প্রশ্ন কঠিন অজুহাতে কেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর

আপডেট : ১৯ ডিসেম্বর ২০২০, ২৩:৫৭

বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের আইনজীবী তালিকাভুক্তির লিখিত পরীক্ষা চলাকালে রাজধানীর দুটি কেন্দ্রে পরীক্ষার্থীরাই হামলা ও ভাঙচুর চালিয়েছে। উচ্ছৃঙ্খল পরীক্ষার্থীরা ‘প্রশ্ন কঠিন’ হয়েছে অভিযোগ তুলে পরীক্ষা বর্জন করে অন্যদের ওপর হামলা চালায়। শনিবার সকাল ৯টা থেকে ঢাকার ৯টি কেন্দ্রে প্রায় ১৩ হাজার পরীক্ষার্থী এই পরীক্ষায় অংশ নেন। কিন্তু প্রশ্নপত্র হাতে পাওয়ার পর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে পরীক্ষার্থীদের একটি অংশ। অনেকে পরীক্ষা বর্জন করে কেন্দ্র থেকে বের হয়ে যান। এদের মধ্যে দুটি কেন্দ্রে একদল উচ্ছৃঙ্খল পরীক্ষার্থী অন্য পরীক্ষার্থীদের খাতা কেড়ে নিয়ে ছিঁড়ে ফেলে। এই ঘটনা ঘটেছে মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজ ও পুরান ঢাকার মহানগর মহিলা কলেজ কেন্দ্রে। এই দুই কেন্দ্রের প্রায় ৩ হাজার পরীক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ২ হাজার পরীক্ষার্থী তাদের খাতা জমা দিতে পারেননি। অনেক পরীক্ষার্থীর প্রবেশপত্রও ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। এ সময় পরীক্ষার্থীরা মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজে ব্যাপক তাণ্ডব চালায়। তারা প্রায় ৬০টি কক্ষের জানালা ও দরজা ভাঙচুর করে। বেশির ভাগ পরীক্ষার্থীকে ভয়ভীতি দেখিয়ে কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়। এসব ঘটনায় পুলিশ ১৩ জন পরীক্ষার্থীকে আটক করেছে।

বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট এ এম আমিন উদ্দিন ইত্তেফাককে বলেন, ৯টি কেন্দ্রের মধ্যে দুই-তিনটি কেন্দ্রে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটরা দায়িত্বে ছিলেন। তাদের কাছে রিপোর্ট চাওয়া হয়েছে। পুলিশও রিপোর্ট দেবে। এসব রিপোর্ট পাওয়ার পরই আমরা নামধাম মিলিয়ে দেখব। তারপরই এ বিষয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল নজিরবিহীন নৈরাজ্যের এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। তিনি এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। বার কাউন্সিল কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না বলেন, যারা অন্যের পরীক্ষা বন্ধের জন্য বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে তারা আইনজীবী হওয়ার যোগ্য নন।

এ প্রসঙ্গে মোহাম্মদপুর থানার ওসি আব্দুল লতিফ জানান, এ ঘটনায় পুলিশ ১২ পরীক্ষার্থীকে আটক করেছে। ঘটনার বিষয়ে মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজের দুই জন শিক্ষক থানায় একটি লিখিত অভিযোগ করেছেন। অভিযোগটি মামলা হিসেবে গ্রহণ করা হবে। সূত্রাপুর থানার ওসি মামুনুর রশিদ বলেন, মহানগর মহিলা কলেজে পরীক্ষার্থীদের হামলায় এস আই সুমন, এ এস আই দীন ইসলামসহ পাঁচ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছে। ঘটনার পর একজন পরীক্ষার্থীকে পুলিশ আটক করেছে। এ ঘটনায় পুলিশ একটি মামলা দায়ের করবে।

যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত :মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক আব্দুর রব প্রধান বলেন, পরীক্ষা চলাকালে সকাল ১০টার দিকে হঠাত্ হই চই শুনতে পাই।  পরে কলেজের গেটের দিকে গিয়ে দেখতে পাই, একদল উচ্ছৃঙ্খল পরীক্ষার্থী গেটের বাইরে থেকে ইট পাটকেল নিক্ষেপ করছে। এক পর্যায়ে তারা গেটটি ভেঙে ফেলে ও ভিতরে প্রবেশ করে নির্বিচারে ভাঙচুর শুরু করে। এসব পরীক্ষার্থী মোহাম্মদপুর মডেল ও মহিলা কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষা বর্জন করে এখানে আসে বলে ধারনা করা যায়। এই বহিরাগতদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় কলেজ কেন্দ্রের বেশ কিছু পরীক্ষার্থীও অংশ নেয়। তারা পরীক্ষা কক্ষে কর্তব্যরত বেশ কয়েক জন শিক্ষককে লাঞ্ছিত করে। এ সময় বহিরাগত হামলাকারীরা তার হাত থেকে পরীক্ষার খাতা ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র কেড়ে নিয়ে ছিঁড়ে ফেলে। উচ্ছৃঙ্খল পরীক্ষার্থীরা কলেজের অনেক কক্ষে হামলা চালিয়ে জানালা ও দরজা ভাঙচুর করে। তারা কলেজের বাগান তছনছ করে। হামলার আধাঘণ্টা পর পুলিশ কলেজে আসে।

সন্ধ্যায় মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজের অধ্যক্ষ সৈয়দ জাফর আলীসহ শিক্ষক প্রতিনিধিরা কলেজের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি সংসদ সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানকের সঙ্গে দেখা করেন। এই ভাঙচুরে তাদের ৭ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগ করেন।

কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে পাশ করা পরীক্ষার্থী মাহফুজুর রহমান বলেন, সকাল ১০টার দিকে একদল যুবক কেন্দ্রীয় কলেজের ৩১৫ নম্বর কক্ষে হামলা চালায়। এ সময় কয়েক জন যুবক তারসহ সবার পরীক্ষার খাতা কেড়ে নিয়ে সেখানে ছিঁড়ে ফেলে। অনেক খাতা কলেজের সামনে জড়ো করে আগুন ধরিয়ে দেয়। তিনি আরো বলেন, প্রায় ১ ঘণ্টায় তিনি তিনটি প্রশ্নের উত্তর লিখতে পেরেছিলেন। এ ঘটনায় তিনি নিজের ভবিষ্যত্ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। পরে প্রায় ৫০০ বঞ্চিত পরীক্ষার্থী মোহাম্মদপুর থানায় জড়ো হয়ে এ ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

এর আগে সকাল ৯টার দিকে পুরান ঢাকার মহানগর মহিলা কলেজ কেন্দ্রের পরীক্ষার্থীরা হৈ-হুল্লোড় শুরু করেন। এক পর্যায়ে তারা রুম থেকে বের হয়ে যান। এতে কেন্দ্র জুড়ে আতঙ্ক দেখা দেয়। বিক্ষুব্ধ পরীক্ষার্থীরা অন্যদের পরীক্ষার খাতা ছিঁড়ে ফেলেন। এ সময় তাদের বিভিন্ন স্লোগান দিতে দেখা যায়। পুলিশ বাধা দিলে, পরীক্ষার্থীরা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পরীক্ষার্থী বলেন, ‘বার কাউন্সিল যে প্রশ্ন করেছে তা কোনো প্রশ্নের মাপকাঠিতেই পড়ে না। জুডিশিয়ারির পরীক্ষায় এমন প্রশ্ন হতেই পারে না। এ কারণে আমরা পরীক্ষা না দিয়ে বের হয়ে গেছি।’ সূত্র জানায়, যাদের পরীক্ষার খাতা ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে, তাদের থানায় জিডি করতে বলা হয়েছে। তাদের বিষয়ে পরবর্তীতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে আইনজীবীদের সনদ পেতে নৈর্ব্যক্তিক, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। মোট ১২ হাজার ৮৫৮ জন সনদ প্রত্যাশী এবার লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করছেন।