স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণ দেশের জন্য সম্মানজনক। তবে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে রপ্তানি বাণিজ্যে। পণ্য রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা আর থাকবে না। এ কারণে রপ্তানি আয় বর্তমানের অন্তত ১৪ ভাগ কমে যেতে পারে। এই অভিঘাত থেকে সুরক্ষা পেতে এলডিসি থেকে উত্তরণের পরও শুল্কমুক্ত রপ্তানিসুবিধা অব্যাহত রাখার বিষয়ে জোর দিতে হবে। জোটগত প্রধান বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং অন্যান্য বাজারে দরকষাকষির কাজটি চালিয়ে যেতে হবে।
গতকাল রবিবার ‘এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি’ শিরোনামে এক ওয়েবিনারে এই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়। অর্থনীতিবিষয়ক সাংবাদিকদের সংগঠন ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (্ইআরএফ), গবেষণা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র্যাপিড) ও এশিয়া ফাউন্ডেশন যৌথভাবে এই ওয়েবিনারের আয়োজন করেছে। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। বিশেষ অতিথি ছিলেন বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম, বাণিজ্যসচিব ড. জাফর উদ্দিন। বিষয়ের ওপর মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন র্যাপিডের চেয়ারম্যান ড. এম এ রাজ্জাক। ইআরএফের সভাপতি শারমিন রিনভীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এতে অন্যদের মধ্যে আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশে এশিয়া ফাউন্ডেশনের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ কাজী ফয়সাল বিন সিরাজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এম আবু ইউসুফ। ওয়েবিনারটি সঞ্চালনা করেন ইআরএফের সাধারণ সম্পাদক এস এম রাশেদুল ইসলাম।
প্রসঙ্গত, আগামী ২২ থেকে ২৬ ফেব্র্র্রুারি জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট কমিটির (সিডিপি) এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করবে। ধারণা করা হচ্ছে, এলডিসি থেকে উত্তরণে বাংলাদেশের পক্ষে সুপারিশ পাওয়া যাবে। এই সুপারিশের পর ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিশ্ববাণিজ্যে শুল্কমুক্ত রপ্তানিসুবিধা অব্যাহত থাকবে।
পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আছে সরকারের। দীর্ঘদিন এলডিসির মধ্যে পড়ে থাকা দেশের জন্য সম্মানের বিষয় নয়। এলডিসি থেকে উত্তরণের ফলে বাণিজ্য বিঘ্নিত হতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে। তবে প্রকৃতই কী হবে সেটা কেবল ২০২৪ সালেই বোঝা যাবে। বাণিজ্যসুবিধা অব্যাহত রাখতে ইইউর সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে। ব্রেক্সিট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর যুক্তরাজ্যের সঙ্গেও এই আলোচনা করা যায়। একই সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গেও বাণিজ্য বাড়ানোর চেষ্টা করতে হবে। বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, এলডিসি নিয়ে দুশ্চািন্তার কিছু নেই। তবে যথাযথ প্রস্তুতি নিতে হবে। বাণিজ্যসচিব বলেন, এলডিসি উত্তরণের পরও রূপান্তরকাল হিসেবে অতিরিক্ত আরো কয়েক বছর শুল্কমুক্ত রপ্তানিসুবিধা পাওয়ার বিষয়ে চেষ্টা করছেন তারা।
মূল প্রবন্ধে ড. এম এ রাজ্জাক বলেন, মোট রপ্তানির ৭৫ শতাংশ এখন শুল্কমুক্ত সুবিধার আওতায় আছে। এলডিসি থেকে উত্তরণে শুল্কমুক্ত রপ্তানিসুবিধা হারানোর পাশাপাশি পণ্যে প্রণোদনা দেওয়া যাবে না। শুল্ক বাড়বে গড়ে ১৪ শতাংশ। সবচেয়ে বড় বাজার ইইউতে বাড়বে ৯ শতাংশ, কানাডায় ১৭, চীনে ১৬ দশমিক ২ এবং জাপানে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। ফলে রপ্তানি কমে যেতে পারে ৭০০ কোটি ডলারের মতো। সবচেয়ে বড় বাজার ইইউ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভিয়েতনামের সঙ্গে ইইউর এফটিএ হয়েছে। পর্যায়ক্রমে দেশটির শুল্ক কমছে ইইউতে। ২০২৭ সাল নাগাদ ভিয়েতনামের পণ্য যাবে বিনা শুল্কে, যেখানে বাংলাদেশের পণ্যে ১০ শতাংশ শুল্কারোপ হবে। তখন কঠিন অবস্থায় পড়বে বাংলাদেশ। শুল্কমুক্ত রপ্তানিসুবিধা এবং অতিরিক্ত তিন বছর বাজারসুবিধা প্রলম্বিত করার আলোচনা শুরুর পরমার্শ দেন তিনি।
