জহিরুল হক মাখন
গুণমান যত ভালোই হোক না কেন, চাহিদা না থাকলে কোনো পণ্য কখনোই ব্যবসাসফল বা লাভজনক বলে পরিগণিত হতে পারে না। কোনো পণ্যকে ব্যবসাসফল বা লাভজনক করতে হলে যেভাবেই হোক তার চাহিদা সৃষ্টি করতে হবে। দক্ষ মার্কেটিং ব্যবস্থাপনায় ভোক্তাকে আকৃষ্ট করার মাধ্যমে চাহিদা সৃষ্টি করতে পারলে নিম্নমানের বা ক্ষতিকর পণ্যও ব্যবসাসফল বা লাভজনক পণ্যে পরিণত করা যায়। একইভাবে কোনো পণ্যের অপকারিতা বা ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে ঐ চাহিদা নষ্ট করে দিতে পারলে সেই পণ্য বাজার থেকে তাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। দৃষ্টান্তস্বরূপ মাদককে বেছে নেওয়া যেতে পারে।
মাদক কেবল ক্ষতিকরই নয়, মানুষের একটা মারত্মক মরণফাঁদও বটে। অকালমৃত্যুই মাদকসেবির নিশ্চিত ঠিকানা। তবু মানুষ মাদক সেবন করে। কেন করে? প্রথম দিকে বন্ধুবান্ধবের পাল্লায় পড়ে শখের বশে কিংবা নানা রকম হতাশার কারণে মাদক সেবন শুরু করলেও ঐ ব্যক্তির দেহে মাদকের চাহিদা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকায় সে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। মাদকাসক্তি বা চাহিদা যখন তীব্র আকার ধারণ করে, তখন নিজের চাহিদা মেটাতে সে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। এরপর সে একের পর এক পা রাখতে শুরু করে অন্ধকার জগতে অপরাধের ক্ষেত্রগুলোতে। চুরি-ডাকাতি-ছিনতাই-ধর্ষণ-রাহাজানি এমনকি খুনখারাবি পর্যন্ত হয়ে পড়ে তার নিত্যদিনের সঙ্গী। এভাবে পথ চলতে গিয়ে হঠাত্ একসময় ঢলে পড়ে অনাকাঙ্ক্ষিত অপমৃত্যুর কোলে। সব শেষ। সমাজ ও প্রজন্মের সাম্ভাব্য ধ্বংস আর নিঃশ্বেষ বার্তা রেখে পৃথিবী থেকে অদৃশ্য হয়ে যায় সে।
সমাজে চুরি, ডাকাতি, খুন, সন্ত্রাস, ধর্ষণ, রাহাজানিসহ নানা ধরনের অপকর্মের জন্য দায়ী মাদকের তীব্র চাহিদা এবং এর ভয়াবহ বিস্তার। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে সব বয়সের নরনারীদের একটি বড় অংশকে মাদক গ্রাস করে ফেলেছে। এ অবস্থা থেকে ফিরে আসা আর বাঘের মুখের ভেতর মাথা ঢুকিয়ে গলা থেকে মাছের কাটা বের করে আনা একই কথা। তবু আনতে হবে। সবাইকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। জ্বলে উঠতে হবে আগুণের মতো। ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে আর একটি মুক্তিযুদ্ধে। মাদক নির্মূলের মুক্তিযুদ্ধ। মাদককে রুখতে হবে।
নিজেকে মাদক থেকে দূরে রাখতে হবে। দূরে রাখতে হবে নিজ পরিবারের সবাইকে। ছোটদের মাদকের কুফল ও ভয়াবতা সম্পর্কে বোঝাতে হবে। সন্তানদের নজরদারিতে রাখতে হবে। ছোটদের প্রতি নির্দয় হওয়া যাবে না। তাদের প্রতি মন্দ আচরণ করা যাবে না। শাসনের নামে মন্দ আচরণ করলে তারা বখে যাবে। তাদের প্রতি স্নেহশীল হয়ে ভালো আচরণের মাধ্যমে তাদের সুন্দর মায়াবী পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ করে দিতে হবে।
পরিবারকে মাদকমুক্ত রাখতে বা মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে গৃহিণী বা মাকে সবচেয়ে বেশি অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। একজন আদর্শ গৃহিণী বা মা-ই পারেন তার পরিবারকে সুশৃঙ্খল ও মাদকমুক্ত রাখতে। তার আদরের সন্তানটি কখন কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে, কী করছে—নিয়মিত এসব নজরদারির মাধ্যমে তাকে আদর্শ শিশু হিসেবে গড়ে তুলতে পারেন।
শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বা সরকারের ওপর নির্ভরশীলতা মাদকের ছোবল থেকে শিশু-কিশোর তথা সমাজকে রক্ষা করার একমাত্র পথ হতে পারে না। সমাজের প্রতিটি মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই শিশু-কিশোরদের মাদক থেকে দূরে রেখে মাদকমুক্ত নির্মল সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। আসুন আমরা নিজ দায়িত্বে নিজ নিজ পরিবারকে মাদকমুক্ত রাখার শপথ নিই। নিজের সন্তানের প্রতি যত্নবান হই। তাদের মাদক থেকে দূরে রাখি। মাদকমুক্ত পরিবার গড়ি। গড়ি মাদকমুক্ত সমাজ। নিজে বাঁচি, দেশকে বাঁচাই।
n লেখক :ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক
