দুশমনকেই তাহারা অনুসরণ করিতেছেন

আপডেট : ১৮ ডিসেম্বর ২০২০, ২১:৪৪

পত্রিকা হইতে আমরা জানিতে পারিলাম, আমাদের দেশে ব্যবসায়-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অদক্ষ সরকারি প্রশাসন ও দুর্নীতিকে বড় সমস্যা বলিয়া মনে করিতেছে একটি মহল। কিন্তু সত্যই কি আমাদের সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা অদক্ষ? আমরা কি দেখিতে পাইতেছি না, কী অপূর্ব দক্ষতায় তাহাদের অনেকেই ভিতর-বাহির সামাল দিয়া নিজেদের আখের গুছাইতেছেন? উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কথাই ধরা যাউক। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, বরাদ্দকৃত উন্নয়নকাজের একটি বৃহত্ অংশ নানান রকম অনিয়ম আর ফাঁকফোকর দিয়া শেষ করা হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, রাস্তা তৈরির কাজ পাওয়া কোনো ঠিকাদার হয়তো রাস্তা তৈরি না করিয়া কেবল কয়েকটি কালভার্ট করিয়াই কাজের বিল তুলিয়া লইতেছেন। এই ক্ষেত্রে ঠিকাদারকে কালো তালিকাভুক্ত করিবার নিয়ম রহিয়াছে। কিন্তু সেই কথা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে স্মরণ করাইয়া দিলে তাহারা কিছুতেই ঐ ঠিকাদারকে কালো তালিকাভুক্ত করিতে চাহিবেন না। ইনিয়ে-বিনিয়ে সময়ক্ষেপণ করিবেন। কিন্তু কেন? ধরা যাউক, ট্রেনের একজন টিকিট পরিদর্শক ঘুষের বিনিময়ে প্রকৃত টিকিটের মূল্যের চাইতে কম টাকায় টিকিটবিহীন যাত্রীদের রেলভ্রমণের সুযোগ করিয়া দেন। ইহাতে সরকারের ক্ষতি হইলেও উভয় পক্ষই কিন্তু লাভবান হইতেছেন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি ব্রান্ডেই একবার বলিয়াছিলেন ‘সূর্যালোক হইতেছে সর্বোত্তম ছোঁয়াচে প্রতিরোধক।’ সূর্যালোক এই ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার পরিপূরক। অর্থাত্ স্বচ্ছতা হইতেছে দুর্নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিমাপক। কিন্তু আমাদের দেশে ব্যাপক অভাব রহিয়াছে স্বচ্ছতা নামের সূর্যালোকের। যেই কারণে দুর্নীতি এবং অনিয়ম এইখানে করোনা ভাইরাসের মতো বিস্তার লাভ করিতে পারে। এমন অনেক খবর আমরা দেখিয়াছি যে, ঠিকাদার কাজ ফেলিয়া লাপাত্তা হইয়া গিয়াছেন। দেখা গিয়াছে, যিনি কাজ পাইয়াছেন তিনি আরেক জনকে সাব কন্ট্রাক্ট দিয়াছেন। বহু ক্ষেত্রেই গড়ে ৫০ শতাংশেরও কম কাজ শেষ করিয়াও ঠিকাদাররা পুরা কাজের টাকা তুলিয়া লইয়া থাকেন! এমন অসংখ্য ঘটনা দেশ জুড়িয়া বত্সরের পর বত্সর ধরিয়া ঘটিয়া চলিতেছে। জানা যায়, সারা দেশে লক্ষাধিক ঠিকাদার রহিয়াছেন। তাহাদের সবাইকেই কমবেশি আন্ডারহ্যান্ড ডিলিং করিতে হয় বলিয়া অভিযোগ রহিয়াছে। অথচ ঠিকাদারদের কাজের মান দেখভাল করিবার জন্য প্রতিটি পর্যায়ে প্রকৌশলী রহিয়াছেন। প্রশ্ন হইল—ঠিকাদাররা যাহাতে মানসম্মত উপায়ে নির্মাণকাজ করেন, তাহার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কেন ঠিকমতো কাজ তদারক করেন না? ঠিকাদাররা কী করিয়া সাব-কন্ট্রাক্টে কাজ হস্তান্তর করিয়া দেন? অনিয়মের মহাস্তূপের বিপরীতে কয়জন ঠিকাদারকে এখন অবধি কালো তালিকাভুক্ত করা হইয়াছে? কেন কালো তালিকাভুক্ত করা হয় নাই?

আসলে, কথিত অসত্ রেলটিকিট চেকারের মতো এই ক্ষেত্রেও উভয় পক্ষই ব্যক্তিগত আখের গুছাইতে দক্ষ। সুতরাং তাহারা অদক্ষ—ইহা বলাটা সর্বৈবভাবে ভুল। তাহাই নহে কি? অথচ সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহারই উন্নত রাষ্ট্রগঠনের প্রথম শর্ত। আমাদের মতো সীমিত সম্পদের উন্নয়নশীল দেশ হিসাবে সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করাটাই দস্তুর। সামর্থ্যের বাহিরে গেলেই দুর্নীতির ডালপালা গজাইতে থাকে। আমরা দেখিয়াছি, ধার্মিক হইয়াও অনেকে এই ধরনের দুর্নীতি করিতে কুণ্ঠিত হন না। অথচ ইবাদতের সহিত আয়-উপার্জনের রহিয়াছে গভীর সম্পর্ক। এই ক্ষেত্রে পবিত্র কোরআন শরিফে সুরা বাকারা আয়াত ১৬৮-তে মহান আল্লাহ তাআলা বলিয়াছেন—‘হে মানবমণ্ডলী! পৃথিবীতে যাহা আছে তাহা হইতে হালাল ও পবিত্র বস্তুসামগ্রী গ্রহণ করো এবং শয়তানের অনুসরণ করিয়ো না। নিশ্চয় সে তোমাদের প্রকাশ্য দুশমন।’ দুঃখের ব্যাপার হইল, সেই প্রকাশ্য দুশমনকেই দক্ষতার সহিত অনুসরণ করিতেছেন অসংখ্য সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারী।