সিলর পাখির মাংস দিয়ে ভূরিভোজ করার খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। পরে হরিপুর বাজারে ‘তারু মিয়া হোটেল’-এ ভ্রাম্যমাণ আদালত কর্তৃক অভিযান চালানো হলে সেখানে পাখি জবাই করে মাংস সংরক্ষিত করে রাখাসহ মাংসের তরকারি পাওয়া যায়। এই রেস্তোরাঁর পাশে নামবিহীন আরো একটি রেস্তোরাঁয় তল্লাশি করে ১৫টি পাখির মাংস পাওয়া গেলে ভ্রাম্যমাণ আদালত কর্তৃক দুটি রেস্তোরাঁ পরিচালনায় থাকা দুজন ব্যবসায়ীকে আটক করে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। আমাদের দেশে বন্যপ্রাণী ও পাখি শিকার, নিধন ও পাখির মাংস দিয়ে ভূরিভোজ করার নতুন কোনো বিষয় নয়। বরং পত্রিকার পাতা খুললেই চোখে পড়ে এ সংক্রান্ত খবরাখবর। সমাজের একশ্রেণির অসাধু, অর্থলোভী, অসচেতন ও ‘শিকারপ্রিয়’ লোকজন বন্যপ্রাণী ও পাখি শিকার এবং নিধনের ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত। এভাবে বন্যপ্রাণী ও পাখি শিকার এবং নিধনের ঘটনার সঙ্গে জড়িতরা শাস্তি না পাওয়ায় এবং এসব বিষয়ে জনসচেতনতার অভাবে দেশে বন্যপ্রাণী, পাখি শিকারসহ নিধনের ঘটনা বেড়েই চলেছে। অথচ, এসব বন্যপ্রাণী ও পাখি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অব্যাহতভাবে বন্যপ্রাণী ও পাখি শিকার এবং নিধনের ঘটনা ঘটতে থাকলে তা আমাদের পরিবেশের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং এর কুফল আমাদেরকেই ভোগ করতে হবে। নির্বিচারে বন্যপ্রাণী ও পাখি শিকারের ফলে দেশ থেকে দ্রুত বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী ও পাখি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। Red Book of The Threatened Animals : IUCN-Bangladesh নামক গ্রন্থে বলা হয়েছে, বিগত শতাব্দীতে এদেশের বনাঞ্চল থেকে এক ডজনেরও বেশি প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে গোর, বসগোর, বুনো মহিষ, হগ ডিয়ার, নেকড়ে, খয়েরি মাথার ঘুঘু, মার্শ ক্রোকোডাইল, লজ্জাবতী বানর, হায়েনা, গন্ধগোকুল ইত্যাদি। বাস্তবতা হচ্ছে, বন্যপ্রাণীর পাশাপাশি পাখি শিকার ও নিধনের ঘটনাও বর্তমানে নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এক হিসেবে দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রায় ৩৮৮ প্রজাতির দেশীয় পাখি রয়েছে। এছাড়াও শীতকালে প্রায় ২৪০ প্রজাতির অতিথি পাখি প্রতিবছর বাংলাদেশে আসে। কিন্তু নির্বিচারে বনভূমি উজাড়, জলাশয় ভরাট, পাখি শিকার এবং পরিবেশ দূষণের সঙ্গে সঙ্গে দেশীয় নানা জাতের পাখি একদিকে যেমন বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, তেমনি অন্যদিকে অতিথি পাখিদের আগমনও উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাচ্ছে। অথচ দেশীয় ও অতিথি পাখি আমাদের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে।

বন্যপ্রাণী ও অতিথি পাখি সংরক্ষণের জন্য দেশে আইন রয়েছে। যেমন :The Forest Act, 1927; ‘বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২’ প্রভৃতি। ২০১২ সালের এ আইন অনুযায়ী, কোনো পাখি বা পরিযায়ী পাখি বা মাংস ক্রয়-বিক্রয় অপরাধ এবং এতে ছয় মাসের কারাদণ্ড অথবা ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। এ আইনের তপশিল অনুযায়ী দেশের স্থানীয় বন্য পাখি ধলাবুক ডাহুক, বক ও বালিহাঁস নিষিদ্ধ পাখির অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এসব আইন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে বিশেষ কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি কিংবা বর্তমানেও পারছে না। ১৯৭৩ সালে রাষ্ট্রপতির আদেশের মাধ্যমে Bangladesh Wildlife (Preservation) Act পাশ করা হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৪ সালে এ আইনের কিছু সংশোধন করা হয়। এ আইনটির মাধ্যমে Bangladesh Wildlife Advisory Board গঠনসহ ন্যাশনাল পার্ক ঘোষণা ও প্রাণী অভয়ারণ্য সৃষ্টি করা হয়েছে। এ আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে রয়েছে নানা ধরনের শাস্তি ও জরিমানার ব্যবস্থা। ভ্রাম্যমাণ আদালত স্থাপন, সরকার কর্মকর্তাদের দায়দায়িত্বসহ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের বিভিন্ন বিধিবিধান বর্ণনা করা হয়েছে আইনটিতে। এ আইনের তপশিলগুলোতে এমন কিছু বন্যপ্রাণীর নাম উল্লে­খ আছে, যেগুলো শিকার করতে সরকারের পূর্বানুমতির প্রয়োজন হবে। আবার তপশিলে এমন কতিপয় প্রাণীর নাম আছে, যেগুলো কোনোভাবেই শিকার করা যাবে না। প্রথম তপশিলের দ্বিতীয় অংশে কতিপয় সরিসৃপ, পাখি ও স্তন্যপায়ী প্রাণীর নাম আছে, যেমন : কোলা ব্যাং, সবুজ ব্যাং, হলুদ পাহাড়ি কাছিম, পিয়ং হাঁস, রাঙামুরি, রাজহাঁস, জলার চা পক্ষী, ডুবুরি, বন্য শূকর ইত্যাদি শিকার করতে সরকারের পূর্বানুমতির প্রয়োজন হবে। কোনো বন্যপ্রাণীর বৃদ্ধি যদি সেই এলাকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় হুমকি হিসেবে দেখা দেয়, অথবা কোনো বন্যপ্রাণী যদি মানুষের জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ হয়, তাহলে সেই ধরনের প্রাণী হত্যা করা যাবে। আইনের দ্বিতীয় তপশিলে কতিপয় প্রাণীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে, যেগুলোর চামড়া আইনগত সার্টিফিকেট ছাড়া কোনোভাবেই দখলে রাখা বা দেওয়ালে টাঙিয়ে রাখা বেআইনি হবে। তৃতীয় তপশিলে ১৮ প্রজাতির সরিসৃপ, ৪৬১ প্রজাতির পাখি এবং ৬৭ প্রজাতীর স্তন্যপায়ী প্রাণীর নাম উল্লে­খ করা হয়েছে, যেগুলো সরকারিভাবে সংরক্ষণ করা হবে এবং এগুলো কোনোভাবেই শিকার, হত্যা বা ধরা যাবে না। এ প্রাণীগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বাঘ, চিতা, ভালুক, বনরুই, উল্লুক, লজ্জাবতী বানর, হাতি, হনুমান, চিত্রা হরিণ, মায়ামৃগ, কুমির, শকুন, বাজ, ধনেশ, মদন টাক, নীল কণ্ঠ, বেগুনি কবুতর, লাল ঘুঘু, ময়ূর, কোকিল ইত্যাদি। ১৫ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি পেশা বা ব্যবসা হিসেবে বন্যপ্রাণী ক্রয়-বিক্রয় করতে পারবে না, করলে ছয় মাসের জেলসহ জরিমানা হবে। আবার কোনো ব্যক্তি আগ্নেয়াস্ত্র কিংবা ফাঁদ বা অন্য কোনো উপায়ে বন্যপ্রাণী শিকার করলে তার এক থেকে দুই বছরের জেলসহ জরিমানা হবে। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, দেশে বন্যপ্রাণী ও পাখি সংরক্ষণের জন্য আইন ও বিধিবিধান থাকলেও সেগুলো জনবলসংকট, সচেতনতা, তদারকি ও জবাবদিহিতার অভাবে কার্যকর হচ্ছে না। ফলে দিনে দিনে দেশে বন্যপ্রাণী ও পাখি শিকার ও নিধনের ঘটনা বেড়েই চলেছে, যা পরিবেশের জন্য অশনিসংকেত। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য জনসচেতনতা বৃদ্ধিসহ জরুরি ভিত্তিতে বন্যপ্রাণী ও পাখি সংরক্ষণের জন্য আইনের যথাযথ প্রয়োগ জরুরি। এজন্য সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গণমাধ্যমসহ সকলকে দ্রুত এগিয়ে আসতে হবে, যেন বাংলার এই সবুজ প্রাকৃতিক ভূমি বন্যপ্রাণী ও অতিথি পাখিদের জন্য নিরাপদ অভয়াশ্রম হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।

n লেখক :সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; সহযোগী সদস্য,

সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব গ্লোবাল হিউম্যান মুভমেন্ট,

ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি (যুক্তরাজ্য)