ইসরাত জাহান চৈতী
‘হত্যা’ শব্দটা সবার কাছেই লোমহর্ষক একটি শব্দ। আর ‘গণপিটুনি’ শব্দটা যেন আরো বেশি হূদয়বিদারক। শব্দটা শুনলে শুরুতেই কল্পনায় আসে কাউকে অনেকগুলো মানুষ মিলে ক্রমাগত মারছে। নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে আছে মানুষটির নিথর দেহ। এই কল্পনা শুধু একজনের না, সমাজের বর্তমান পরিস্থিতিতে এই কল্পনা বাসা বেঁধেছে দেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিকের মনে। শুধু অন্যের কথায় প্রভাবিত হয়ে একজন মানুষকে আঘাত করতে করতে হত্যা করার মতো অমানবিক ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত আমাদের সমাজে। এই বিষয়টি যেন নিত্যদিনের ব্যাপার হয়ে যাচ্ছে। সমাজের অন্যান্য অপরাধের সঙ্গে নতুন মাত্রা যোগ করেছে পিটিয়ে হত্যার সংস্কৃতি। প্রায় প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে দোষী মানুষের পাশাপাশি নির্দোষ কিছু মানুষকেও। আর এ ধরনের ঘটনা বাড়ছে দিন কে দিন। আইন ও সালিশি কেন্দ্রের এক তথ্যমতে, বাংলাদেশে এ বছরের শুরু থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অন্তত ৩০ ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
বর্তমান সময়ে সমাজে চলতে হলে থাকতে হচ্ছে বাড়তি সতর্কতার সঙ্গে। কেননা, যে কোনো সাধারণ বিষয়ের জের ধরেই যে কেউ শিকার হতে পারে গণপিটুনির, যা বর্তমান সময়ে সমাজের নির্মমতার প্রতিচ্ছবি। একজন মানুষের অপরাধ যা-ই থাকুক না কেন তাকে জনসম্মুখে একদল লোক মিলে পিটিয়ে মেরে ফেলতে পারে না। অপরাধীর জন্য আইনের ব্যবস্থা আছে। তাকে আইনের আওতায় না এনে আইন নিজেদের হাতে তুলে একদল লোক মিলে পিটিয়ে হত্যা করে তথাকথিত দোষী ব্যক্তিকে; যা অন্যতম পাশবিক ও নির্মম একটি বিষয়।
কোনো ভিত্তিহীন অভিযোগের দায়ে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা বাংলাদেশে নতুন নয়। বহু আগে থেকেই দেশে ঘটে আসছে এই জঘন্য অপরাধ। ২০১১ সালের ১৭ জুলাই সাভারের আমিনবাজার এলাকায় ডাকাত সন্দেহে ছয় জন শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পিটিয়ে ‘হত্যা’ বিষয়টি সেসময় বেশ আলোচনায় আসে। এরপর এই অপরাধের মাত্রা কিছুটা কমলেও গত বছর পদ্মা সেতুতে মানুষের মাথা লাগবে—এমন গুজবকে কেন্দ্র করে হঠাত্ করেই বেড়ে যায় গণপিটুনির ঘটনা; যা জনমনে সংশয় তৈরি করছে প্রতিনিয়ত। এর পর থেকে এ রকম আরো অনেক ঘটনা ঘটছে হরহামেশাই।
বিবিসি বাংলার এক পরিসংখ্যান মতে, ২০১১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দেশে গণপিটুনির শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে প্রায় ৮০০ মানুষ। বর্তমান সময়ে কিছু আলোচিত পিটিয়ে হত্যার ঘটনা হলো—গত ১০ নভেম্বর রাজধানীর একটি মানসিক হাসপাতালে উশৃঙ্খল আচরণের দায়ে কয়েক জন হাসপাতাল কর্মী মিলে আনিসুল হক নামের একজন পুলিশ অফিসারকে পিটিয়ে মেরে ফেলেন।
এ বছরের অক্টোবর মাসে লালমনিরহাটে জুয়েল নামের একজন শিক্ষককে ধর্ম অবমাননার অপরাধে পিটিয়ে মেরে ফেলেও ক্ষান্ত হয়নি সাধারণ জনগণ, তাকে জনসম্মুখে পুড়িয়ে ফেলা হয়। অথচ তার বিরুদ্ধে পরে কোনো প্রমাণ মেলেনি।
এ ধরনের হত্যাকাণ্ড সামাজিক বিশৃঙ্খলা ও বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতার চিত্র তুলে ধরে। এসব হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের মানসিক বিকারগ্রস্থতারও প্রমাণ মেলে। সামাজিক শ্রেণিবৈষম্য, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অভাব, মাদকের ভয়াল থাবা, ক্ষমতা প্রদর্শনের মানসিকতা, দলীয় ক্ষমতার প্রয়োগ, পারিবারিক বন্ধনের ভঙ্গুর অবস্থা, নৈতিক মূল্যবোধের অভাব, ইত্যাদি কারণগুলো দায়ী পিটিয়ে হত্যার পেছনে। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে নিতে হবে এর বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ। তা না হলে জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকবে এই অপরাধ।
এই অপরাধ নির্মূলে সমাজ, পরিবার ও রাষ্ট্রকে কাজ করতে হবে সম্মিলিতভাবে। অন্যথায় আপনার আমার পরিবারের যে কেউ শিকার হতে পারে এই অপরাধের। এ ধরনের অপরাধের জন্য প্রয়োগ করতে হবে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। এর ফলে এই অপরাধ করার আগে বাকিরা চিন্তা করবে এর শাস্তির ভয়াবহতা সম্পর্কে। আশা করা যায়, এ বিষয়গুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে কমে আসবে সমাজের অপরাধের এই নতুন সংযোজন।
n লেখক :শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
