বাঙালির সুকুমার বিত্ত তার সাহিত্য ও শিল্পকলা। ঐতিহ্যগতভাবে সে এই বিত্তের অধিকারী, কিন্তু শত শত বছর ধরে এই বিত্তের কোনো রাষ্ট্রীয় বেষ্টনী বাঙালির ছিল না। একাত্তরে পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে সেই বেষ্টনী বাঙালি নির্মাণ করে। বাঙালি হয় বাংলাদেশের মালিক। এই অভূতপূর্ব মালিকানার ফলে বাঙালির ঐতিহাসিক সম্ভাবনা হঠাত্ বিপুল হয়ে ওঠে। বাংলা কবিতা, বাংলা গান, বাংলা চিত্রকলা, বাংলা চলচ্চিত্র তথা বাংলা শিল্পকলার অবাধ চর্চার পথ খুলে যায়। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অস্তিত্বই হয়ে ওঠে বাংলা শিল্প-সাহিত্যের উচ্চগতির সোপান।
কিন্তু সোপান সজ্জিত থাকলেই সে সোপানে সকলে আরোহণ করবে, তা নয়। কারণ সোপানে আরোহণ শ্রমসাধ্য, সেখানে অলস উপবেশন বরং কষ্টহীন। সংস্কৃতিকর্মী তথা লেখকরা এই আরোহণের কাজ করে যান অনবরত। তাঁদের নিষ্ক্রিয়তা বা ঝিমুনিব্যাধী এলে তা আত্মঘাতী হয়। তাতে শুভবোধ ও চর্চা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়তে থাকে। সাহিত্য শিল্পকলা চর্চার ক্ষেত্রে এই নিষ্ক্রিয়তা এলে তা ভয়াবহ হতে পারে, বিশেষত বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রের জন্য, যেখানে রয়েছে শিল্পকলার দলবদ্ধ শত্রু। তখন কবিতাকে মনে হতে থাকে কিছু নিরর্থক ব্যর্থ পঙিক্তর সমাহার, সংগীতচর্চার বদলে সঙিনচর্চা আদরণীয় হয়ে ওঠে। মানুষের পাশবিক অধঃপতনকে তখন স্বাভাবিক মনে হয়; অস্বাভাবিক মনে হয় কবিতা, নাটক, চলচ্চিত্র এমনকি নিশ্চল ভাস্কর্যও। এভাবে অন্ধকার আদরণীয় হয়ে ওঠে, পঙ্কে নিমজ্জিত হতে থাকে পথ। একদিন রাষ্ট্রও চলে যায় পঙ্ক ও অন্ধকারের প্রাণিকুলের দখলে। বাংলাদেশেও এসব প্রাণীর প্রাদুর্ভাব হয়েছে। বাঙালি সাবধান আছে তো?
বাঙালির সাবধানতাও হতে হবে ধারাবাহিক, নইলে বাংলার নানা অলিন্দে ময়লা ও আঁধার জমবে। শুধু দেশের হানাদার আর দখলদার থাকে না, সাহিত্য-শিল্পকলারও রয়েছে হানাদার বাহিনী। সাহিত্যেও রয়েছে আলবদর-আলশামস, তাই সাহিত্যেও দরকার ‘সদা জাগ্রত মুক্তিবাহিনী’। নইলে ভাস্কর্য খুলে পড়তে থাকবে, তানপুরার তার ছিঁড়ে যাবে, বাউলের বাবরি চুল উধাও হবে। একদিন উধাও হতে হতে সংস্কৃতির হানাদাররা পৌঁছে যাবে মানচিত্র আর পতাকা অবধি। তারপর সেটি ছুড়ে ফেলে দেবে।
একাত্তরে বাঙালিকে জাতীয়তাবাদী হতে হয়েছিল বাংলাদেশকে সম্ভব করার জন্য, কিন্তু অনুভবে মননে সে চিরকালই মরমিবাদী। হিংস্র জাতীয়তাবাদী সে নয়, ছিলও না কখনো। সে মরমি জাতীয়তাবাদী, নিজ জাতির বিনম্র স্বাতন্ত্র্যটুকু তার অলংকার, অস্ত্র নয়। বহুজাতি বহুমত বহুপথকে সৃজন ও ধারণ তার সহজাত বৈশিষ্ট্য। কারণ তার নৃতত্ত্ব বহুজাতিক, বহুদেহিকও। আমাদের প্রাচীন পিতামহগণ পৃথিবীর সকল জাতকে নিজ শরীরের অংশ করেছিলেন, তাই আমরা বিমিশ মানব। মানব প্রজাতির সকল ভিত্তিজাতের সমসত্ত্ব মিশ্রণের নাম বাঙালি দেহ, আর সেই দেহে প্রাণ আর বাংলা ভাষা সংযুক্ত হয়ে উদ্ভব হয়েছে বাঙালি জাতির। ফলে বাঙালির রয়েছে বহুত্ববাদের জৈবিক ঐতিহ্য। এ জৈবিক বৈভব সকলের থাকে না।
অবশ্য নৃতত্ত আর ভাষা বাঙালির পরিশ্রমের অর্জন নয়, এ বরং প্রাকৃতিক ও সহজাত সৃজন। বাঙালির পরিশ্রমের অর্জন হলো তার সংস্কৃতি, শিল্পকলা ও বহুত্ববাদ; নিজ চেষ্টায় বাঙালি এ সুকুমার-সম্পদ সৃজন করেছে। আর সবচেয়ে চোখ ধাঁধানো সৃজন হলো রাষ্ট্র। এ রাষ্ট্র সৃজন করতে বাঙালি হঠাত্ পরিণত হয়েছিল সেনা-বাঙালিতে। কিন্তু মাত্র নয় মাসের সেনাশক্তিতে বাংলাদেশ ভূমিষ্ঠ হয়নি। হাজার বছরের বাঙালিত্বের সাধনার মধ্যে বাংলাদেশ সৃজন সম্ভব হয়ে উঠেছিল। ফলে বাংলাদেশের বিজয় মানে হাজার বছরের বাঙালিত্বের বিজয়।
বিজয় মানে সর্বজনীন কিছু নয়। কারণ বিজয় মানে দুইটি পক্ষের অস্তিত্ব; সেখানে একপক্ষ উল্লাস করে, অন্যপক্ষ মাথা নিচু করে বসে থাকে। কিন্তু সে নিচু মাথাও ক্রমে উঁচু হতে চেষ্টা করে। বিজয়ের যদি পরীক্ষিত প্রহরা না থাকে, পরাজিতরা সে ভঙ্গুর প্রহরা তছনছ করে দেয়। এই তছনছ ঠেকাতে গেলে রাষ্ট্রকে ও মানুষকে কিছু নিত্যকর্ম করে যেতে হয়। কারণ বিজয় কোনো শেষকৃত্য নয়, বরং নিত্যকৃত্য। বাংলাদেশের জন্য সেই নিত্যকৃত্য হলো বাঙালি সংস্কৃতির চর্চা। বাঙালির সংগীত, কবিতা, পালাপার্বণ, অসাম্প্রদায়িক অধ্যাত্মবোধ আর শিল্পকলা দিয়ে বাংলাদেশকে যদি সদা সজ্জিত না রাখা হয়, তাহলে অন্য কোনো নষ্ট সজ্জায় এদেশ সেজে উঠবে। মনে রাখতে হবে, বিজয় কোনো প্রাচীন পুঁথি নয় যে বছরে একবার পাঠ করলে বাঙালির পুণ্যি হবে। বিজয় নয় কোনো মৃত মমিও যে লোকে কৌতূহলী হয়ে মাঝে মাঝে তা দেখতে যাবে। বিজয়-কে হতে হয় সতত জীবন্ত ও চলত্শক্তিসম্পন্ন। বিজয় শুধু তর্পণের আর চারণের টেক্সট নয়, বিজয় হতে হয় অ্যাপ্লাইড; প্রতিদিনের সমবেত প্রার্থনার মতো বিজয়েরও কিছু নিত্য আচার রয়েছে। রাষ্ট্রের প্রতি, সংস্কৃতির প্রতি, সাহিত্য ও শিল্পকলার প্রতি, সর্বোপরি স্বাধীনতা ও ক্রমাগত মানবিক মুক্তির প্রতি প্রণত থাকাই এই নিত্য আচার। বিজয়ীকে যাজকও হতে হয়, বিজয়মন্ত্রে ঘরে ঘরে দীক্ষিত করতে হয় জাতিকে। বিজয়ের এ চলিষ্ণু দীক্ষায় বাংলাদেশ ও বাঙালি যত আলস্য ও সংকোচ দেখাবে, তত সক্রিয় ও নিঃসংকোচে এগিয়ে আসবে একাত্তরের পরাজিতরা।
ইতিহাসে বহুবার পাশবিক ও নষ্ট মানুষ শোভন মানুষের ওপর আধিপত্য করেছে। কারণ হায়েনারও বিজয়ী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকে, শকুন ও শূকরেরও থাকে রাজ্যপাটের খোয়াব। তাতে মানুষের সুউচ্চ মানবিক অগ্রগতি থেমে যায়, কিন্তু এসব থেমে যাওয়ার ঘটনাও বারবার ঘটে। ফলে একাত্তরের বিজয়ের স্মৃতিতে মগ্ন থাকাই মাত্র কাজ নয়, ক্রমাগত বাঙালিত্ব ও বাংলার সুকুমার বৈভব নিয়ে আমাদের প্রতিদিন যাপন করতে হবে। তাহলে বাংলাদেশকে প্রতিদিনই বিজয়ী দেখাবে, মুক্তিযুদ্ধের জয়ধ্বনির মতো দুর্দম শোনাবে বাঙালির প্রতিদিনের কথোপকথন।
একাত্তরে ‘জয় বাংলা’র রণদুন্দুভি তুলে বাঙালি মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী হয়েছিল। ‘জয় বাংলা’ তাই বাঙালির মুক্তিমন্ত্র। এ মন্ত্র যেন কখনো প্রাচীন না হয়, তাহলে বিজয়ও একটি প্রাচীন গল্প হয়ে যাবে। বাঙালির বিজয়স্পৃহা হোক ধারাবাহিক ও নৈমিত্তিক। প্রতি প্রত্যুষে বাঙালি জেগে উঠুক সাংস্কৃতিক বাঙালি হয়ে, প্রতি গোধূলিতে বাঙালি একবার তার মিশ্র নৃতত্ত্বের মহিমা কীর্তন করুক। নিশীথ শয্যায়ও বাঙালিত্বের মোহন স্বপ্ন ফুল্ল হয়ে উঠুক বিশ্বমানবিকতায়। এই মাত্র প্রার্থনা আজ।
