উন্নয়নের পথে অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে যাওয়া আমাদের এই দেশে মারাত্মক এক সামাজিক সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে ‘মাদক’। বিভিন্ন বয়সি নর-নারী, এমনকি শিশু-কিশোররা পর্যন্ত মাদকের করাল গ্রাসে পতিত হচ্ছে। তারা মাদক সেবন ও কারবারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে, যা ভবিষ্যতের জন্য মারাত্মক এক দুর্ভাবনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাদক নামের এই মারাত্মক সামাজিক ব্যাধি রুখতে না পারলে আমাদের সমস্ত সোনালি স্বপ্ন ধূলিসাত্ হয়ে যাবে। অগ্রযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। দেশ যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে শিক্ষায়, স্বাস্থ্যে এবং অর্থনীতিতে তা পিছিয়ে পড়বে। আমাদের স্বপ্ন মাখা সোনালি শিশু-কিশোরদের ভবিষ্যত্ অন্ধকার হয়ে যাবে।
কাজেই আমাদের শিশুদের মাদকমুক্ত পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ করে দিতে হবে। অন্যথায় আজকের এই মাদকাসক্ত শিশুরাই একদিন চিকিত্সা, শিক্ষা, প্রশাসন, আইন-আদালত, শৃঙ্খলাসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ সেক্টর তথা দেশ শাসনের দায়িত্ব গ্রহণ করবে। তখনকার সময়টা কতটা ভয়াবহ বা বিপজ্জনক হতে পারে সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।
খেলাধুলা, ক্রীড়া, সংস্কৃতিসহ নানা ধরনের ভেল্যুবেইজ কর্মসূচির সম্প্রসারণ ঘটাতে হবে। ছেলেমেয়েদের এসব কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করার সুযোগ ও পরিবেশ সৃষ্টি করে দিতে হবে। এ ধরনের কর্মসূচি ছেলেমেয়েদের মাদকের থাবা থেকে রক্ষা করার একটি উত্তম কৌশল। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদক প্রতিরোধের ওপর ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নিতে হবে।
এখনো সময় আছে। মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে আমাদের সবাইকে সম্মিলিতভাবে আন্তরিকতার সঙ্গে এগিয়ে আসা অতীব জরুরি হয়ে পড়েছে। কেবল পুলিশ কিংবা সরকারের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে মাদক প্রতিরোধে আমাদের পারিবারিকভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠার সময় এখনই। নিজ নিজ সন্তানের প্রতি নজরদারি বাড়িয়ে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ককে নিবিড় করে পারিবারিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা আবশ্যক হয়ে পড়েছে। শিশুদের প্রতি সদয় ও সহানভূতিশীল হওয়া বাঞ্ছনীয়। আবার তাদেরকে শাসন করারও প্রয়োজন রয়েছে। তবে খেয়াল রাখা জরুরি, সেই আদর যেন শিশুরা মাথায় না তোলে এবং শাসন যেন পরিণত না হয় দুঃশাসনে।
কারণ, নির্দয়তা ও দুঃশাসন শিশুদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা সৃষ্টি করে এবং সেই ক্ষোভ আর হতাশা থেকেই তারা একসময় মাদকসহ নানা ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। ফলে জীবন ও সমাজ হয়ে ওঠে আরো অস্থির। তাই মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রথম স্থানটি হওয়া উচিত প্রতিটি পরিবার। নেতৃত্ব দিতে হবে পরিবারের প্রধানকে। অভিভাবকদের নেতৃত্বে পরিবার থেকে শুরু হওয়া সেই আন্দোলনই একসময় সামাজিক আন্দোলনে রূপ নেবে। আর সেই সফল সামাজিক আন্দোলনের ফসল হিসেবে দৃশ্যমান হবে মাদকমুক্ত নির্মল সমাজ।
মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে নিজের ঘর নিজেকেই সামলাতে হবে। নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা ভুলে গিয়ে নিজেকে সামাজিক দায়বদ্ধতার আড়ালে রেখে অন্যকে দায়ী করা মোটেও যুক্তিযুক্ত নয় বলে আমি মনে করি। সমাজ ও দেশকে মাদকমুক্ত করা বা রাখা সমাজের প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব ও কর্তব্য। আমরা প্রত্যেকে যদি আমাদের নিজ নিজ পরিবারকে মাদকমুক্ত রাখতে পারি, তাহলেই আমরা মাদকমুক্ত নির্মল সমাজ তথা একটি সুন্দর দেশ আশা করতে পারি। তাই মুজিববর্ষের এই বিজয়ের মাসে মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ গঠন হোক আমাদের দৃঢ় অঙ্গীকার।
n লেখক :সমাজসেবক
