কচুরিপানা ভর্তি পুকুরের মাঝ থেকে হঠাত্ কী যেন ওয়া-কু...ওয়া-কু...বলে ডেকে উঠল! সেদিকে চোখ ফেলতেই দেখি—কচুরিপানার ওপর দিয়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে সাদা ডানা ও বাদামি পিঠের কানিবক হেঁটে যাচ্ছে। তখনই মাথায় এলো শৈশবে পড়া খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দিনের সেই কবিতা—
‘ঐ দেখা যায় তালগাছ
ঐ আমাদের গাঁ।
ঐখানেতে বাস করে
কানাবগীর ছা।
ও বগী তুই খাস কী?
পান্তাভাত চাস কি?
পান্তা আমি খাই না
পুঁটি মাছ পাই না
একটা যদি পাই
অমনি ধরে গাপুস গুপুস খাই।’
কানাবগি, কানাবক, কোঁচবক, ধানপাখি নামে পরিচিত কানিবক মূলত মাঝারি আকারের জলচর পাখি। ধানখেত, পুকুর, খাল-বিল-ঝিল ও নদীসহ সব ধরনের জলাভূমিতে এদের দেখা যায়। বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমার ছাড়াও ইরান, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতেও এদের দেখা মেলে। এদের দৈর্ঘ্য কমবেশি ৪৬ সেন্টিমিটার, ডানা ২১.৫ সেন্টিমিটার, ঠোঁট ৬.৩ সেন্টিমিটার, পা ৬.২ সেন্টিমিটার ও লেজ ৭.৮ সেন্টিমিটার, ওজন গড়ে ২১৫ গ্রাম। অন্যসব বকের মতোই পুরুষ ও স্ত্রী পাখি দেখতে অভিন্ন। গায়ে মূলত সাদা ও বাদামি মেশানো রঙের প্রাধান্য দেখা যায়। সচরাচর একা কিংবা ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন দলে থাকে। মাটিতে বা গাছে থাকলে পরিবেশের সঙ্গে খুব সহজে মিশে যায়, ফলে হঠাত্ করে চেনা যায় না। ওড়ার সময় ঘাড় কিছুটা গোটানো থাকে। লেজের তলা দিয়ে পা দুটি বেরিয়ে থাকে টান টান হয়ে। উড়লে ডানার সাদা রং স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে।
সারা দিন বিভিন্ন জায়গায় চরে বেড়ালেও সন্ধ্যায় অনেকগুলো বক একই গাছে আশ্রয় নেয়। বিশেষ করে বাঁশগাছে রাত্রি যাপন করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। বাসাও বাঁধে বেশিরভাগ বাঁশগাছেই। গাছের সরু ডাল, কঞ্চি, পালক ইত্যাদি দিয়ে কোনোরকমে বাসা সাজায়। বাসা দেখতে অনেকটা পাতিকাকের বাসার মতো।
এদের খাবার তালিকায় রয়েছে মাছ, জলজ পোকামাকড়, চিংড়ি, ব্যাঙ, ব্যাঙাচি, ফড়িং, কচ্ছপের ছোট বাচ্চা, কেঁচো, সাপের ছানা ইত্যাদি। মাটিতে বেশি শিকার করলেও উড়ন্ত অবস্থায়ও শিকার করে। দিনে রাতে সবসময়ই এরা শিকার করতে পারে। বেশিরভাগ সময়ই একা শিকার করতে ভালোবাসে। কখনো দলবদ্ধ হয়েও শিকারে বের হয়। জলাশয়ের কিনারে বা ঝোপের ভেতর ঘাপটি মেরে থাকে শিকারের আশায়। শিকারের দেখা না পেলেও ধ্যানমগ্নের মতো এক জায়গায় অনেকক্ষণ কাটিয়ে দেয়।
কানিবক বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী আইনে সংরক্ষিত—তবু সহজে দেখা মেলে বলে শিকারিদের খপ্পরে পড়ে বেশি। ফাঁদ পেতে ওদের শিকার করে গ্রামের দুষ্টু ছেলেরা। গ্রামবাংলার অতিপরিচিত এই পাখির ব্যাপারে আমাদের সবার সচেতন হওয়া জরুরি।
