বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। এদেশে বর্তমানে সরাসরি কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত এমন লোকের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৩ শতাংশ। তাছাড়া দেশের অর্থনীতির মোট যে কয়টি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি রয়েছে তার মধ্যে কৃষি, শিল্প ও রেমিট্যান্সই প্রধান। শিল্পের মধ্যে যেমন ক্ষুদ্র, মাঝারি, ভারী প্রভৃতি বিভিন্ন ভাগ রয়েছে। তার মধ্যে তৈরি পোশাক খাত সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে কৃষি খাতের পুরোটাই কিন্তু গ্রামীণ অর্থনীতিভিত্তিক। সেখানে কৃষকদের মধ্যে ভূমিহীন, মাঝারি, ক্ষুদ্র, বড়—এমন অনেক ধরনের কৃষক রয়েছেন। আবার কৃষির রয়েছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ উপখাত। মত্স্য, প্রাণিসম্পদ এবং এসব খাতের ছোট-বড় অনেক খামারি। কিছু কিছু বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান ছাড়া বাদবাকি পুরোটা জুড়েই জড়িয়ে রয়েছে প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষজন।
কৃষি খাত বরাবরই একটু ব্যতিক্রম। কারণ শুধু এবারকার করোনাকালে নয় যে কোনো দুর্যোগ-দুর্বিপাকে কৃষক তার বাড়িতে বসে তার নিজের জমিতে কাজ করে চলেন। এবারও তা চলেছে। সেখানে যেহেতু এতটা জনসমাগম নেই, বাইরে থেকে খুব বেশি লোকজনকে যাতায়াত করতে হয় না। সেজন্য শহরের তুলনায় তাদের করোনা আক্রমণের স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেকটাই কম। তাছাড়া খোলা আকাশ-বাতাস, রৌদ্রোজ্জ্বল দিন, কাজেই কৃষকরা ন্যূনতম স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললেই ঝুঁকি কমে যায়। শুধু সাময়িক পরিবহন অসুবিধার জন্য তাদের উত্পাদিত পণ্য পরিবহনে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। কিন্তু ফসল উত্পাদনে তেমন কোনো প্রভাব পড়ছে না। তাছাড়া কৃষিবান্ধব শেখ হাসিনার সরকার কৃষি উপকরণ তথা সার, বীজ, সেচ জ্বালানি, কীটনাশক, উত্পাদিত শাকসবজি, ধান-চাল, তেল, পেঁয়াজ-রসুন, গম-ভুট্টা, আলু-পটোল ইত্যাদি সর্বদাই বিশেষ ব্যবস্থায় অর্থাত্ জরুরি পণ্য হিসেবে মর্যাদা দিয়ে পরিবহন করা অব্যাহত আছে।
খাদ্য ও কৃষি সংস্থাসহ (এফএও) বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ধারণা করছিল বিশ্ব জুড়ে করোনার কারণে যে সংকট সৃষ্টি হবে তার প্রাথমিক ধাক্কাটা আসবে খাদ্যনিরাপত্তার ওপর। আর সেটির কারণে বিশ্বে বিরাট খাদ্য ঘাটতিই শুধু নয়, দেখা দিতে পারে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। বিশ্ব ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এমন দুর্যোগের পরে খাদ্যাভাব ও দুর্ভিক্ষ নিত্যনৈমিত্তিক হিসেবে দেখা দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে দুর্ভিক্ষ সংঘটিত হয়েছিল, যা আমরা সবাই জানি। বস্তুত এ করোনার প্রাদুর্ভাবকে একটি যুদ্ধ হিসেবে বিবেচনা করে এটিতে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বলে মনে করছেন অনেকে। আর এ যুদ্ধের ফলে খাদ্যসংকট সৃষ্টি এবং দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় কৃষিই একমাত্র ভরসা। বাংলাদেশে বিগত মৌসুমে সাফল্য দেখিয়ে দিয়েছে। বর্তমানে কৃষির যে অবস্থা সেটিকে সঠিকভাবে এগিয়ে নিতে পারলে তা দিয়ে আমাদের দেশের দুর্ভিক্ষ তো বটেই, উপরন্তু আরো পার্শ্ববর্তী অনেক দেশকে সহযোগিতা করা যাবে।
আমাদের দেশটি সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা। কৃষির জন্য এর মাটি, জল, আবহাওয়া খুবই উপযোগী। সেজন্য দেশের স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু মনে করতেন এবং এখন তারই কন্যা কৃষকরত্ন শেখ হাসিনাও তাই মনে করেন। তিনি তার বিভিন্ন বক্তব্যে বলেছেন সে কথা। বাংলাদেশের এমন উর্বর মাটিই হতে পারে এ সময়ে আমাদের জন্য আশীর্বাদ। এটি উপলব্ধি করেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের দেশের চলমান বর্তমান কৃষি উত্পাদন অব্যাহত রাখতে তাদের কথা মাথায় রেখে বিভিন্ন কৃষিবান্ধব কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন। তার মধ্যে কৃষি প্রণোদনা উল্লেখযোগ্য। স্বল্পসুদে কৃষিঋণ, মত্স্য খামারি, হাঁস-মুরগি খামারি, গরু-ছাগল খামারি, দুগ্ধ খামারিসহ সবার জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
চলমান সবজি ফসল নিরাপদে উত্তোলন, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ, চলমান আমন ধান নিরাপদে মাড়াই, সংগ্রহ ও সংরক্ষণ সঠিকভাবে করতে পারলে সামনের সময়ে আমাদের দেশে খাদ্যঘাটতি কিংবা দুর্ভিক্ষ কোনোভাবেই স্পর্শ করতে পারবে না। এরপরে আসছে বোরো ধানের আবাদ, তার পরপরই আবারও আসবে আউশ ধানের আবাদ। তাছাড়া অন্যান্য মৌসুমি ফসল ও বারোমাসি শাকসবজি তো রয়েছেই।
সেজন্য তিনি যে কোনো মূল্যে কৃষি উত্পাদন অব্যাহত রাখার ওপর জোর দিয়েছেন। করোনা প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় তিনি যে প্রণোদনা দিয়েছেন, সেগুলো যাতে সরাসরি কৃষকের কাছে পৌঁছায়, সঠিকভাবে কাজে লাগে, সেদিকে সবাইকে নজর রাখতে হবে। গত বছর যে পরিমাণ ধান উত্পাদিত হয়েছিল, সেগুলো রাখার মতো জায়গাও সরকারি গুদামে তো ছিলই না, ছিল না কৃষকের গোলাতেও। তার পরও এবার গত বছরের তুলনায় আরো বেশি খাদ্যশস্য সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে সরকারিভাবে ক্রয় করা হচ্ছে, যাতে কৃষক বেশি উপকৃত হয়। এসব কারণেই আমাদের দেশ একসময়ের তলাবিহীন ঝুড়ির দেশ থেকে এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশে পরিণত হয়েছে। এখন বিভিন্ন ফল ও সবজির পাশাপাশি চালও রপ্তানি হয়ে থাকে।
এ দুর্যোগের মধ্যেও বাংলাদেশের কৃষিকে অব্যাহত রেখে দেশের অভ্যন্তরেই শুধু নয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশকেও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক কিছুই হয়তো আমরা উত্পাদন বা তৈরি করতে পারি না। কিন্তু আমরা কৃষিপণ্য সহজেই উত্পাদন করতে পারি। এটিকে আমরা কৃষিযুদ্ধ হিসেবে ঘোষণা করতে পারি। আর এর সম্মুখযোদ্ধা হলেন আমাদের গর্বিত কৃষক ভাই। অন্য সব যুদ্ধে যেভাবে আমরা বিজয় অর্জন করেছি, এ করোনাযুদ্ধেও আমরাই জয়ী হব—সেটিই প্রত্যাশা।
n লেখক :কৃষিবিদ ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
