বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আব্দুর রউফ

আপডেট : ২১ ডিসেম্বর ২০২০, ২০:২৮

গতকালের পর

রফিকুল ইসলাম সবাইকে বললেন, হয় আমরা স্বাধীনতার জন্য লড়ব, নয় ফায়ারিং স্কোয়াডে মরব।

তাঁর কথায় বাঙালি সদস্যগণ উদ্বুদ্ধ হন এবং স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিতে এগিয়ে আসেন। রফিকুল ইসলামের প্রথম অপারেশন ছিল চট্টগ্রামের হালিশহর ওয়্যারলেস স্টেশন দখল করা। সেটি তিনি সফলতার সাথে করে ফেলেন।

রফিকুল ইসলামের টিমকে প্রতিহত করতে পাকিস্তানবাহিনী কুমিল্লা থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। তারা এতে জিপ, ট্রাক, হাফট্রাকসহ একশ’র উপরে যুদ্ধযানের বিশাল কনভয় নিয়ে বিগ্রেডিয়ার ইকবাল শফির নেতৃত্বে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলাম তাদেরকে আটকাতে এক কোম্পানি ইপিআর সদস্যকে পাঠিয়ে দেন। সেই দলে ছিলেন মুন্সি আব্দুর রউফ। তাঁদের সাথে তিন ইঞ্চি মর্টারসহ অন্যান্য অস্ত্র রয়েছে।

সাধারণ বীর বাঙালিও ইপিআর সদস্যদের সাহায্যে এগিয়ে আসে। তাঁরা পাকিস্তানবাহিনীর রাস্তায় বেরিকেড দিয়ে রাখে। ব্রিজ ভেঙে রাখে যাতে শত্রু সেনাদের গাড়ি অনুপ্রবেশ করতে না পারে। এর মধ্যে পাকিস্তানবাহিনীর অফিসার জেনারেল মিঠ্ঠা খান হেলিকপ্টারে করে কুমিল্লা আসেন। তিনি পাকিস্তানসেনাদের নির্দেশ দেন বাঙালিদের দেখামাত্র গুলি করে মারতে। পিশাচের দল তার নির্দেশমতো গণহত্যা চালাতে থাকে।

ইপিআর জওয়ানরা তাদেরকে পাল্টা আক্রমণে ব্যস্ত রাখতে চেষ্টা করে। কিন্তু শত্রুদের হাতে অনেক ভারি অস্ত্র রয়েছে। ফলে ইপিআর বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়।

১১ নং উইং এর শতাধিক ইপিআর সেনার সাথে মুন্সি আব্দুর রউফ ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান এর সাথে যোগ দেন এবং শত্রুর ওপর আক্রমণ করতে থাকেন। কিন্তু শত্রুসেনাদের সাথে বিভিন্ন স্থান থেকে আরও সদস্য যোগ দিয়ে শক্তি বৃদ্ধি করতে থাকে। ফলে ইপিআর বাহিনী পিছু হটে এবং চট্টগ্রামের নানিয়ারচর এলাকার অধীন বাকছড়ি পার্বত্য এলাকায় অবস্থান নেয়। পাকিস্তানবাহিনী সেখানেও ইপিআরদের কোনঠাসা করে ফেলে এবং সমগ্র চট্টগ্রামের ওপর দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করে ফেলে। ধ্বংসযজ্ঞে সেখানে থাকা অবাঙালিরাও তাদের সাথে যোগ দেয়।

এরপর ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের এই কোম্পানিটি চট্টগ্রামের রাঙামাটি মহালছড়ি জলপথ প্রতিরোধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। সেই পথে পাকিস্তানবাহিনী যাতায়াত করে এবং অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহ করে। ইপিআর সদস্যরা সেখানকার চিংড়িখালের বুড়িঘাট এলাকায় অবস্থান নেয়। ১৫০ জনের দলটি ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান এর নেতৃত্বে অপেক্ষা করতে থাকে। পাকিস্তানি সেনারা এটি টের পেয়ে যায়। এপ্রিলের ৮ তারিখে পাকিস্তান বাহিনীর কমান্ডো ব্যাটেলিয়নের দুটি কোম্পানি ৭টি স্পিডবোট ও দুটি লঞ্চ নিয়ে বুড়িঘাট দখলে এগিয়ে আসে। হঠাত্ করে তারা আক্রমণ শুরু করে এবং চারপাশ থেকে বেস্টনি দিয়ে স্থলভাগের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। লঞ্চ ও গানবোট থেকে নেমে এসে মুক্তিযোদ্ধাদের ঘিরে ফেলার চেষ্টা করে। ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান বুঝতে পারেন মুক্তিযোদ্ধাদের এখন পিছু হটতে হবে, নতুবা সবাইকে মৃত্যুমুখে পতিত হতে হবে। কিন্তু পিছু হটতে গেলে কাউকে না কাউকে কাভারিং ফায়ার করে শত্রুকে আটকে রাখতে হবে, নইলে পিছু হটলেও অনেককে মৃত্যুবরণ করতে হবে। সবাইকে বাঁচাতে গেলে একজনকে আত্মবলিদান দিতে হবে। কারণ কাভারিং ফায়ার যে করে, তাকে নিশ্চিত মৃত্যুবরণ করতে হয়। ক্যাপ্টেন ভাবতে লাগলেন কাকে সেই দায়িত্ব দেয়া যায়। এমন সময় সাহসী বীর, মুন্সি আব্দুর রউফ এগিয়ে এসে কাভারিং ফায়ারের দায়িত্ব নিতে প্রস্তাব করেন। ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান চিন্তায় পড়ে যান। নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে তাঁকে ঠেলে দেবেন কি-না। তিনি সেই প্রস্তাবে রাজি হলেন না। কিন্তু আব্দুর রউফ তো নাছোড়বান্দা। তিনি বললেন, স্যার, আমি ভালো এসএমজি চালাতে পারি। সুতরাং কাভারিং ফায়ার দেয়ার জন্য এখানে আমার চেয়ে যোগ্য আর কেউ নেই। আমি কাভারিং ফায়ার দিচ্ছি, আপনি সেনাবাহিনী  নিয়ে নিরাপদ দূরত্বে চলে যান। অগত্যা ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান রাজি হলেন। তিনি ১৫০ জনের দলকে নিয়ে নিরাপদে পশ্চাদপদসরণ করলেন, আর মুন্সি আব্দুর রউফ দৃঢ়চিত্তে বীরের মতো মেশিনগান চালাতে থাকলেন। তাঁর আক্রমণে শত্রুদের সাতটি স্পিডবোট ডুবে যায়। পাকিস্তানি  সেনাদের অনেকে নিহত হয় এবং বেশ কয়েকজন পানিতে ডুবে যায়। লঞ্চগুলো দ্রুত ঘুরিয়ে মেশিনগানের রেঞ্জের বাইরে চলে যায়। তারপর সেখান থেকে তিন ইঞ্চি মর্টারের শেল নিক্ষেপ করতে থাকে।

কিছুক্ষণ এভাবে চলতে থাকার পর হঠাত্ করে একটি শেল মুন্সি আব্দুর রউফের ওপর বিস্ফোরিত হয় এবং তিনি শাহাদত বরণ করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের আর কোনও গোলা আসছে না দেখে শত্রুরাও ফিরে যায়। পরবর্তীতে ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান আরও লোকবল ও সৈন্য নিয়ে এসে মুন্সি আব্দুর রউফ এর মরদেহ উদ্ধার করেন। তারা তাঁকে নানিয়ার চরের চিংড়িখাল সংলগ্ন উঁচু টিলার ওপর সমাহিত করেন।

পরবর্তীতে দয়ালচন্দ্র চাকমা নামে এক আদিবাসী মুন্সি আব্দুর রউফ এর সমাধিস্থল সনাক্ত করেন এবং ১৯৯৬ সালে রাঙামাটি শহরের রিজার্ভ বাজারে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়।