পাখপাখালি ও মানুষের মিলেমিশে বসবাস

আপডেট : ১৯ ডিসেম্বর ২০২০, ০০:১৯

নিকলী (কিশোরগঞ্জ) সংবাদদাতা

নিকলীর নয়াহাটি ও পুকুরপাড় এই দুই গ্রামের মধ্যে পশ্চিম কবরস্থান। সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত সেখানে থাকে শীতের অতিথি পাখির কলতান। গোধূলির রং ডানায় মেখে কলকাকলি করে নীড়ে ফেরে ঝাঁকে ঝাঁকে পানকৌড়ি ও বক। দিনের ক্লান্তি শেষে দল বেঁধে তারা ফেরে সেই পশ্চিম কবরস্থানে। দেখা গেছে, সন্ধ্যা থেকে ভোর অবধি গ্রাম দুটি পাখির কলতানে মুখর থাকে। মানুষ আর পাখপাখালির এমন মিলেমিশে বসবাস সচরাচর চোখে পড়ে না। নিজেদের কিছু অসুবিধা মেনে নিয়েও এলাকার লোকজন মিলে গড়ে তুলেছেন পাখিদের এই অভয়াশ্রম। নিকলীতে পাখিদের সুখের এই নীড় গড়ে উঠেছে এক যুগ আগে। এক সময় আর ১০টা গ্রামের মতোই দুই-একটা পাখি আসত এখানে। কিন্তু হঠাত্ পাখিদের মনে ধরে গেল ঐ জায়গাটি।

কথা হয় পুকুরপাড় গ্রামের মো. হাবিবুর রহমানের সঙ্গে। তিনি কবরস্থান ও মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক। তিনি জানান, দশ/বারো বছর আগে এই কবরস্থানের কয়েকটি কড়ইগাছে কিছু পানকৌড়ি ও সাদা বক এসে বসে। এরা সেই গাছে বাসা বানায়। সেই যে পাখিরা এল, আর গাছ ছেড়ে যায়নি। দিনে দিনে পাখির সংখ্যা বেড়েছে। এখন অবশ্য এখানে পাখির বৈচিত্র্যের অভাব নেই। পানকৌড়ি, সাদা বক ছাড়াও শামুকভাঙা, শালিক, ঘুঘু, দোয়েল, চড়ুই, টুনটুনি ছাড়াও অচেনা অনেক পাখি এখন আসে। তবে ছোট পাখিগুলোকে পাতার আড়ালে কোনোরকমে গা বাঁচিয়ে থাকতে হয়। কারণ, দাপট সেই পানকৌড়ি ও বকেরই। কবরস্থানের আটটি কড়ইগাছে পাখিদের স্থান সংকুলান হয় না। তাই আশপাশের বিভিন্ন বাড়ির আম, জাম, নারকেলগাছেও ছড়িয়ে পড়েছে পাখিরা। নয়াহাটি গ্রামের শাহাবউদ্দিন জানান, শুধু গাছে নয়, ঝড়-তুফান হলে পাখিগুলো বসতঘরে ঢুকে পড়ে। চৌকির ওপর-নিচও তারা দখল করে নেয়। তাড়িয়ে দিলে আবার ফিরে আসে। তখন এদের খাবারের ব্যবস্থা করতে হয়। এই বিপদের সময় পাখিগুলো এমন মায়াভরা চোখে তাকিয়ে থাকে, দেখলে কষ্ট লাগে। দামপাড়া কারার মাহতাব উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন জানান, নভেম্বর, ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে পাখি বেশি থাকে। নভেম্বর-ডিসেম্বরে শীত বেশি হয়। তখন বকের সংখ্যা বাড়তে থাকে।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, এখানে এত পাখি! না দেখলে বিশ্বাস করা মুশকিল। গ্রাম দুটি থেকে অল্প দূরেই হাওর। হাওরের জলাশয়গুলোতে প্রচুর মাছ পাওয়া যায়, তাই এখানে এত পাখির দেখা মেলে। এখানে কয়েক হাজার পাখি বাস করে। কেউ বিরক্ত না করায় পাখির সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। কবরস্থান ও মসজিদ কমিটির সভাপতি মো. আসমত আলী বলেন, এখানে পাখিকে কেউ অত্যাচার করলে বা শিকার করলে ৫০০ টাকা জরিমানা করা হবে বলে মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। নিকলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সামছুদ্দিন মুন্না বলেন, রাস্তার পাশের ঐ কবরস্থান ও গ্রাম দুটি দেখেছি। সেখানে রীতিমতো পাখির অভয়াশ্রম গড়ে উঠেছে। এতে এলাকার লোকজনের মধ্যে পাখির জন্য মমতার সৃষ্টি হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জনসচেতনতা গড়ে তুলতে এলাকায় পাখি শিকার নিষিদ্ধ ও দণ্ডনীয় অপরাধ—এই মর্মে একটি সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেওয়া হবে। পাখি শিকার প্রতিরোধে জনপ্রতিনিধিদের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।