বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম ১৯২০ সালে গোপালগঞ্জে, মানিক মিয়ার জন্ম ১৯১১ সালে পিরোজপুরে। সে হিসেবে মানিক মিয়া শেখ মুজিবের চেয়ে ৯ বছরের বড়। শেখ মুজিবের সঙ্গে মানিক মিয়ার ঘনিষ্ঠতা জন্মে চল্লিশের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে। শেখ মুজিব যখন কলকাতায় ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র, তখন মানিক মিয়া কলকাতায় সাংবাদিকতায় সম্পৃক্ত ছিলেন। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন অত্যন্ত জোরদার হয়ে উঠেছে। মানিক মিয়া এবং শেখ মুজিব দুজনই ছিলেন রাজনীতি সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন। চল্লিশের দশকে কলকাতা ছিল বাঙালিদের রাজনীতি চর্চার কেন্দ্রস্থল। ভারত থেকে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটবে, এটি যখন প্রায় নিশ্চিত সেই সময় মুসলিম রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে দাবি উঠে ভারতকে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে বিভাজন করতে হবে বলে। মুসলিম লীগের নেতা তখন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। তার নেতৃত্বে পাকিস্তান আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ব্রিটিশ সরকার ভারত ভাগের সময় দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতেই ভারতকে ভাগ করে।
চল্লিশের দশকে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে বাঙালি মুসলিম নেতাদের মধ্যে এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
১৯৪৩ সালে শেখ মুজিব যখন কলকাতার ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র, তখন মানিক মিয়ার কর্মক্ষেত্র কলকাতা। ভারত ভাগ এবং পাকিস্তান আন্দোলন তখন তুঙ্গে। একদিকে কংগ্রেস, অপরদিকে মুসলিম লীগ। পরিস্থিতি তখন এমন দাঁড়ায় যে, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সঙ্গে নানারকম মতবিরোধ থাকলেও বাঙালি মুসলিম নেতাদেরকে শেষ পর্যন্ত মুসলিম লীগের সঙ্গেই হাত মিলিয়ে কাজ করতে হচ্ছিল। কলকাতায় সে সময় বাঙালিদের প্রধান প্রগতিশীল নেতা শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং আবুল হাসেম। মওলানা ভাসানী তখন আসাম-সিলেট অঞ্চলে অবস্থান করছিলেন। কলকাতায় যে সমস্ত প্রখ্যাত বাঙালি নেতা অবস্থান করছিলেন, নীতি-নৈতিকতার দিক থেকে তাদের মধ্যে নানারকম অনৈক্য ছিল।
শেখ মুজিব শেরে বাংলা ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী দুজনকেই নেতা হিসেবে গভীর সমীহ করতেন। তবে আদর্শের দিক থেকে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে তুলনামূলকভাবে বেশি ঘনিষ্ঠ ছিলেন। মানিক মিয়ার ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার ঘটেছিল। আদর্শগতভাবে মানিক মিয়াও সোহরাওয়ার্দী সাহেবকে অধিক পছন্দ করতেন। বিভিন্ন ঘটনা পর্যালোচনা করলেই তা স্পষ্ট প্রমাণিত হবে। মানিক মিয়ার সঙ্গে কলকাতাতেই শেখ মুজিবের হূদ্যতা গড়ে ওঠে। ‘অসমাপ্ত আ্ত্তজীবনী’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে—‘মানিক ভাই তখন কলকাতার ইত্তেফাক কাগজের সেক্রেটারি ছিলেন। আমাদের টাকাপয়সার খুবই প্রয়োজন। সে দিবে। বাড়ি থেকে নিজেদের লেখাপড়ার খরচটা কোনোমতে আনতে পারি। কিন্তু রাজনীতি করার টাকা কোথায় পাওয়া যাবে? আমার একটু সচ্ছল অবস্থা ছিল, কারণ আমি ইত্তেফাক কাগজের পূর্ব পাকিস্তান প্রতিনিধি ছিলাম।’ (অসমাপ্ত আ্ত্তজীবনী, পৃ. ৮৮)
১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় সিলেট অঞ্চল নিয়ে একটা বড় রকমের সমস্যা দেখা দেয়। সিলেটে একটা গণভোটের আয়োজন করা হয়। উক্ত গণভোটে সোহরাওয়ার্দী সাহেব অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। শেখ মুজিব লিখেছেন— ‘শেখ মুজিব আরো লিখেছেন— ‘মওলানা তর্কবাগিশ, মানিক ভাই, ফজলুল হক ও আমি ৫০০ কর্মী নিয়ে সিলেট পৌঁছি। আমাদের জন্য সিলেটের গণভোট কমিটির কিছুই করতে হয় নাই—শুধু কোন এলাকায় কাজ করতে হবে, আমাদের সেখানে পৌঁছিয়ে দিতে হয়েছে। যাবতীয় খরচপত্রের ব্যবস্থা শহীদ সাহেব করে দিয়েছিলেন।’ (অসমাপ্ত আ্ত্তজীবনী, পৃ. ৭৫-৭৬) এ সমস্ত লেখা থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, শেখ মুজিব এবং মানিক মিয়া তাদের কলকাতা জীবনেই একসঙ্গে কাজ করেছেন এবং তারা দুজনই ছিলেন রাজনৈতিকভাবে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নিষ্ঠাবান অনুসারী। পাকিস্তান যে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছিল, সে বিবেচনায় পশ্চিমবঙ্গের বিভাজন হওয়ার কথা নয়। সোহরাওয়ার্দী অনেকটা নিশ্চিত ছিলেন কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গ পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হবে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গকে দ্বিখণ্ডিত করে খানিকটা পূর্ব পাকিস্তানে কলকাতাসহ খানিকটা হিন্দুস্তানের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি ছিল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর এক ধরনের কূট কৌশল। সেই কূট কৌশলের ফলে সোহরাওয়ার্দী এবং তার অনুসারীবৃন্দ মারাত্মক হতাশায় নিমজ্জিত হন। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণে শেষ পর্যন্ত মানিক মিয়া ও শেখ মুজিবকে পূর্ববঙ্গে ফিরে আসতে হয়। জন্মগতভাবে মানিক মিয়া এবং শেখ মুজিবের পিতৃগৃহ ছিল পূর্ব পাকিস্তানের ভৌগোলিক এলাকায়, কিন্তু সোহরাওয়ার্দীর কোনো বাসগৃহ পূর্ব পাকিস্তানে বা পশ্চিম পাকিস্তানে ছিল না। পূর্ব পাকিস্তানে সোহরাওয়ার্দীর মূল ভরসা তখন তার নিষ্ঠাবান রাজনৈতিক শিষ্য মানিক মিয়া এবং শেখ মুজিব। যে পাকিস্তানের স্বপ্ন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মানিক মিয়া, শেখ মুজিব দেখেছিলেন পশ্চিমবঙ্গে বিভাজন দেখেই শেখ মুজিব বুঝতে পারেন পাকিস্তানে বাঙালির কোনো কল্যাণ হবে না। ১৯৪৭ সালের ৩রা জুন ব্রিটিশ সরকার ভারত ও পাকিস্তানকে স্বাধীনতা দানের কথা ঘোষণা করার পরপরই শেখ মুজিব ইসলামিয়া কলেজের সিরাজদ্দৌলা হলে ছাত্র ও যুবনেতাদের নিয়ে রুদ্ধদ্বার কক্ষে মিলিত হয়েছিলেন। শেখ মুজিব স্পষ্ট বুঝতে পারছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের জন্য পাকিস্তান কোনো কল্যাণ বয়ে আনবে না। উক্ত সভায় শেখ মুজিব স্পষ্ট জানিয়ে দেন—‘স্বাধীনতার জন্য বাংলাদেশের পবিত্র মাটিতে যেতে হবে, কেন না আমার আশঙ্কা হচ্ছে, এ স্বাধীনতা সত্যিকার স্বাধীনতা নয়’। (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, মযহারুল ইসলাম, পৃ. ৭৮)
শেখ মুজিব ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠাকালে যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন তার প্রতিফলন খুব অল্প সময়েই লক্ষ্য করা যায়। ১৯৪৮ সালে রেসকোর্স ময়দানে জিন্নাহ যখন ঢাকায় এসে ঘোষণা করেন উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা, তখন বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায় এবং বুঝতে বাকি থাকে না পূর্ব পাকিস্তান হবে পশ্চিম পাকিস্তানের একটি শোষণের জায়গা। ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে শেখ মুজিব ছাত্রদেরকে সংগঠিত করে গঠন করেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ। ভাষা আন্দোলন করতে গিয়ে তত্কালীন পাকিস্তান সরকারের রোষানলে পড়েন শেখ মুজিব। তাকে কারাবন্দি করা হয়। দেশের যারা প্রবীণ রাজনীতিবিদ ছিলেন, তারা বুঝতে পারলেন ছাত্রলীগের মতো তাদেরকেও মুসলিম লীগের বিপরীতে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করা প্রয়োজন, সেই প্রয়োজন থেকেই মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে গঠন করা হয়—‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম আওয়ামী লীগ’। সে সময় জেলখানায় ছিলেন শেখ মুজিব। জেলে বন্দি অবস্থায় শেখ মুজিবকে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মনোনীত করা হয়। পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক অঙ্গনে ১৯৪৯ সালের ২৩ শে জুন তারিখে আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম একটি ঐতিহাসিক ঘটনা।
আওয়ামী লীগের যারা নেতৃত্বে ছিলেন, তারা উপলব্ধি করতে পারেন একটি রাজনৈতিক দলের একটি পত্রিকা না থাকলে দলটির প্রচার কাজ ঠিকমতো করা যায় না। সেই লক্ষ্যে তারা একটি পত্রিকা প্রকাশের কথা ভাবতে থাকেন। সকলের দৃষ্টি তখন মানিক মিয়ার দিকে। তিনি ইত্তেফাক পত্রিকার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। মানিক মিয়া চেষ্টা করেছিলেন কলকাতা থেকে প্রকাশিত ইত্তেফাক পত্রিকাটিকে ঢাকায় নিয়ে আসা যায় কি না। নানা কারণে ইত্তেফাক পত্রিকাটিকে কলকাতা থেকে ঢাকায় স্থানান্তর সম্ভবপর হয়নি। এদিকে আওয়ামী লীগের জন্য একটি পত্রিকা তখন অত্যন্ত জরুরি। মানিক মিয়া গভীর আন্তরিকতার সঙ্গে একটি পত্রিকা প্রকাশের জন্য এগিয়ে আসেন। যার ফলে দেখা যায় ১৯৪৯ সালের ১৫ আগস্ট সাপ্তাহিক হিসেবে ইত্তেফাক যাত্রা শুরু করে। পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন মানিক মিয়া এবং প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে থাকেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। প্রকাশক হন ইয়ার মোহাম্মদ খান। সাপ্তাহিক ইত্তেফাক পত্রিকাটির প্রথম সংস্করণ ঢাকার ৯ হাট খোলা রোডে অবস্থিত প্যারামাউন্ট প্রেস থেকে মুদ্রিত এবং ৯৪ নবাবপুর থেকে প্রকাশিত হয়। আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তার পাশাপাশি সাপ্তাহিক ইত্তেফাকেরও জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। আওয়ামী লীগের মুখপত্র হিসেবে চারদিক থেকে সাপ্তাহিক ইত্তেফাককে দৈনিক ইত্তেফাকে রূপান্তরের দাবি ওঠে। আওয়ামী লীগকে জনসাধারণের কাছাকাছি নিয়ে যেতে হলে ইত্তেফাক পত্রিকাটিকে প্রতিদিন প্রকাশ করতে পারলে বড় কাজ হবে। ১৯৫২ সালে ভাষার জন্য জীবন উত্সর্গ পাকিস্তানের রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে জনসাধারণ আন্দোলনমুখি হয়ে উঠতে থাকে। দেশের মানুষ মুসলিম লীগের বিকল্প হিসেবে আওয়ামী লীগকে সমর্থন দিতে শুরু করে। এজন্য ইত্তেফাকের ভূমিকা কম নয়। শুরুতে মওলানা ভাসানী সভাপতি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এর মধ্যে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে শেখ মুজিব আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে অনুরোধ জানান। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীও উপলব্ধি করতে পারেন, পশ্চিম পাকিস্তানের নেতৃবৃন্দ তাকে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারছেন না। তাদের মধ্যে রয়েছে নানারকম হিসেব-নিকেশ এবং কলাকৌশল। সোহরাওয়ার্দী সাহেবকে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে নিয়ে আসা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করলেন শেখ মুজিব। তার সঙ্গে যুক্ত হলেন মানিক মিয়া। সোহরাওয়ার্দীর হাতে গড়া দুজন যোগ্য শিষ্য মানিক মিয়া এবং শেখ মুজিব। তাদের অনুরোধে সোহরাওয়ার্দী আওয়ামী লীগের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করলেন।
সোহরাওয়ার্দী উপলব্ধি করেন আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী করতে ইত্তেফাককে শক্তিশালী করতে হবে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে সোহরাওয়ার্দী নিজ অর্থায়নে ইত্তেফাকের জন্য কিছু জমি এবং প্রেস কিনে দেন। সোহরাওয়ার্দীর পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯৫৩ সালে সাপ্তাহিক ইত্তেফাক দৈনিক ইত্তেফাকে রূপান্তরিত হয়। ১৯৫৩ সালের ২৪শে ডিসেম্বর তারিখে দৈনিক পত্রিকা হিসেবে ইত্তেফাকের প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়। ১৯৫৪ সালে হক-ভাসানী এবং সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে যখন যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়, ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার ব্যাপারে ইত্তেফাক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
১৯৫৮ সালে জেনারেল আইয়ুবের সেনা শাসনের বিরুদ্ধে ইত্তেফাক সোচ্চার থাকার কারণে ইত্তেফাক সম্পাদক মানিক মিয়াকে নানারকম নির্যাতনের শিকার হতে হয়। সামরিক শাসনবিরোধী কলাম লেখার অপরাধে মানিক মিয়াকে ১৯৫৯ সালে একবার গ্রেফতার করা হয়। এর ফলে শেখ মুজিবের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা বেড়ে যায়। শেখ মুজিব যেমন নীতির ক্ষেত্রে কারো কাছে মাথা নত করেননি, মানিক মিয়াও একই আদর্শ অনুসরণ করতে থাকেন। এর ফলে আইয়ুব খান শেখ মুজিব এবং মানিক মিয়াকে ১৯৬২ সালের ৪ঠা ফেব্রুয়ারি তারিখে গ্রেফতারের ব্যবস্থা করেন। দীর্ঘ ৯ মাস কারাভোগের পর ১৯৬২ সালের ৪ঠা অক্টোবর তারিখে মানিক মিয়া জেলখানা থেকে মুক্তি লাভ করেন।
ষাটের দশক আওয়ামী রাজনীতির জন্য অত্যন্ত কঠিন সময়। ১৯৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর ফলে আওয়ামী লীগের ওপর মারাত্মক দুর্যোগ নেমে আসে। মানিক মিয়া এবং শেখ মুজিবের রাজনৈতিক গুরু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। নেতার আকস্মিক মৃত্যুতে দেশ দিশাহারা, আওয়ামী লীগ দিশাহারা। ৬ ডিসেম্বর (১৯৬৩) ইত্তেফাক সম্পাদক মানিক মিয়া শিরোনাম লিখলেন— ‘পাকিস্তানের ভাগ্যাকাশের উজ্জ্বল জ্যোতিস্ক নিপীড়িত জনতার অকৃত্রিম সুহূদ শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মহাপ্রয়াণ’।
সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুকে অস্বাভাবিক বলে অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করে থাকেন। কেউ কেউ ধারণা করেন যে, আইয়ুব খানের নির্দেশে তাকে বিশেষ ইনজেকশন দিয়ে হত্যা করা হয়। সোহরাওয়ার্দী তখন লন্ডন থেকে বৈরুতে এসে এক হোটেলে অবস্থান করছিলেন। ইত্তেফাক সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে চিঠিতে দেশে ফেরার জন্য আকুল বাসনার কথা তিনি জানিয়ে দিয়েছিলেন। তবে তার বিরুদ্ধে হত্যার ষড়যন্ত্র চলছে, মানিক মিয়াকে লেখা চিঠিতে তার কিছু আভাস পাওয়া যায়। চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন— “Of course this is for you only. If I die, I shall be happy. There is no paint in living I am of no further use to anybody and if of use to myself them life is not work it.”
ডিসেম্বরের ৮ তারিখে সোহরাওয়ার্দীর মরদেহ বৈরুত থেকে করাচি হয়ে ঢাকায় আনা হয়। তাকে ঢাকা বিমানবন্দরে নামানোর সঙ্গে সঙ্গে মানিক মিয়া, শেখ মুজিবসহ লাখ লাখ মানুষ কান্নায় ভেঙে পড়েন। মানিক মিয়া এবং শেখ মুজিবের সিদ্ধান্ত মোতাবেক রমনা রেসকোর্সের কাছে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের মাজারের পাশে তাকে কবর দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
শেখ মুজিব নিজের জীবন তুচ্ছ করে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েন। ইত্তেফাক সম্পাদক মানিক মিয়া শেখ মুজিবের পাশে গিয়ে অবস্থান গ্রহণ করেন। মানিক মিয়া ইত্তেফাকের সম্পাদকীয় কলামে বলিষ্ঠ কণ্ঠে উচ্চারণ করেন—‘সীমান্তের অপর পারে যাহাই ঘটুক, আমাদের স্বদেশ ভূমিকে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ও আত্মঘাতী রক্তপাত হইতে মুক্ত রাখিবার জন্য এদেশের কৃষক, মজুর, মধ্যবিত্ত, ছাত্র, বুদ্ধিজীবী সকলের প্রতি আমরা পুনর্বার আহ্বান জানাইতেছি।’ এই সম্পাদকীয় লিখবার ফলে উগ্র মৌলবাদী শক্তি ইত্তেফাক অফিসে মারাত্মকভাবে হামলা চালায়। তবে হামলা চালিয়ে মানিক মিয়া এবং ইত্তেফাকের কণ্ঠকে রুদ্ধ করা যায়নি। বরং আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন জোরদার হতে থাকে। মানিক মিয়া বুঝতে পারেন সোহরাওয়ার্দী সাহেবের মৃত্যুর ফলে রাজনীতিতে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে, শেখ মুজিবকেই সে শূন্যতা পূরণ করতে হবে। এ মুহূর্তে শেখ মুজিবের কোনো বিকল্প নেই। শেখ মুজিবের প্রতি মানিক মিয়া এবং ইত্তেফাকের অকুণ্ঠ সমর্থন শেখ মুজিবকে এই দুঃসময়ে অসামান্য সাহস জুগিয়েছে। শেখ মুজিব একের পর এক নতুন নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করতে থাকেন।
শেখ মুজিব প্রদত্ত কর্মসূচি পূর্ব পাকিস্তানের আপামর জনসাধারণের কাছ থেকে আন্তরিক সমর্থন পাওয়ায় আইয়ুব খান বিচলিত বোধ করতে থাকেন। ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানের মানুষদেরকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেন ভারত ইচ্ছে করলেই পূর্ব পাকিস্তানকে দখল করে নিতে পারত। কারণ পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের সময় পূর্ব পাকিস্তান ছিল সম্পূর্ণ অরক্ষিত। এর মধ্যে এসে যায় ১৯৬৬ সাল। শেখ মুজিব প্রণয়ন করেন ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবি। শেখ মুজিবের ৬ দফা দাবি প্রকৃত অর্থে ছিল পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার দাবি। মানিক মিয়া ৬ দফা দাবির পক্ষে শেখ মুজিবের আন্দোলনকে অকুণ্ঠ সমর্থন দান করেন।
প্রসঙ্গক্রমে একটি ঘটনার বিষয় এখানে তুলে ধরছি। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে যে ‘তাসখন্দ’ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, সেই তাসখন্দ চুক্তিকে কেন্দ্র করে কিছু সংখ্যক পশ্চিম পাকিস্তানি রাজনীতিবিদ আবার রাজনীতির জুয়া খেলাকে জীবন্ত করবার জন্য নানারকম কলাকৌশল শুরু করেন। এরা ১৯৬৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে একটি জাতীয় কনফারেন্স আহ্বান করেন। শেখ মুজিব তখন নানা মামলার আসামি। কনফারেন্সে যোগ দিতে তার ভালো লাগছিল না। যার ফলে শেখ মুজিব এই সম্মেলনে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন। এই সময় আওয়ামী লীগের নিখিল পাকিস্তানি সভাপতি ছিলেন নসরুল্লাহ খান। লাহোর কনফারেন্সে যোগদান করতে শেখ মুজিব অস্বীকার করায় ‘নসরুল্লাহ খান’ ছুটে আসেন পূর্ব বাংলায়। অনেক আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হয় পূর্ব বাংলা থেকে প্রতিনিধি দল পাঠানো হবে। শেখ মুজিব নিজে না গিয়ে অন্যদেরকে পাঠানোর কথা ভাবছিলেন। কিন্তু ইত্তেফাক সম্পাদক মানিক মিয়া বললেন ‘মুজিব মিয়া (এই নামেই তিনি শেখ মুজিবকে সবসময় ডাকতেন) যদি যেতেই হয়, আপনিই যান। আর আপনার মনে এতকাল যে কথাগুলো আছে সেগুলো লিখে নিয়ে যান, ওরা শুনুক না শুনুক, এতে কাজ হবে।’ (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, পৃ. ২৭৩)
৬ দফা যদিও শেখ মুজিব গোপন রাখতে চেয়েছিলেন। ৬ দফা তিনি টাইপ করিয়েছিলেন আলফা ইনসিওরেন্স কোম্পানির অফিস কক্ষে। ৬ দফার একটি টাইপ করা কপি গোপনে হস্তগত করেছিলেন তত্কালীন তরুণ সাংবাদিক আবদুল গাফফার চৌধুরী। ৪ঠা ফেব্রুয়ারি (১৯৬৬) তারিখে নিখিল পাকিস্তান জাতীয় কনফারেন্সে যোগদানের জন্য শেখ মুজিব তার সঙ্গী-সাথীদেরকে নিয়ে লাহোরের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন। সাংবাদিক আবদুল গাফফার চৌধুরী খসড়া ৬ দফা যে কপিটি গোপনে সংগ্রহ করেছিলেন ‘সান্ধ্য-দৈনিক’ আওয়াজ পত্রিকায় এই প্রথম ৬ দফার খসড়াটি প্রকাশ করে দেন। সম্মেলনে বসবার আগেই ৬ দফা প্রকাশ পাওয়ায় আওয়ামী লীগের অনেক নেতা বিরক্ত হয়েছিলেন, তবে এতে ক্ষতি না হয়ে লাভই হয়েছিল, কেন না রীতিমাফিক পদ্ধতিতে ৬ দফা নেতার দ্বারা কনফারেন্সে উপস্থাপনের পূর্বেই একটি ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়ে থাকল। ফেব্রুয়ারির ৫ তারিখে (১৯৬৬) কনফারেন্সের সাবজেক্ট কমিটির মিটিংয়ে শেখ মুজিব তার ৬ দফা দাবি পেশ করেন। সাবজেক্ট কমিটিতে ৬ দফা গৃহীত হয় না। ৬ তারিখে পশ্চিম পাকিস্তানের কয়েকটি পত্রিকা ৬ দফাকে বিকৃত করে প্রকাশ করে এবং শেখ মুজিব যে দেশের দুই অংশকে বিচ্ছিন্ন করতে উদ্যোগী হয়েছেন, একথাই জোরালো ভাষায় প্রচার করা হয়। ৬ দফার ব্যাপারে পশ্চিম পাকিস্তানের নেতৃবৃন্দের অনমনীয় মনোভাব দৃষ্টে শেখ মুজিব জাতীয় কনফারেন্সে যোগদান থেকে বিরত থাকেন। ১১ ফেব্রুয়ারি (১৯৬৬) তারিখে শেখ মুজিব তার সঙ্গীদেরসহ ঢাকায় ফিরে এসে বিমানবন্দরেই সাংবাদিকদের নিকট তার ৬ দফা সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট ধারণা প্রদান করেন এবং এই দাবির প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানি নেতৃবৃন্দের অনীহার কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলিষ্ঠতার সঙ্গে উচ্চারণ করেন— ‘এখন কথা নয়, সংগ্রাম শুরু করতে হবে’।
শেখ মুজিবের ৬ দফার সংগ্রামে সবচেয়ে বড় যোদ্ধা হিসেবে শেখ মুজিব পেয়েছিলেন মানিক মিয়া এবং তার পত্রিকা ইত্তেফাককে। শেখ মুজিব লাহোরে কনফারেন্সে যোগদান থেকে বিরত ছিলেন বটে, তবে ১০ই ফেব্রুয়ারি (১৯৬৬) তারিখে তিনি লাহোরে এক সাংবাদিক সম্মেলনে জাতীয় সম্মেলন সম্পর্কে তার সুস্পষ্ট বক্তব্য তুলে ধরেন। দৈনিক ইত্তেফাক তার সেই বক্তব্যকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ করে। ৬ দফা আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ইত্তেফাক সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ইত্তেফাক পত্রিকায় নিয়মিত সম্পাদকীয় লিখতে শুরু করেন। মানিক মিয়া বুঝতে পেরেছিলেন শেখ মুজিবের ৬ দফা আন্দোলন প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন ছাড়া আর কিছু নয়। শেখ মুজিবের আন্দোলনকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াকে মানিক মিয়া তার নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেন। ইত্তেফাক পত্রিকায় ‘মোসাফির’ নামে কলাম লিখে সরকারের বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টিতে মানিক মিয়া অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। সংবাদ জগতের নির্ভীক সৈনিক পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সোচ্চার কণ্ঠ ইত্তেফাকের সবচেয়ে জনপ্রিয় অঙ্গ ‘রাজনৈতিক মঞ্চের’ লেখক মোসাফির তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দেওয়ার উদ্দেশে আইয়ুব-মোনেম চক্রের লিপি মোতাবেক পুলিশ পাকিস্তান দেশ রক্ষা বিধির ৩২(১)-খ ধারা অনুযায়ী তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে গ্রেফতার করে। এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, আইয়ুব সরকার রাজনৈতিক নেতা হিসেবে শেখ মুজিবকে যেমন ভয় পেয়েছিলেন, সাংবাদিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকেও তেমনি ভয় পেয়েছিলেন।
৬ দফার আন্দোলন দিন দিন এত বেশি তীব্র হয়ে উঠতে থাকে যে, শেখ মুজিবকে রাষ্ট্রদ্রোহী প্রমাণ করে তাকে ফাঁসিতে ঝোলানো যায় কি না, সেই পথে হাঁটতে থাকেন আইয়ুব খান। কারণ সহজে ক্ষমতা ছাড়ার ব্যক্তি তিনি নন। সেই লক্ষ্যে ১৯৬৮ সালে শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা বলা হলেও সরকারিভাবে এ মামলাটি ছিল ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব’। এ থেকে স্পষ্ট অনুমান করা যায় শেখ মুজিবকে ফাঁসিতে ঝোলানোর লক্ষ্যেই মামলাটি সাজানো হয়েছিল।
আগরতলা মামলা যখন চলতে থাকে, ইত্তেফাক পত্রিকায় মানিক মিয়া শেখ মুজিবের পক্ষে অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে খবর প্রচার করতে থাকেন এবং মোসাফির নামের কলামে প্রকৃত সত্য উদ্ধারের চেষ্টা করেন। ১৯৬৮ সালের ১৯ শে জুন বিপুল সংখ্যক দেশি-বিদেশি সাংবাদিক ও টেলিভিশন প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে কুর্মিটোলা সেনানিবাসে পাকিস্তানকে সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন আগরতলা ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনীত রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবের প্রতি শুধু নৈতিক সমর্থন দেননি, তিনি নানাভাবে আর্থিক সহযোগিতাও দিয়েছেন। ইত্তেফাকের সম্পাদক হিসেবে তিনি কলম হাতে শেখ মুজিবের পক্ষে রীতিমতো যুদ্ধ চালিয়ে গেছেন। শেখ মুজিবের পক্ষে জনমত সৃষ্টির ক্ষেত্রে ইত্তেফাকের ভূমিকা ছিল অতুলনীয়। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিচার কাজ শুরু হওয়ার পর শেখ মুজিবের জনপ্রিয়তা আরো বেড়ে যায়। ২৮ শে জানুয়ারি ১৯৬৯ সাল, সময় সকাল ১০টা বেজে পনেরো মিনিট। .কুর্মিটোলা সেনা ছাউনির অভ্যন্তরে বিশেষ ট্রাইব্যুনালের সামনে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে শেখ মুজিব যে লিখিত জবানবন্দি পেশ করেন, ইতিহাসে তা অমর হয়ে থাকবে। মানিক মিয়া অত্যন্ত যত্ন সহকারে শেখ মুজিবের লিখিত জবানবন্দি ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশের ব্যবস্থা করেন। শুধু তাই নয়, মানিক মিয়া শেখ মুজিবের জবানবন্দির আলোকে ইত্তেফাক পত্রিকায় সম্পাদকীয় লিখে অপরিসীম সাহসিকতার পরিচয় দেন। শুধু শেখ মুজিবের জবানবন্দি নয়, অন্যান্য আসামিদের জবানবন্দিও ইত্তেফাক পত্রিকায় অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করা হয়।
মানিক মিয়ার সঙ্গে শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগের সম্পর্ক কতটা ঘনিষ্ঠ ছিল তার একটি উদাহরণ তুলে ধরছি। ১৯৬৮ সালের ১৯ শে অক্টোবর ঢাকায় আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। শেখ মুজিব তখন ক্যান্টনমেন্টে বন্দি। শেখ মুজিবের অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম কাউন্সিল অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। সম্মেলনের প্রধান অতিথি করা হয় ইত্তেফাক সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে। সম্মেলনের প্রধান অতিথি হিসেবে সব রাজনৈতিক দলকে পুনরায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে গণআন্দোলনে শরিক হওয়ার আহ্বান জানান। মানিক মিয়ার গণআন্দোলনে শরিক হওয়ার আহ্বান কার্যকর হতে খুব বেশি সময় লাগেনি। শত বাধা সত্ত্বেও সংগ্রামী জনতার উত্তাল তরঙ্গের আঘাতে আইয়ুব শাহীর সিংহাসন কেঁপে উঠল। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় সরকারপক্ষে যাদের সাক্ষী দেওয়ার কথা ছিল, তারাও বৈরী হয়ে উঠল। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা জনতার চাপের মুখে নড়বড়ে হয়ে উঠতে থাকল। বাধ্য হয়ে ১লা ফেব্রুয়ারি (১৯৬৯) বেতার ভাষণে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব কিছুটা নতি স্বীকার করে বললেন—‘শিগিগরই আলাপ-আলোচনার জন্য আমি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিদেরকে আমন্ত্রণ জানাব।’
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা চলাকালীন মানিক মিয়া এবং ইত্তেফাক পত্রিকা বলিষ্ঠভাবে শেখ মুজিবের পক্ষ অবলম্বন করায় ইত্তেফাকের প্রতি দমনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। সেখানেও প্রেসিডেন্ট খানিকটা নমনীয় নীতি গ্রহণ করতে বাধ্য হন। ৬ ফেব্রুয়ারি (১৯৬৯) প্রেসিডেন্ট আইয়ুব ঢাকায় এসে সাংবাদিকদেরকে বলেন, দেশে জরুরি অবস্থা প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। পরদিন অপর এক সাংবাদিক সম্মেলনে দেশ রক্ষা আইন ও অর্ডিন্যান্স প্রয়োগ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। ফলে ৮ ফেব্রুয়ারি (১৯৬৯) দৈনিক ইত্তেফাকের ছাপাখানা ‘নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস’-এর ওপর থেকে বাজেয়াপ্ত আদেশ প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।
এই পর্যায়ে প্রেসিডেন্ট একটি গোল টেবিল বৈঠকের প্রস্তাব দেন। সে প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগ স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার ও শেখ মুজিবের মুক্তি ছাড়া আওয়ামী লীগ গোল টেবিল বৈঠকে যোগ দেবে না।
১৫ ফেব্রুয়ারি (১৯৬৯) তারিখে এক অভাবনীয় ঘটনা ঘটে যায়। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হককে ক্যান্টনমেন্টের অভ্যন্তরে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়। ১৮ ফেব্রুয়ারি তারিখে নির্মমভাবে গুলি এবং বেয়োনেটের আঘাতে হত্যা করা হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. শামসুজ্জোহাকে। তাকে হত্যা করবার সঙ্গে সঙ্গে সমগ্র দেশ জুড়ে বিদ্রোহের আগুন দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে। দেশে গণঅভ্যুত্থান ঘটে যায়। গণঅভ্যুত্থানের মুখে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে শেখ মুজিবকে জেলখানা থেকে মুক্ত করে দিতে বাধ্য হন ২২ শে ফেব্রুয়ারি তারিখ। ২৩ শে ফেব্রুয়ারি তারিখে ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে লক্ষ মানুষের সমাবেশে শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং শেখ মুজিবের মুক্তির ব্যাপারে মানিক মিয়া এবং ইত্তেফাকের ভূমিকা ছিল গৌরবোজ্জ্বল। ২২ শে ফেব্রুয়ারি ইত্তেফাক পত্রিকায় লেখা হয়—‘পূর্ব বাংলার মাটিতে অবশেষে বাঙালিদের কারাগার ধসিয়া পড়িয়াছে। জনতার জয় হইয়াছে। গণদাবির নিকট নতি স্বীকার করিয়া দোর্দণ্ডপ্রতাপ সরকার তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র প্রত্যাহার করিয়া পূর্ব বাংলার অগ্নি সন্তান, দেশ গৌরব, আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানসহ এই মামলার অভিযুক্ত সকলকে কুর্মিটোলার সামরিক ছাউনির বন্দি নিবাস হইতে গতকল্য (শনিবার) মধ্যাহ্নে বিনাশর্তে মুক্তি দিতে বাধ্য হইয়াছেন।’
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার ও শেখ মুজিবের মুক্তি সম্পর্কে ইত্তেফাক সম্পাদক মানিক মিয়া যে সম্পাদকীয় লিখেছিলেন নানা কারণে তা উল্লেখযোগ্য—‘জয় নিপীড়িত জনগণের জয়, জয় নব উত্থান—আজ উত্সবের দিন নয়, বিজয়ের দিন। আজ আনন্দের দিন নয়, স্মরণের দিন। তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহূত হইয়াছে। দুঃশাসনের কারাকক্ষ হইতে দেশের প্রিয় সন্তান শেখ মুজিব অন্যান্য বন্দির সঙ্গে যুক্ত হইয়া আবার তার প্রিয় দেশবাসীর মধ্যে ফিরিয়া আসিয়াছেন। শহিদী ঈদে আমাদের অভিযান সফল হইয়াছে। গণজাগরণের প্রবল শ্রাবণের পলিমাটিতে রক্তাক্ষরে লিখিত হইয়াছে নতুন এক ঊষার স্বর্ণদুয়ার উন্মুক্ত করার অবিস্মরণীয় কাহিনি। এ কাহিনি অসংখ্য শহিদের আ্ত্তদানের, অসংখ্য বীরমাতা ও বীরজায়ার অশ্রু ও হাহাকার সংবরণের কাহিনি।
তবু আজ অহল্যাপ্রতিম পূর্ব বাংলা জাগ্রত। তার অশোক আকাশে ফাল্গুনের রক্তসূর্যে নতুন প্রাণের পতাকা শিহরিত। মেঘের সিংহবাহনে নতুন প্রভাত আসিয়াছে। এই প্রভাতের সাধনায় তিমির রাত্রির তপস্যায় যাহারা আত্মাহুতি দিয়াছেন আজ বিপুল বিজয়ের ক্লান্তিলগ্নে তাদেরই সর্বাগ্রে স্মরণ করি। তাদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে জানাই আমাদের অবনত চিত্তের অভিনন্দন। চারিদিকে আজ জয়ধ্বনি। চারিদিকে আজ প্রলয়োল্লাস। বজ্রের ভেরীতে প্রাণের সারা জাগিয়াছে। ...দুঃশাসনের লৌহকপাট প্রভাতের রক্ত সূর্য ছিনিয়া আনিয়া এ গণমানুষেরা আবার প্রমাণ করিল, তাহারা অপরাজেয়। তাহারা চিরকালের অপরাভূত শক্তি।’ (দৈনিক ইত্তেফাক, ২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৯)
২২ শে ফেব্রুয়ারি (১৯৬৯) তারিখে মুক্তির পর ২৩ শে ফেব্রুয়ারি তারিখে শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। এরপর নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে জাতি এগিয়ে যেতে থাকে। গোল টেবিল বৈঠক হয় ১০ মার্চ রাওয়ালপিন্ডিতে। ১০ মার্চের গোল টেবিল বৈঠকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব যে সমস্ত প্রস্তাব উত্থাপন করেন, শেখ মুজিবের প্রস্তাব শুনে আইয়ুব খান বুঝতে পারলেন শেখ মুজিব তার অবস্থান থেকে এক চুলও নড়বেন না। বাধ্য হয়ে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান শেষ পর্যন্ত জেনারেল ইয়াহিয়ার কাছে রাষ্ট্র ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। তারিখ ২৫ শে মার্চ, রাত্রি ৯টা ১৫ মিনিট। এরপর ইয়াহিয়া খান নিজেকে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করেন ৩১ শে মার্চ (১৯৬৯) তারিখে।
ইয়াহিয়ার ক্ষমতায় আগমন সম্পর্কে সে সময় ইত্তেফাক পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে তফাজ্জল হোসেন (মানিক মিয়া) মোসাফির ছদ্মনামে যে অভিমত ব্যক্ত করেন, নানা কারণে তা বিশেষ প্রণিধানযোগ্য—‘সাধারণভাবে সামরিক শাসনব্যবস্থা কাহারো কাম্য নয়। জেনারেল ইয়াহিয়ার বক্তৃতাতেও তাহা প্রকাশ পাইয়াছে। বিশেষত ১৯৫৮ সালে প্রবর্তিত সামরিক শাসন দীর্ঘকাল চলিবার পর দেশে পুনরায় সামরিক শাসন প্রবর্তন করিতে হইবে, ইহা কেহই ধারণা করে নাই। কিন্তু এবারকার সামরিক শাসন প্রবর্তনের পটভূমি ভিন্ন। প্রেসিডেন্ট আইউবের ১০ বছর স্থায়ী স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনগণ এতই বিক্ষুব্ধ ও মারমুখী হইয়া উঠিয়াছিল যে, তিনি আগামী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হইবেন না, গত ২১ শে ফেব্রুয়ারি এই মর্মে সিদ্ধান্ত ঘোষণা এবং পরবর্তী গোল টেবিল বৈঠক অনুষ্ঠান করিয়াও তাহার সরকারের প্রতি কোনো অঞ্চলের জনগণেরই আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয় নাই। ...প্রধান সামরিক শাসন পরিচালক জেনারেল ইয়াহিয়া খান তার বেতার ভাষণে ছাত্র-শ্রমিক-কৃষকদের সমস্যার উল্লেখ করিয়া উহা সমাধানে যত্নবান হওয়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়াছেন, আশা করি প্রথম সুযোগেই উহা যথাসম্ভব পূর্ণ করিয়া দেশের অভাবী মানুষের দুর্দশা লাঘবের পথ তিনি প্রশস্ত করিবেন।’ (দৈনিক ইত্তেফাক, ২৮ শে মার্চ, ১৯৬৯)
ইত্তেফাক সম্পাদক মানিক মিয়া চাইছিলেন দেশে একটি অবাধ সাধারণ নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হোক। ইত্তেফাকে বিভিন্ন লেখার মধ্যে মানিক মিয়া তা উল্লেখ করেছেন। দেশের বৃহত্তর কল্যাণের কথা ভেবেই মানিক মিয়া তার মোসাফিরের কলামে অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে উচ্চারণ করতে থাকেন। মানিক মিয়ার দৃঢ়বিশ্বাস ছিল দেশে একটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক এবং তার প্রিয় রাজনৈতিক দল ‘আওয়ামী লীগ’ বিপুল ভোটে জয়লাভ করবে এবং তার আস্থাভাজন নেতা শেখ মুজিব রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্টিত হবে। শেখ মুজিবকে নিয়ে মানিক মিয়ার অনেক বড় স্বপ্ন ছিল। তিনি মনে করতেন এক দিন পূর্ব পাকিস্তান শেখ মুজিবের নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশে রূপান্তরিত হবে।
১৯৬৯ সালের ২২ শে এপ্রিল তারিখে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে মন্তব্য করেন— ‘যথাশীঘ্র সম্ভব দেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।’ ইয়াহিয়ার নির্বাচনি ঘোষণায় তত্কালীন নির্ভীক বাঙালির কণ্ঠস্বর ইত্তেফাক পত্রিকার উপ-সম্পাদকীয়তে ছদ্মনামে মানিক মিয়া যে মূল্যবান কথাগুলো লিখলেন তা থেকেই বাঙালির চিন্তার একটি নমুনা পাওয়া যায়—‘আচ্ছা আজ সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ওপর এত জোর দিতেছি কেন, তা কিছুটা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। ...আমাদের সুনিশ্চিত অভিমত এই যে, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর এ পর্যন্ত জাতীয় ভিত্তিতে একটিবারও সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়ার জন্যই বর্তমান সংকটজনক পরিস্থিতির উদ্ভব হইয়াছে, নির্বাচন অনুষ্ঠান না হওয়ার জন্য মানুষ সুবিচার হইতে বঞ্চিত হইয়াছে, আঞ্চলিকতা, প্রাদেশিকতা, দলাদলি, হানাহানি, কোন্দল, বিদ্বেষ, বিশৃঙ্খলা, উচ্ছৃৃঙ্খলা ও নানা ধরনের অনুভব প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হইয়াছে। সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত তো হয়ই নাই, বরং কয়েকবার নির্বাচনের সময় ঘনাইয়া আসিতেই একটা না একটা অজুহাত খাড়া করিয়া নির্বাচন সম্ভাবনা ভঙ্গুর করিয়া দেওয়া হইয়াছে, জনগণের মৌলিক অধিকার কাড়িয়া নেওয়া হইয়াছে এবং অত্যাচারের স্টীম রোলার চালানো হইয়াছে। ...বিগত দশকে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের সমাবেশ ইচ্ছাকৃতভাবেই ঘটিতে দেওয়া হয় নাই, বরং ক্ষমতা আঁকড়াইয়া থাকিবার জন্য ক্ষমতাসীনরাই শুভবুদ্ধিসম্পন্ন নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান চালাইয়াছেন এবং নিজেরাই ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল পলিসি’ অর্থাত্ বিচ্ছেদ নীতি অনুসরণ করিয়াছেন এবং এক অঞ্চলকে অপর অঞ্চলের বিরুদ্ধে প্ররোচিত করিয়াছেন। ...উপরিউক্ত কারণসমূহের জন্যই আমরা সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করিতেছি। কেন না, আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, অন্য কোনো ব্যবস্থা দ্বারা উদ্ভূত পরিস্থিতির মোকাবিলা করা যাইবে না। নির্বাচন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের প্রকৃত উপায়।’ (দৈনিক ইত্তেফাক, ২৮ শে এপ্রিল, ১৯৬৯)
ইত্তেফাক সম্পাদক মানিক মিয়া তথা মোসাফিরের কলম ছিল অসাধারণ ধারালো এবং শক্তিশালী। অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার কলম ছিল সদাসোচ্চার। আওয়ামী লীগ এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের তিনি ছিলেন অকৃত্রিম সুহূদ। শেখ মুজিব বয়সে মানিক মিয়ার ছোট হলেও শেখ মুজিবকে তিনি যেমন স্নেহ করতেন, তেমনি শ্রদ্ধাও করতেন। শেখ মুজিবকে তিনি ‘মুজিব মিয়া’ বলে ডাকতেন, অপরদিকে শেখ মুজিব তাকে ‘মানিক ভাই’ বলে সম্বোধন করতেন। মুজিবকে তিনি বাংলাদেশের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। শেখ মুজিবের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে মানিক মিয়াকে জেল-জুলুমের শিকার হতে হয়েছে, আওয়ামী লীগের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে ইত্তেফাক পত্রিকা সামরিক সরকারের রোষানলে পড়েছে। পত্রিকা কখনো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু মানিক মিয়া এবং তার সম্পাদিত ইত্তেফাক কখনো মাথানত করেনি। যে কারণে বিপদের সময় শেখ মুজিবের প্রধান আশ্রয় ছিল তার মানিক ভাই এবং ইত্তেফাক পত্রিকা।
মানিক মিয়ার দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ হতে চলেছে, দেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, শেখ মুজিবের পক্ষে, আওয়ামী লীগের পক্ষে তিনি নির্বাচনি প্রচারে ঝাঁপিয়ে পড়বেন, শেখ মুজিবের বিয়ে উত্সব পালন করবেন। শেখ মুজিবের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হবে, শেখ মুজিবের জয়গান করে তিনি মোসাফির হিসেবে নয় তার মানিক ভাই হিসেবে ইত্তেফাকে একটি সম্পাদকীয় লিখবেন, এতসব স্বপ্ন মনে লালন করছিলেন ইত্তেফাক সম্পাদক মানিক মিয়া। কিন্তু আকস্মিকভাবে জানা গেল বাংলা, বাংলাদেশের সমস্যাসংকুল অবস্থাকে জাতির সম্মুখে তুলে ধরতে যিনি আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছেন, শেখ মুজিবকে যিনি মনপ্রাণ দিয়ে ভালোবাসতেন, শেখ মুজিবের বিপদে যিনি সর্বশক্তি দিয়ে তার পাশে দাঁড়াতেন, শেখ মুজিবের সেই মানিক ভাই ইন্তেকাল করেছেন। মানিক মিয়াকে হারিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন—‘মরহুম মানিক মিয়া শুধু একজন দেশপ্রেমিক ও সাংবাদিকই ছিলেন না, মানিক ভাই ছিলেন আমার পথপ্রদর্শক। তাহার আকস্মিক ইন্তেকালে আমার অপূরণীয় ক্ষতি হইল।’ (দৈনিক ইত্তেফাক, ২রা জুন, ১৯৬৯)
উপসংহারে বলা যায়, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মানিক মিয়া, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, ইত্তেফাক, বাংলাদেশের স্বাধীনতা একে অপরের পরিপূরক। কাউকে বিচ্ছিন্ন করে দেখবার কোনো পথ নেই। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের পাশাপাশি মানিক মিয়া এবং ইত্তেফাকের নাম চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।
লেখক : সাবেক উপাচার্য, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
