নির্বাচনে ভয়াবহ পরাজয়ের পর বিএনপি এখন নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা করেছে। দল গোছানোর দিকে মনোযোগ দিতে চাচ্ছে বিএনপি। ভোটের পর বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা সিরিজ বৈঠক করছেন। এসব বৈঠকের প্রতিটিতে স্কাইপের মাধ্যমে সরাসরি লন্ডন থেকে যুক্ত থাকছেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। নীতিনির্ধারকরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, দলের নির্বাহী কমিটির শূন্য পদসহ দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন পুনর্গঠন করা হবে। দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে থাকায় আপাতত কেন্দ্রীয় কাউন্সিল হবে না। তবে জেলা-উপজেলাসহ সর্বস্তরে কাউন্সিলের মাধ্যমে হবে কমিটি। কাউন্সিলররা সরাসরি ভোট দিয়ে নেতা নির্বাচন করবেন। ফলে কমিটি নিয়ে বাণিজ্য বা পকেট কমিটি হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না।
নেতারা মনে করছেন- দল পুনর্গঠন হলে ত্যাগী ও বঞ্চিত নেতারা মূল্যায়িত হবেন। হতাশা কেটে যাবে, নেতা-কর্মীরা চাঙ্গা হবেন। নতুন নেতৃত্ব আসলে গতিশীলতা ফিরবে। তখন আন্দোলনে নামতে পারবেন তারা। দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। খুব শিগগিরই বিএনপির স্থায়ী কমিটির কয়েকজন সদস্য কারাগারে বেগম জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাত্ করে স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তার মতামত গ্রহণ করবেন।
গতকাল রাজধানীতে এক আলোচনা সভায় বিএনপি নেতারা বলেছেন, আমাদের ঘুরে দাঁড়াতে হলে কাউন্সিলের মাধ্যমে দলকে পুনর্গঠন করতে হবে। নির্বাচনে পরীক্ষিতদের সামনে আনতে হবে। এরপর আন্দোলনের মাধ্যমে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করে আনতে হবে। নেতারা বলছেন, নেতাদের ভাষ্য, কারাবন্দি দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে ছাড়া জাতীয় কাউন্সিল করার কথা ভাবছে না বিএনপি। তবে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির পাঁচটি শূন্য পদ পূরণের উদ্যোগ নিয়েছে দলটি। ইতোমধ্যে এ ব্যাপারে সম্মতিও দিয়েছে দলটির হাইকমান্ড। কেননা স্থায়ী কমিটির দুজন সদস্য রাজনীতি থেকে অবসর নিতে পারেন। সে ক্ষেত্রে পরীক্ষিত ও ত্যাগী প্রবীণ নেতার পাশাপাশি অপেক্ষাকৃত কম বয়সী নেতাদেরও স্থায়ী কমিটিতে স্থান দিতে চায় দলটি। একইসঙ্গে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদ, দলের ভাইস-চেয়ারম্যানসহ নির্বাহী কমিটির ফাঁকা পদও পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দলের নেতারা মনে করছেন, দল গোছানোর কাজ শেষ না করেই শেষ পযন্ত নির্বাচনে অংশ নেয় বিএনপি। ফলে জেলা-উপজেলা কমিটি পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া থমকে যায়। একইসঙ্গে দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা, হামলা গ্রেফতারের কারণে পর্যুদস্ত হয়ে পড়ে বিএনপি। তাই নির্বাচনেও প্রশাসন ও ক্ষমতাসীন দলের বিপরীতে তাদের দল কোনো ধরনের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, বিএনপিকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে দল পুনর্গঠন করতে হবে। দলের নেতাকর্মীদের পুনর্বাসন করতে হবে। ২০০৮ সালে নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পরও ঘুরে দাঁড়িয়েছিলাম। যারা প্রার্থী ছিলেন নিজ নিজ এলাকার নেতাকর্মীদের মামলা থেকে পরিত্রাণ ও জেল থেকে মুক্ত করাতে হবে। যেসব এলাকায় আমাদের প্রার্থী ছিল না, সেখানে দলের মাধ্যমে নেতাকর্মীদের পুনর্বাসন করতে হবে। কাউন্সিলের মাধ্যমে দলকে পুনর্গঠন করতে হবে। ত্যাগী, পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের নেতৃত্বে আনতে হবে। আমরা যারা ব্যর্থ বলে পরিচিত হয়েছি আমাদের পদ ছেড়ে দিতে হবে তরুণদের জন্য।
বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, এখন আমাদের দুটি কাজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একটি হলো-পুনর্বাসন আর অন্যটি পুনর্গঠন। এখন ক্ষতিগ্রস্ত হাজার হাজার লাখ লাখ নেতাকর্মীকে পুনর্বাসন করতে হবে। দলের ত্যাগীদের সামনে এনে দলকে পুনর্গঠন করতে হবে। যারা দলের জন্য নিবেদিত প্রাণ হিসেবে কাজ করেছেন, তাদের সামনে এনে পুনর্গঠন করতে হবে। দরকার হলে আমরা সামনে থেকে সরে যাব। তারপরও দলকে আগামী কয়েকমাসের মধ্যে পুনর্গঠন করতে হবে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, বিএনপির অঙ্গ সহযোগী সংগঠনগুলোর পাশাপাশি শিগগিরই উপজেলা-জেলা পর্যায়ের কমিটি পুনর্গঠনের মূল কাজ শুরু হচ্ছে।
সর্বশেষ ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল করেছিল বিএনপি। দলটির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী জাতীয় নির্বাহী কমিটি তিন বছরের জন্য নির্বাচিত হবে এবং পরবর্তী জাতীয় নির্বাহী কমিটি দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত এই কমিটিই দায়িত্ব পালন করবে। কমিটি ঘোষণার সময়ই ১৯ সদস্যের স্থায়ী কমিটির দুটি পদ ফাঁকা ছিল। বাকি ১৭ সদস্যের মধ্যে তরিকুল ইসলাম, আ স ম হান্নান শাহ ও এম কে আনোয়ার মারা গেছেন। ফলে বর্তমানে পাঁচটি পদ ফাঁকা। লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান ও ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া অসুস্থতার কারণে নিয়মিত সময় দিতে পারছেন না। স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ কমিটি ঘোষণার আগে থেকেই ভারতের শিলংয়ে আছেন।
সূত্র জানায়, দলটির ৭৩ সদস্যের উপদেষ্টা কমিটির হারুনার রশিদ খান মুন্নু, ফজলুর রহমান পটলসহ সাতজন মারা গেছেন। ৩৭ জন ভাইস চেয়ারম্যানের মধ্যে কমিটি ঘোষণার পরপরই পদত্যাগ করেন মোসাদ্দেক আলী ফালু এবং ইনাম আহমেদ চৌধুরী। নির্বাহী কমিটির গুরুত্বপূর্ণ ছাত্র ও সহ-ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক পদ দুটি কমিটি ঘোষণার পরই ফাঁকা। নির্বাহী কমিটির সাতটি আন্তর্জাতিক সম্পাদকের মধ্যে দুটি ফাঁকা। সহ-যুববিষয়ক সম্পাদকের নাম ঘোষণা করা হলেও যুববিষয়ক সম্পাদকের পদটি এখনো ফাঁকা। এ ছাড়া নির্বাহী কমিটির সদস্যদের মধ্যে মারা গেছেন চারজন। নির্বাহী কমিটির সদস্য নুর মোহাম্মদ মণ্ডল দলত্যাগ করে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন।
এদিকে ছাত্রদলের কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে অনেক আগেই। যুবদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঝুলে আছে দীর্ঘদিন ধরে। স্বেচ্ছাসেবক দলেরও একই অবস্থা। কৃষক দল, শ্রমিক দল, তাঁতী দল ও মত্স্যজীবী দলের আরও বেহাল অবস্থা। এসব গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গসংগঠন পুনর্গঠনের দাবি অনেক আগে থেকেই করে আসছেন নেতাকর্মীরা।
