ইত্তেফাক ইতিহাসের অপরিহার্য দলিল

আপডেট : ২৩ ডিসেম্বর ২০২০, ২০:৪৬

যে প্রজন্মের বয়স শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে সত্তরের চৌকাঠ পেরিয়েছে তাদের কাছে ছয় বা ষাটের দশকের স্মৃতি ভীষণ উজ্জ্বল। এই প্রজন্মের অধিকাংশের মনোজগতের ভিত তৈরি হয়েছে উল্লিখিত দশকের উর্বর জমিনে। এমনকি মনোজমিনে সোনার ফসল ফলানোর স্বপ্ন দেখার শুরু এবং স্বপ্ন পূরণের প্রস্তুতিও তো ঐ ছয়ের দশকে। সাতচল্লিশের যে প্রাপ্তিকে মনে করা হয়েছিল অমূল্য ধন তার রঙচটা রূপ ষাটের দশকে এসে অনেকটাই আকর্ষণ হারিয়ে ফিকে এবং অনুজ্জ্বল। সাতচল্লিশে অর্জিত পেয়ারা পাকিস্তান ছয়ের দশকে এসে বর্ণে-গন্ধে-ছন্দে-গীতিতে সত্য সত্যই ‘ফাঁকিস্তান’-এ পরিণত হতে শুরু করে। বায়ান্নের রক্তমাখা পথে যে টালমাটাল পথচলা শুরু, ছয়ের দশকের শুরু থেকেই তা অনেক স্থিত এবং সবল। কারণ গন্তব্য সম্পর্কে তখন ধারণা বেশ স্পষ্ট এবং সেটা হলো দুঃশাসন ও শোষণের হাত থেকে মুক্তি।

বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনের সাফল্যের ভেতরেই জন্ম নিল বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্নবীজ। মাত্র সাত-আট বছরের মধ্যে সেই বীজ অঙ্কুরিত হতে শুরু করল ছয়ের দশকের একেবারে শুরু থেকেই যা দৃশ্যমান। সোহরাওয়ার্দী সাহেব তখনো জীবিত। তার ভাবশিষ্য ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান এবং বাংলার কিংবদন্তি সাংবাদিক-সম্পাদক মরহুম মানিক মিয়া। মানিক মিয়া ছিলেন জনপ্রিয় দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদক। তাকে রাজনৈতিক দলে অর্থাত্ আওয়ামী লীগে আনার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু তিনি কখনো রাজি হননি। মানিক মিয়া সাহেবের অকস্মাত্ প্রয়াণের পর শেখ মুজিবুর রহমানের শ্রদ্ধা জানানো যে আসামান্য রচনাটি এখন আমরা পাঠ করি তাতে দুই জনের সম্পর্কের গভীরতম বন্ধনই কেবল প্রকাশ হয় না, প্রথমোক্ত জনের রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অসাধারণ দিকটিও স্পষ্ট জানা যায়। জানা যায়, সম্পাদক মানিক মিয়া কী গভীর ভালোবাসায় রক্তসহোদরের চেয়েও আপন ভাবতেন রাজনীতিক শেখ মুজিবকে!

মহান ভাষা আন্দোলনের সাফল্যে এবং চেতনায় উজ্জীবিত পূর্ব বাংলার শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি, সমাজ ও শিক্ষা ইত্যাদি ক্ষেত্রে এক নবজাগরণ তৈরি হয় ছয়ের দশকে। সব ক্ষেত্রেই বাংলা ও বাঙালিত্ব প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা। বলার অপেক্ষা রাখে না, এসব কিছুর চালিকাশক্তি ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদপন্থি রাজনীতি দল হিসেবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ছিল কমিউনিস্ট পার্টি। ছিল প্রগতিশীল ছাত্র ও শিক্ষকসমাজ, ছিল সমাজিক ও সাংস্কৃতিক নেতৃবৃন্দ। ১৯৬১ সালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম শতবার্ষিকী পালনে বাধা দেওয়া হয় এবং রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ করে আইয়ুব সরকার। কিন্তু সব বাধাকে উপেক্ষা করে সংস্কৃতিকর্মী এবং শুভবাদী সামাজিক নেতৃবৃন্দ রবীন্দ্রশতবার্ষিকী পালন করেন। এই ঘটনা বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকে অনেকটাই বলবান করে এবং অসম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক চেতনায় বিশ্বাসী সারা দেশের অনেক রাজনীতিবিদদের আস্থার ভিতকে দৃঢ়তর করে। রবীন্দ্রশত বার্ষিকী পালনে যূথবদ্ধ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নেতাকর্মীদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ছিল তখনকার তরুণ আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবের এবং এই আন্দোলনের রাজনৈতিক সমর্থনে তিনি ছিলেন অগ্রণীদের অন্যতম। বাঙালির নবজাগরণের যে কথা একটু আগেই বলছিলাম তার প্রভাব পড়ে সংগীত, সিনেমা, কবিতা, সাংবাদিকতাসহ সব সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে। একই সময়ে প্রগতিশীল ছাত্র আন্দোলন তীব্রতর হয়। পাকিস্তানি ভাবধারায় বিশ্বাসীরা ততদিনে পিছু হটতে শুরু করেছে। কিন্তু শুরু করেছে নানামুখী ষড়যন্ত্র। এই ষড়যন্ত্রের ফলেই ষাটের দশকের প্রথম ভাগে ঘটানো হলো শাশ্বত বাংলার চেতনাবিরোধী কুিসত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। বঙ্গবন্ধু সেই দাঙ্গার বিরুদ্ধে সর্বশক্তি নিয়ে কঠোরভাবে দাঁড়িয়েছিলেন। ইত্তেফাকসহ দেশের কয়েকটি পত্রিকাও তখন রেখেছিল অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভূমিকা। এ ক্ষেত্রে আবারও মরহুম তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে স্মরণ করতে হয়। যে শুভ শক্তিগুলো ষাটের দশকের সব প্রগতিশীল কর্মসূচিকে অকুণ্ঠচিত্তে সমর্থন ও নিয়ন্ত্রণ করেছে দৈনিক ইত্তেফাক তাদের ভেতর অন্যতম। তবে ইত্তেফাককে ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছিল সম্পাদক-কলামিস্ট মরহুম তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার নাম। যিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুসহ প্রায়ক সব রাজনীতিবিদের প্রিয় মানিক ভাই। কোনো প্রলোভন বা মোহ যাকে আদর্শিক অবস্থান থেকে কখনো সরাতে পারেনি। এ কথাও বঙ্গবন্ধুর লেখনী থেকেই প্রাপ্ত। বাঙালির মুক্তির রাজনীতির একজন সত্ পরামর্শক হিসেবে ইত্তেফাকের নির্ভীক অবস্থানের কারণে এবং প্রলোভনের ফাঁদে না জড়িয়ে সততার মূল্য দিতে বঙ্গবন্ধুর প্রিয় মানিক ভাইকে জেলে পর্যন্ত যেতে হয়েছে। আগে উল্লেখ করেছি যে, শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি, শিক্ষা, সমাজ ইত্যাদি ক্ষেত্রে অত্যন্ত সমৃদ্ধ সময় ছিল ছয় বা ষাটের দশক। কিন্তু সব ছাপিয়ে যে ধারাটি ছিল সবচেয়ে বেগবান তা হলো—রাজনীতি এবং সব প্রগতিশীল দলের সঙ্গে থেকেও নেতৃত্বে উঠে আসে আওয়ামী লীগ। তত্কালীন সব শ্রদ্ধাভাজন নেতার সঙ্গে অধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। পাকিস্তান সরকারের কাছে তিনি তখন এক ভীতিকর আতঙ্কের নাম। পূর্ব ও পশ্চিমের দুই প্রদেশের বৈষম্য, পক্ষপাতিত্ব এবং সমান অধিকারের দাবিতে চিরকাল সবর ছিলেন বঙ্গবন্ধু। বিষয়টি জনগণের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায় ’৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের সময়। ১৭ দিনের যুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তান সম্পূর্ণ অরক্ষিত ছিল, দুই প্রদেশের নিরাপত্তার ভারসাম্য না থাকায় পূর্ব পাকিস্তানবাসীর মোহমুক্তি ঘটল তখন, যখন দেখা গেল পূর্ব ফ্রন্টে কোনো প্রতিরক্ষার ব্যবস্থাই নেই। বঙ্গবন্ধুর মনে তখন স্বাধিকার আদায়ের সংকল্প তীব্র ও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মাত্র পাঁচ বছরের মাথায় যা স্বাধীনতা সংগ্রামে রূপ নেয় বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে। আর এই সময়টাতে ইত্তেফাক ইতিহাসের অপরিহার্য অংশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ এবং নির্ভীক সাংবাদিকতার দৃষ্টান্ত হয়ে পাঠক প্রিয়তার তুঙ্গ স্পর্শ করে। বাঙালির  মুক্তি, বাঙালির নিজস্ব স্বাধীন ভূখণ্ড, এমনকি জাতীয় সংগীত বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর সিদ্ধান্ত নেওয়া ছিল অনেক আগে থেকেই। ১৯৬৬ সালে ‘আমাদের বাঁচার দাবী ও ৬ দফা’ পেশ করার পরই স্পষ্ট হয়ে যায়—বাংলা ও বাঙালির ভবিষ্যত্ নিয়ে বঙ্গবন্ধুর চাওয়া-পাওয়ার হিসাব। পাকিস্তান সরকার এবং পাকিস্তানি একচোখা রাজনীতিবিদদের বুঝতে দেরি হয় না যে, শেখ মুজিবের ৬ দফা পাকিস্তানের শিকরের প্রতি আঘাত। অপরদিকে, বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী অধিকাংশ পূর্ব পাকিস্তানিদের কাছে বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা ছিল মুক্তির সনদ। আওয়ামী লীগের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তত্কালীন নেতা বঙ্গবন্ধুর ৬ দফাকে সাদরে গ্রহণ করেননি। এমনকি ইতিহাসবিদদের লেখায় পাওয়া যায় যে, বঙ্গবন্ধুর রক্তসহোদরতুল্য অতিঘনিষ্ঠ মরহুম মানিক মিয়াও নাকি ৬ দফার কোনো কোনো দফাকে স্বীকার করেননি। কিন্তু ইত্তেফাকই তখন একমাত্র পত্রিকা যেখানে প্রতিদিন ৬ দফা সংক্রান্ত জনসভাগুলোর বিবরণ ছাপা হয়েছে। সারা দেশের রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে নিয়মিত তথ্য পরিবেশন করেছে বলেই বাঁচার দাবি ৬ দফা দাবির আন্দোলন এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা ঘরে ঘরে পৌঁছানোর ঐতিহাসিক দায়িত্ব ইত্তেফাকই পালন করেছে। তাই বলতে দ্বিধা নেই, বাংলাদেশের জন্ম-ইতিহাস লিখতে গেলে ইত্তেফাক এবং মরহুম মানিক মিয়ার প্রসঙ্গ বারবার উচ্চারিত হবে।

 

লেখক : আহ্বায়ক, সম্প্রীতি বাংলাদেশ এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।