করোনার মধ্যেও কৃষির জন্য দুটি সুসংবাদ পেল বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কৃষি বিষয়ক সংস্থা ইউএসডিএ-র মতে, চাল উত্পাদনে কয়েক বছরের সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ইন্দোনেশিয়াকে পেছনে ফেলে বিশ্বের তৃতীয় শীর্ষ তিনের মধ্যে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। অন্যদিকে বৈশ্বিক খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য বলছে, চলতি বছর বাংলাদেশে পালনকৃত গরুর সংখ্যা ২ কোটি ৪০ লাখেরও বেশি। শুধু তা-ই নয়, গবাদিপশু পালনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে দ্বাদশ অবস্থানে রয়েছে। কয়েক বছর আগেও প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমার থেকে আমদানি করা গরু দিয়েই মিটত মাংসের চাহিদা। প্রতি বছর কোরবানির সময় দেশ দুটি থেকে আমদানি হতো ২২ থেকে ২৫ লাখ গবাদিপশু। সেই নির্ভরতা কমিয়ে এখন স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে বাংলাদেশ।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্যানুযায়ী, সবজি ও মাছ উত্পাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে তৃতীয়। পাট উত্পাদনে বিশ্বে ভারতের অবস্থান শীর্ষে এবং বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয় হলেও রপ্তানিতে বিশ্বে প্রথম। ধান ও আলু উত্পাদনে যথাক্রমে চতুর্থ ও সপ্তম অবস্থানে রয়েছে। ছাগল উত্পাদনেও অবস্থান চতুর্থ, আমে সপ্তম এবং ফলে দশম। আর ছাগলের মাংস উত্পাদনে বিশ্বে পঞ্চম। সবচেয়ে আশ্চর্য বিষয় হচ্ছে, বিশ্বে যে পরিমাণ ইলিশ উত্পাদন হয়, তার ৮৬ শতাংশই হয় আমাদের দেশে। লন্ডনভিত্তিক ‘ইন্টারন্যাশনাল টি কমিটি’র প্রতিবেদন অনুসারে, চা উত্পাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান একধাপ এগিয়ে গত বছর নবম স্থানে উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে আলু, সবজি আর আম রফতানি হচ্ছে বিদেশে। ২০১৪ সালে আমরা চাল রপ্তানি করেছি। একই জমিতে বছরে একাধিক ফসল চাষের দিক থেকেও বাংলাদেশ এখন বিশ্বের জন্য উদাহরণ। বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও দুর্যোগসহিষ্ণু শস্যের জাত উদ্ভাবনেও শীর্ষে বাংলাদেশের নাম।
জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কৃষি উত্পাদন বাড়িয়ে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করায় বাংলাদেশের সাফল্যকে বিশ্বের জন্য উদাহরণ হিসেবে প্রচার করছে। সরকারের ডিমওয়ালা ইলিশ সংরক্ষণ এবং জাটকা নিধন নিষিদ্ধকরণ নীতির ফলে এখন ইলিশের উত্পাদন বহুল পরিমাণে বেড়েছে। চিংড়ি রফতানি থেকে প্রতি বছর আমাদের আয় ক্রমাগত বাড়ছে। এছাড়া পুষ্টির অন্যান্য উত্পাদন ডিম, দুধ ও মাংসের উত্পাদনও বেড়েছে। এতে বেড়েছে এসব পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবারের জনপ্রতি প্রাপ্যতা।
প্রতি বছরই লোকসংখ্যা বাড়ছে। সে তুলনায় কৃষিজমি কি বাড়ছে? উত্তর না। বরং প্রতি বছরই কৃষিজমি ১ শতাংশ হারে কমছে। তাছাড়া কৃষিজমিতে প্রতিদিনই কলকারখানা, নতুন রাস্তা, স্থাপনা তৈরি হচ্ছে। এছাড়া রয়েছে ঝড়-জলোচ্ছ্বাস-বন্যার সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা। এসব সামলাতে কৃষি কাহিল হওয়ার কথা। কিন্তু না, ক্ষণিক থেমে গেলেও মুহূর্তে আবার ঘুরে দাঁড়িয়ে কর্মবীর কৃষক কৃষিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আনছে বিস্ময়কর সাফল্য ও অভাবনীয় উন্নতি।
এখন কৃষি বিজয় নীরবে নয়, ঘটছে সরবে। প্রশ্ন হচ্ছে—এটা কী করে সম্ভব হয়েছে? উত্তর সহজ হলেও বাস্তবায়ন কিন্তু খুবই কঠিন। এর পেছনে রয়েছে সরকারের যুগোপযোগী পরিকল্পনা, পরিশ্রমী কৃষক এবং মেধাবী কৃষিবিজ্ঞানী ও সম্প্রসারণবিদদের যৌথ প্রয়াস। এছাড়া সময়ের বিবর্তনে এসেছে নতুন নতুন ফসল, প্রসারিত হচ্ছে নব নব প্রযুক্তি। আর এভাবেই প্রধান খাদ্যশস্যের উত্পাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশের তালিকায় উঠে এসেছে বাংলাদেশ।
পরিশেষে বলতে চাই, শুধু কৃষি উত্পাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিলেই চলবে না, কৃষিপণ্যের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে হবে। কৃষককে দিতে হবে ভর্তুকিসহ উন্নত সার ও বীজের নিশ্চয়তা। এজন্য প্রয়োজন কৃষিভিত্তিক শিল্পের ওপর জোর দেওয়া।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
