ক্ষমতাসীন দলের অন্তর্দ্বন্দ্বে ভাঙল নেপালের পার্লামেন্ট

আপডেট : ২০ ডিসেম্বর ২০২০, ২২:৪৫

নেপালে প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির পরামর্শে পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট বিদ্যা দেবি ভান্ডারি। গতকাল রবিবার সকালে মন্ত্রিসভার জরুরি বৈঠকে পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ক্ষমতাসীন দলের অন্তদ্বর্ন্দ্বেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ওলির সরকারের সাত মন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন। বিরোধীরা সিদ্ধান্তকে অসাংবিধানিক বলে আখ্যায়িত করেছেন এবং দেশ জুড়ে গতকাল বিক্ষোভ হয়েছে। নেপাল কমিউনিস্ট পার্টির স্ট্যান্ডিং কমিটি ওলির বিরুদ্ধে শৃংখলা ভঙের অভিযোগ আনবে।             

ওলির পরামর্শে পার্লামেন্ট ভেঙে দিলেন প্রেসিডেন্ট

হিমালয়ের দেশ নেপালে পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন ২০২২ সালে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ভান্ডারি গতকাল আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি দুই ধাপে আগামী বছরের ৩০ এপ্রিল এবং ১০ মে নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের ভোটাভুটির তারিখ নির্ধারণ করেছেন। প্রেসিডেন্টের অফিস জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী ও কাউন্সিল অব মিনিস্টার’স এর পরামর্শে সংবিধানের আর্টিকেল ৭৬ (১) ও (৭) এবং আর্টিকেল ৮৫ এর ক্ষমতাবলে প্রেসিডেন্ট পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়েছেন। বিজ্ঞপ্তিতে প্রেসিডেন্টের অফিস আরো জানিয়েছে, মন্ত্রিপরিষদের সুপারিশেই প্রেসিডেন্ট আগাম নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করেছেন।

জানা যায়, সংবিধান পরিষদীয় আইনের অধ্যাদেশের বিষয়টি নিয়ে ক্রমাগত চাপ বাড়ছিল প্রধানমন্ত্রী ওলির ওপর। গত মঙ্গলবার প্রেসিডেন্ট ভান্ডারিকে দিয়ে সেটি স্বাক্ষর করিয়ে নিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। এছাড়া বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ওলির বিরুদ্ধে অসন্তোষ তৈরি হচ্ছিল। শনিবার দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠকের পর গতকাল রবিবার সকালে মন্ত্রিপরিষদের জরুরি বৈঠক ডেকেছিলেন ওলি। সেখানে তিনি জানান, তার সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে। অতএব সরকার ভেঙে দেওয়া হোক। নেপাল কমিউনিস্ট পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য বিষ্ণু রিজাল বলেন, প্রধানমন্ত্রী সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছেন। সরকার ভেঙে দেওয়ার সুপারিশ করেছেন তিনি।

অন্তদ্বর্ন্দ্বই প্রধান কারণ!

করোনা ভাইরাস, দেশের অর্থনীতি সংক্রান্ত বেশ কিছু ইস্যুতে নেপালের রাজনীতিতে একটা ডামাডোল চলছে। এই বিষয়গুলো সামাল দিতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে- এসন অভিযোগ তুলে ক্রমাগত চাপ বাড়াচ্ছিল বিরোধীরা। সূত্রের খবর, তার উপর দলের অভ্যন্তরেও ওলির ভূমিকা নিয়ে একটা চাপা ক্ষোভ তৈরি হচ্ছিল। চীন ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক গড়া নিয়েও চাপে ছিলেন ওলি। শেষমেশ সরকার ভেঙে দেওয়ার সুপারিশ করেন তিনি। ওলির রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বি পুষ্প কম দাহাল ওরফে প্রচ্লের সঙ্গে বিরোধ চলছিল দীর্ঘদিন ধরেই। প্রচ্ল ব্যর্থতার অভিযোগ এনে ওলির পদত্যাগ দাবি করে আসছিলেন। এমনক ভারত ও চীনের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি নিয়ে দ্বন্দ্ব চলছিল অনেক দিন ধরেই। গত জুলাইয়ে ওলি বলেন, তার নিজের দলের কয়েকজনের সহায়তায় প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য ভারত চেষ্টা চালিয়েছে। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ওলি প্রধানমন্ত্রী হন। এর আগে ২০১৭ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনে সিপিএন-ইউএমএল এবং দাহালের সিপিএন (মাওবাদী) সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। এসব দল মিলে নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি (এনসিপি) গঠন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হন ওলি। ওই সময় অনেকেই ভেবেছিলেন, ওলি এবং দাহাল পাঁচ বছর শাসনামল ভাগ করে নেবেন। কিন্তু ওলির তিন বছর পার করলেও সেই লক্ষণ দেখা যায়নি।

সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান, ক্ষোভ ও বিক্ষোভ

নেপাল কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম নেতা মাধব নেপাল জানিয়েছেন, পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার বিষয়টি অসাংবিধানিক। এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা উচিত। গতকালই প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করে কৃষি, পর্যটন, জ্বালানি, বন, শ্রম, পানি সম্পদ এবং শিক্ষামন্ত্রীসহ সাতমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন। তারা এনসিপিতে ওলির রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বি পুষ্প কমল দাহালের ঘনিষ্ট বলে জানা গেছে। এছাড়া গতকাল পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার পর সন্ধ্যায় এনসিপির স্ট্যান্ডিং কমিটির জরুরি বৈঠক হয়। সেখানে দলের নেতা  ও প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলির বিরুদ্ধে শৃংখলা ভঙের প্রস্তাব আনা হয়। এই কমিটিতে প্রচ্লের সমর্থকরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। তারা এই প্রস্তাব পাস করে দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে পাঠাবে এবং কাল মঙ্গলবার দলের জরুরি বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। গতকাল পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার পরই রাজধানী কাঠমান্ডুসহ দেশ জুড়ে বিক্ষোভ হয়। তারা এই সিদ্ধান্তকে অসাংবিধানিক ও অগণতান্ত্রিক আখ্যা দিয়ে তা বাতিল করার দাবি জানান। বিক্ষোভ উপলক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্টসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বাসভবনে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।