বর্তমান সরকারের আমলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ও উন্নতি সাধিত হইয়াছে। তাহার মধ্যে বিদ্যুত্ খাতের উন্নয়নে যে ধারাবাহিক সাফল্য পরিলক্ষিত হইতেছে, তাহা বিরোধীমতের লোকেরাও স্বীকার না করিয়া পারেন না। কেননা এই উন্নয়ন দৃশ্যমান, যাহা আমাদের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও সামাজিক রূপান্তরের অনুঘটক হিসাবে ভূমিকা পালন করিতেছে। বিদ্যুত্ বদলাইয়া দিতেছে মানুষের ভাগ্য। ‘লোডশেডিং’ শব্দটি এখন আর তেমন উচ্চারিত হয় না। ‘শেখ হাসিনার উদ্যোগ, ঘরে ঘরে বিদ্যুত্’ এখন শুধু একটি স্লোগান নহে, ইহা বাস্তবতা। নির্বাচনি অঙ্গীকার প্রতিপালনের পাশাপাশি স্বাধীনতার ৫০ বত্সর ও মুজিব শতবর্ষকে সম্মুখে রাখিয়া শতভাগ বিদ্যুতায়নের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। অত্যন্ত আনন্দের সংবাদ এই যে, এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় নিষ্ঠার সহিত তাহাদের দায়িত্ব পালন করিয়া যাইতেছে। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী শতভাগ বিদ্যুতায়নের দ্বারপ্রান্তে রহিয়াছে বাংলাদেশ। ইতিমধ্যে ৯৮ শতাংশ মানুষ বিদ্যুেসবার আওতায় আসিয়া গিয়াছে। প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকার অবশিষ্ট ৩ লক্ষ পরিবারে বাতি জ্বলিলে সমগ্র দেশ বিদ্যুতের আলোয় উদ্ভাসিত হইবে।
বিদ্যুত্ উত্পাদনে বাংলাদেশ এখন একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশ। গত এক যুগে বিদ্যুেকন্দ্রের সংখ্যা ২৭ হইতে ১৩৮টিতে উন্নীত হইয়াছে (এই বত্সরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত)। এই ঈর্ষণীয় সাফল্যের কারণ বিদ্যুত্ খাতে বেসরকারি উদ্যোগকে উত্সাহিত করা। ফলে একসময় বিদ্যুত্সংযোগের জন্য আবেদন করিয়া যেইখানে দীর্ঘসময় অপেক্ষায় থাকিতে হইত, এখন সেইখানে মাইকিং করিয়া সম্ভাব্য গ্রাহকের অনুসন্ধান চলিতেছে। ২০০৯ সালে বর্তমান সরকার যখন ক্ষমতায় আসে, তখন দেশের ৫৭ শতাংশ মানুষ বিদ্যুত্সুবিধার বাহিরে ছিল। আমাদের উত্পাদনক্ষমতা ছিল ৪ হাজার ৯৪২ মেগাওয়াট। এখন তাহা (ক্যাপটিভ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ) ২৩ হাজার ৫৪৮ মেগাওয়াটে উন্নীত হইয়াছে। সূত্রমতে, বাংলাদেশের ৯৮ হাজার ৩১৯টি গ্রামের মধ্যে ৯৫ হাজার ২৪০টি গ্রাম শতভাগ বিদ্যুতায়িত করিয়াছে সংশ্লিষ্ট সংস্থা-কোম্পানিগুলি। এখন অবশিষ্ট রহিয়াছে ৩ হাজার ৭৯টি গ্রাম। এই গ্রামগুলি পার্বত্য, দ্বীপ ও চরাঞ্চলে অবস্থিত। ফলে বিকল্প উপায়ে তথা সাবমেরিন ক্যাবল ও সোলার মিনিগ্রিডের মাধ্যমে বিদ্যুত্ পৌঁছাইয়া দেওয়ার কার্যক্রম চলিতেছে। আশা করি, লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আগামী মার্চ মাসের মধ্যেই এই সকল গ্রাম আলোকিত হইবে।
আমাদের স্বপ্ন—২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত বাংলাদেশ গঠন। উন্নত দেশ গঠনে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নসহ জ্বালানি চাহিদা মিটাইতে দরকার বিদ্যুত্ খাতের ব্যাপক উন্নয়ন। ব্যবসায়-বাণিজ্য ও শিল্পের উন্নয়ন, গ্রামকে শহরে রূপান্তর, ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠন, কৃষির উন্নয়ন প্রভৃতি ক্ষেত্রে বিদ্যুতের চাহিদা আমাদের দেশে ক্রমশ বাড়িতেছে। দেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন করা হইয়াছে। এই সকল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধিতে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়িয়া গিয়াছে বহুগুণ। সুতরাং ঘরে ঘরে বিদ্যুত্সুবিধা পৌঁছাইবার পর শিল্প-কলকারখানায় চাহিদামাফিক বিদ্যুত্ সরবরাহের ব্যবস্থা করিতে হইবে। শুধু বিদ্যুত্ উত্পাদন করিলেই চলিবে না, বিদ্যুত্ বিতরণব্যবস্থারও উন্নতি সাধন করিতে হইবে। ত্রুটিপূর্ণ ও জরাজীর্ণ বিদ্যুত্লাইনের কারণে আমাদের দেশে প্রায়শ ঘটিতেছে দুর্ঘটনা। ট্রান্সফরমার বিস্ফোরণ এখনো একটি নিত্যনৈমিত্তিক ও বৃহত্ সমস্যা। কারণ এই ট্রান্সফরমারগুলি মেয়াদোত্তীর্ণ বা ওভারলোডেড। ভৌতিক বিদ্যুত্ বিল এই খাতের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনারই ফসল। এই সকল ভোগান্তি অবশ্যই দূর করিতে হইবে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপনকালে সকল নাগরিকের নিকট বিদ্যুত্সুবিধা আমরা যেইদিন পৌঁছাইয়া দিতে পারিব, সেই দিনটি হইবে একটি ঐতিহাসিক দিন। দেশবাসীর জন্য ইহা একটি স্বর্ণোজ্জ্বল সাফল্য হিসাবে বিবেচিত হইবে।
