বরাদ্দ পাওয়ার পরেও যারা সরকারি বাসায় থাকবেন না, তাদের বেতন থেকে ভাড়া কেটে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় তিনি এই নির্দেশনা দেন। সভা শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনা বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব মো. আসাদুল ইসলাম প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন তুলে ধরে বলেন, সরকারি চাকরিতে বেতন বেড়েছে, সেই সঙ্গে বাড়িভাড়া বাবদ ভাতাও বেড়েছে। অনেকেই বাড়িভাড়া বাবদ যে টাকা পান, সেই টাকায় সরকারি বাড়িগুলোর চেয়ে আরো উন্নত বাড়িতে থাকতে পারেন। সে জন্য অনেকেই সরকারি বাড়ি বরাদ্দ পেয়েও সেখানে থাকেন না। এ কারণে সরকারি অনেক বাড়ি ফাঁকা পড়ে থাকে, অব্যবহূত ও নষ্ট হয়ে যায়। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে যাদের নামে সরকারি বাসা বরাদ্দ হবে, তাদের ঐ বাসায় থাকতে হবে। যদি না থাকেন, তাহলে তারা বাসাভাড়া বাবদ যে ভাতা পাওয়ার কথা, সেটা পাবেন না। বৈঠকে ‘রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর উন্নয়ন’ শীর্ষক একটি সংশোধিত প্রকল্প অনুমোদনকালে প্রধানমন্ত্রী এই নির্দেশনা দেন।
গণভবন থেকে ভার্চুয়াল পদ্ধতে প্রধানমন্ত্রী ও একনেকের চেয়ারপারসন শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলনকক্ষে একনেক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় তিনটি সংশোধিত ও দুটি নতুন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। সংশোধিত প্রকল্পে বাড়তি বরাদ্দ এবং নতুন প্রকল্পের বরাদ্দসহ মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৩০৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা।
সভায় ৫৯৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর উন্নয়ন (প্রথম সংশোধিত) প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে ব্যয় বেড়েছে ২৯৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা। প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন তুলে ধরে আসাদুল ইসলাম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়সহ বড় বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসে যেখানে-সেখানে যেন অপরিকল্পিতভাবে ভবন তৈরি না হয়। এজন্য সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর আরেকটি নির্দেশনার কথা জানিয়ে আসাদুল ইসলাম বলেন, রেট শিডিউল পরিবর্তন করার ফলে প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় দুটোই বেড়ে যায়। এজন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া কোনো রেট শিডিউল বা ক্রয় প্রাক্কলন না করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। অনেক সময় এলজিইডি, ওয়াপদা ও সড়ক বিভাগ তাদের রেট শিডিউল পরিবর্তন করে। অনেকবারই এরকম পরিবর্তন করার কারণে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে যায়। এমন প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী এ নির্দেশনা দেন।
তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী প্রতিটি উপজেলায়ও মাস্টারপ্ল্যান করতে বলেছেন। কারণ প্রতিটি উপজেলায় মিনি স্টেডিয়ামসহ অনেক স্থাপনা তৈরি হচ্ছে। তাই ঐ মাস্টারপ্ল্যানে কোথায় কী হবে, তা যেন সন্নিবেশিত থাকে। তবে প্রতিটি উপজেলায় এক রকম প্ল্যান হবে না, উপজেলার অবস্থান ও উন্নয়ন কার্যক্রমের সঙ্গে পরিকল্পনাও ভিন্ন হতে পারে।
সভায় প্রিপেইড গ্যাস মিটার স্থাপন প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনী অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সব এলাকায় যেন প্রিপেইড গ্যাস মিটার স্থাপন করা হয়, বিশেষ করে শিল্প এলাকায় যেন দ্রুত প্রিপেইড মিটার স্থাপন করা হয়, সে বিষয়েও নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী।
সভায় ৭৯৫ কোটি ১৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নরসিংদী জেলার পল্লি অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ২১২ কোটি ৯১ লাখ টাকা ব্যয়ে খুলনা শহরে পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা নির্মাণের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ শীর্ষক প্রকল্প প্রথম সংশোধিত আকারে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে ব্যয় বেড়েছে ১১৬ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। সভায় ১৮৮২ কোটি ৫৯ লাখ টাকা ব্যয়ে মানবসম্পদ উন্নয়নে গ্রামীণ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি শীর্ষক নতুন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটিতে বিশ্বব্যাংক ও এআইআইবি থেকে ১ হাজার ৮৩১ কোটি টাকা ঋণ পাওয়া যাবে। সভায় জানানো হয়েছে, এ প্রকল্পের মাধ্যমে কোভিড-১৯-এর মতো সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাবের সময় স্কুল ও গণজমায়েত হওয়া স্থানে হাত ধোয়ার স্টেশন নির্মাণ করা হবে। সেই সঙ্গে প্রকল্প এলাকায় হতদরিদ্র জনগণের মধ্যে স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিন স্থাপন করা, স্কুল এবং কমিউনিটি ক্লিনিকসমূহে ওয়াশ পরিষেবাগুলোর ব্যবস্থা ও ব্যবহার বৃদ্ধি করা হবে। আর্সেনিক ও আয়রনের সমস্যায় ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের নির্বাচিত গ্রামগুলোতে কমিউনিটি ও স্থানীয় সরকারের সহযোগিতায় পাইপলাইনের মাধ্যমে নিরাপদ পানি সরবরাহের স্কিম বাস্তবায়ন করা হবে। প্রকল্পটি আগামী জানুয়ারি থেকে শুরু হয়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মেয়াদে দেশের ৩০ জেলার ৯৮ উপজেলায় বাস্তবায়ন করবে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর।
এছাড়া একনেক সভায় ৭৫৩ কোটি ৮৪ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রিপেইড গ্যাস মিটার স্থাপন প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনী অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রথম সংশোধনী থেকে ব্যয় বেড়েছে ২৫৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা। প্রকল্পটি সংশোধনের বিষয়ে সভায় জানানো হয়েছে, নতুন করে আরো ১ লাখ ২০ হাজার প্রিপেইড মিটার সংযোগ দেওয়া হবে। এছাড়া ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় প্রথম সংশোধিত ডিপিপিতে মোট ৩৪টি থানা অন্তর্ভুক্ত ছিল। জাইকার অর্থায়নে ও সুপারিশে আরো সাতটি এলাকা—যাত্রাবাড়ী, বংশাল, গেন্ডারিয়া, লালবাগ, হাজারীবাগ, শাহবাগ ও নিউমার্কেট এলাকাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সভায় জানানো হয়েছে, মিটারের মূল্য ও আয়ুষ্কাল বিবেচনায় বর্তমানে নির্ধারিত মাসিক মিটার ভাড়া ৬০ টাকার স্থলে ১০০ টাকা করা হয়েছে।
