আগে মফস্সল শহরে প্রায় বাড়ির পুকুরে বা গ্রামের দিঘি ভরে থাকত পদ্ম, শালুক আর নানা রকম শ্যাওলায়। কালো জলে পানকৌড়ি, দলপিপি সারি বেঁধে ভেসে বেড়াত। পানকৌড়ি ঘনঘন ডুব দিত, ঠোঁটে তুলে আনত ছোট ছোট মাছ। একটু বাঁকা পা নিয়ে হাঁসগুলো ঘুরে বেড়াত পদ্ম-শালুকের মাঝে। শীতকালে বড় দিঘিতে নামত বালিহাঁসের ঝাঁক।
ছোট্ট শহর পিরোজপুরে আমাদের বাড়ির পেছনে ছিল বেশ বড় একটা পুকুর। শৈশবে দেখেছি সাদা, গোলাপি পদ্মগুলো আপন রূপ, সৌন্দর্য, গন্ধ নিয়ে ফুটে থাকত তাতে। পাপড়ি ঝরে গেলে চাকাগুলো কিংবা পদ্মের মাঝের হলুদ অংশ জলের বুকে জেগে থাকতে।
পুকুর-দিঘির পদ্ম একটু পুষ্ট হলে কিছু মানুষ এগুলো তুলে এনে বাজারে বিক্রি করত। আমরা ওগুলো ছাড়িয়ে সাদা বাদামের মতো বীজগুলো খেতাম। কী সুস্বাদু! মনে আছে, হিন্দু পরিবারগুলো পুজো-র্পা্বণে নিজেরা বা লোক লাগিয়ে পদ্মফুল তুলে আনত। তবে কাজের জিনিস ছিল পদ্মপাতা। কাজে লাগাত প্রসাদ বিতরণে, বিয়েশাদি, অন্নপ্রাশন, উপনয়নের ভোজে। চাহিদা ছিল হোটেল, মিষ্টির দোকানেও।
চৈত্র থেকে শুরু করে বর্ষার কয়েক মাস বাদ দিয়ে দুর্গা পুজো পর্যন্ত গৃহস্থবাড়িতে দুপুরে পদ্মপাতায় খাওয়ার রেওয়াজ ছিল। সেই পঞ্চাশের দশকের শেষার্ধ্বে। গ্রীষ্মে জল শুকিয়ে গেলে, দরিদ্র পরিবারের মেয়েরা কোদাল দিয়ে পাড়ের মাটি খুঁড়ে পদ্ম-ডাঁটির শেষ সাদা অংশ—মুলাম সংগ্রহ করত, সেটা ছিল তাদের তরকারি। আমরাও খেয়েছি—ছোটবেলায় কাঁচা মুলাম চিবিয়ে খেতে খেতে দামোদর খালে লাফ দিয়ে পড়েছি—আহা কী মিষ্টি, কটু স্বাদ।
ধীরে ধীরে ফুরিয়ে গেল সব। কত পুকুর দিঘি ভরাট হলো। বড় জলাশয়গুলি লিজ দেওয়া হলো বাত্সরিক, তিন বছরের চুক্তিতে মোটা অঙ্কের টাকায়। অতঃপর পদ্মবন সাফ—সমূলে উত্পাটিত হলো শালুক। বালিহাঁস শীতের ঠিকানা হারিয়ে ফেলল। পানকৌড়ি-দলপিপিরা কোথায় গেল কে জানে। দিঘি-পুকুর ভরাট হওয়ায় চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে গেল পদ্মফুল ও পদ্মপাতা!
লাল, সাদা শালুকের ডাঁটি দরিদ্র মানুষের সংসারে সবজির জোগান দিত, আর মাঝের হলুদ অংশ ‘পেহুট’ ছিল গ্রামের ছেলেমেয়েদের প্রিয় খাবার। পেহুট পুষ্ট হলে ভেতরের সরষের দানার মতো কালো কালো বীজগুলো শুকিয়ে খই ভাজা হতো। বড় সুস্বাদু।
কিংবদন্তি আছে, দেবীর ছলনায় বিব্রত শ্রীরামচন্দ্র নাকি একটি পদ্মের পরিপূরক হিসেবে নিজের একটি চোখ উত্পাটন করে দুর্গার পায়ে অঞ্জলি দিতে উদ্যত হয়েছিলেন। আবার অঘ্রাণে শীতের রাতে কাননের সরোবরে ফুটে ওঠা পদ্মটির জন্য দাম কীভাবে চড়ছিল সে আরেক আখ্যান। সুদাস মালি কাউকে না বিক্রি করে স্বয়ং বুদ্ধের চরণপদ্মেই তা অর্পণ করল।
‘সাথী’ ছবিতে পদ্মপুকুরের দৃশ্যে নায়িকা কানন দেবীর কণ্ঠে ছিল:
‘পায়ে চলা পথের কথা কে জানে রে কে জানে
কোথায় যে তার জনম হলো
কোথায় চলে কার পানে
গাঁয়ের ধারে কাজলা দিঘি
তার পাশে এক পাতার ঘর
সেথায় আছে কাদের মেয়ে
পথ নিয়ে যায় তার খবর
ময়নামতির মাঠের ধারে
পদ্ম ভরা বিলের পারে
নতুন ধানের গন্ধ লয়ে পথ চলেছে দূরে দূরে...’
কিন্তু তা আজ কল্পনার বহিঃপ্রকাশ মাত্র।
লিয়াকত হোসেন খোকন
