রাজস্ব আদায়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নানামুখী পদক্ষেপ সত্ত্বেও লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে আদায়ের ব্যবধান ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। এনবিআরের সাময়িক হিসাব অনুযায়ী, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাস জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি প্রায় ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাস্তবতা বিবেচনায় না নিয়ে বিপুল রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়ায় ঘাটতি বেড়ে যাচ্ছে। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে স্বাভাবিক অর্থনৈতিক গতি থাকা সত্ত্বেও রাজস্ব আদায় বেড়েছে গড়ে ১০ দশমিক ২০ শতাংশ হারে। চলতি বছর করোনার প্রভাবে সার্বিকভাবে ব্যবসা ও শিল্পোত্পাদনে গতি নেই। ফলে স্বভাবতই রাজস্ব আদায়ে আগের বছরের মতো গতি নেই। সেই বিবেচনায় আদায়ে প্রবৃদ্ধি আরো কমে যাওয়াই স্বাভাবিক। অথচ এবার এনবিআরের রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৫১ শতাংশ!
এত বিশাল রাজস্ব আদায় করা বাস্তবে সম্ভব নয় বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। সেক্ষেত্রে চলতি বছরও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অন্তত ৮০ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি হতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর। ইত্তেফাককে তিনি বলেন, বাস্তবতা বিবেচনায় এবারের রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়নি। ফলে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আদায়ে বেশি ঘাটতি দেখা যাচ্ছে।
গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে এনবিআর রাজস্ব আদায় করেছিল ২ লাখ ১৮ হাজার ৪২০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের জন্য ৫১ শতাংশ বাড়িয়ে এনবিআরকে আদায় করতে হবে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা।
অবশ্য কর ফাঁকি বন্ধ এবং আদায় বাড়াতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে মাঠ পর্যায়ের রাজস্ব প্রশাসন। এছাড়া তত্পরতা বেড়েছে ভ্যাট ও শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের। কিন্তু তা সত্ত্বেও লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে পারছে না। গত পাঁচ মাসে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা। আদায় হয়েছে ৮৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। তবে সার্বিকভাবে পাঁচ মাসে আদায় বেড়েছে গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ১ দশমিক ২০ শতাংশ। গত বছরের এই সময়ে আদায় বেড়েছিল ৫ শতাংশ।
এদিকে গত কয়েক মাসে অর্থনীতিতে গতি ফিরতে শুরু করলেও করোনা ভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হওয়ায় ফের শঙ্কা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানিবাজার ইউরোপ ও আমেরিকার অনেক দেশেই ফের রপ্তানি কমতে শুরু করেছে। কমতির দিকে আমদানিও। অন্যদিকে শিল্পে বিনিয়োগও একেবারেই কম। আবার পরিস্থিতি বিবেচনায় অনেক খাতে কর ছাড় দিতে হয়েছে। সব মিলিয়ে আগামী মাসগুলোতে আদায়ে প্রত্যাশিত গতি থাকবে না বলে মনে করছেন খোদ রাজস্বসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও।
অথচ পরবর্তী সাত মাসে এনবিআরকে আদায় করতে হবে আরো ২ লাখ ৪৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। গত মাসগুলোতে গড়ে আদায় হয়েছে ১৭ হাজার ১০০ কোটি টাকা, অথচ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে এনবিআরকে প্রতি মাসে গড়ে আদায় করতে হবে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা। সর্বশেষ নভেম্বরে ২৫ হাজার ৯৫৯ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে ১৭ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময়ে আদায় হয়েছিল প্রায় সাড়ে ১৮ হাজার কোটি টাকা।
এনবিআরের সবেক সদস্য ড. সৈয়দ মো. আমিনুল করিম ইত্তেফাককে বলেন, যে লক্ষ্যমাত্রা এনবিআরকে দেওয়া হয়েছে, তা বর্তমান পরিস্থিতিতে তো নয়ই, স্বাভাবিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতেও আদায় করা সম্ভব নয়। তবে করোনার মধ্যেও এনবিআরের আদায়ে যে প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় এটিও ইতিবাচক, ভারসাম্যপূর্ণ। অন্যদিকে অর্থনীতিতে যতটুকু গতি ফিরেছে, তা অব্যাহত থাকলে বছর শেষে গত অর্থবছরের চেয়েও কিছুটা বাড়বে বলে মত দেন তিনি।
