বাংলাদেশে এখন ১০টি মেগা প্রকল্প চলমান রয়েছে। প্রকল্পগুলোর কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। বড় কোনো দুর্ঘটনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ হানা না দিলে, চলমান মেগা প্রকল্পগুলো বর্তমান সরকারের আমলেই শেষ হবে এবং জনসাধারণ এসব প্রকল্প থেকে নানাবিধ সুবিধা গ্রহণ করবে। ইতিমধ্যে কিছু কিছু প্রকল্প থেকে দেশের নাগরিকরা সুফল পাচ্ছেও বটে। প্রকল্পগুলো শেষ হওয়ামাত্রই সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান কয়েক গুণ বেড়ে যাবে, যা দেশের অর্থনীতির চাকাকে করবে আরো সচল। বর্তমান সরকারের এই ১০ মেগা প্রকল্পগুলো হচ্ছে—পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প, মেট্রোরেল প্রকল্প, পদ্মা সেতুতে রেলসংযোগ প্রকল্প, দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু হয়ে ঘুমধুম পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ প্রকল্প, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প, মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প, এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প, কয়লাভিত্তিক রামপাল থার্মাল বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প, পায়রা বন্দর নির্মাণ প্রকল্প এবং সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্প।
এসব মেগা প্রকল্প ছাড়াও আরো ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম চলছে দেশে। এসব প্রকল্প শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২০৩০ সালের মধ্যে। ২০১০ সালে ‘বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল আইন’ প্রণয়নের মাধ্যমে এ কার্যক্রমের সূচনা হয়েছিল। চলমান এসব মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একক নেতৃত্বের কারণে। তিনি দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক নানাবিধ ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করছেন দক্ষতার সঙ্গে। পাশাপাশি ইতিহাস সৃষ্টি করতে যাচ্ছেন এসব মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। ষড়যন্ত্রের জবাব দিচ্ছেন উন্নয়নের মাধ্যমে। তার জ্বলন্ত উদাহরণ দেশীয় অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্প। শুরুতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে এ সেতু নির্মাণের কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের মুখে তা সম্ভব হয়নি। এতে দেশরত্ন দমে যাননি। দেশের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে, নিজেদের অর্থায়নে শুরু করেন দেশের সবচেয়ে বড় সেতুটি, যা বাংলাদেশের মানুষের কাছে আজ দৃশ্যমান। সবগুলো স্প্যান বসানোর পরে পদ্মা সেতু আজ দৃশ্যমান হয়েছে দেশের মানুষের চোখে। বিরোধিতাকারীরা দেশীয় অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণকে অলীক স্বপ্ন বলেছিলেন এবং ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছিলেন। সব ষড়যন্ত্রকে গুঁড়িয়ে দিয়ে স্বপ্নকে বাস্তবে রূপান্তরিত করেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। পদ্মা সেতু নির্মাণে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র অতঃপর প্রধানমন্ত্রীর একক নেতৃত্বে উত্তরণের বন্ধুর পথের গল্প আজ সবার জানা।
পদ্মা সেতু নির্মাণ ছিল মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক অঙ্গীকার। এরই ধারাবাহিকতায় আওয়ামী লীগ দ্বিতীয় মেয়াদে ২০০৯ সালে সরকার গঠনের সঙ্গে সঙ্গেই পদ্মা সেতু নির্মাণে ঝাঁপিয়ে পড়েন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০০৯ সালের ৯ জানুয়ারিতে পরামর্শক নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরু করে সরকার। একই বছরের ২ ফেব্রুয়ারিতে দরপত্র আহ্বান ও নকশা প্রণয়নের পরামর্শক নিয়োগপ্রক্রিয়া ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপরে মূল সেতুর দরপত্র আহ্বান এবং সেতুর অর্থায়ন সংস্থা—বিশ্বব্যাংক, জাপানের জাইকা, ইসলামি উন্নয়ন সংস্থা এবং এডিবির সঙ্গে ঋণচুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেন। ২৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্বব্যাংকের বোর্ডসভায় পদ্মা সেতু প্রকল্পে ১২০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণসহায়তা অনুমোদন দেওয়া হয়। ২৮ এপ্রিল বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ঋণচুক্তি সই হয়। একই প্রকল্পে ২০১১ সালের ১৮ মে জাইকার সঙ্গে, ২৪ মে আইডিবির সঙ্গে এবং ৬ জুন এডিবির সঙ্গে ঋণচুক্তি সই হয় বাংলাদেশ সরকারের। পদ্মা সেতু নির্মাণকাজ শুরু হওয়া এবং ঋণ হস্তান্তর আগেই দুর্নীতির অভিযোগ তোলে বিশ্বব্যাংক। ২০১১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর মার্কিন রাষ্ট্রদূত মরিয়াটির এক বার্তায় তত্কালীন যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের সততার ঘাটতি আছে বলে উল্লেখ করেন, যা পদ্মা সেতু নির্মাণের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের প্রথম পেরেক।
বাংলাদেশ যেন পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে না পারে, এমন আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের সঙ্গে দেশীয় স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি জোট বেঁধে রাস্তায় নেমেছিল। বাংলাদেশকে একের পর এক শর্ত বাতলে দিতে থাকে বিশ্বব্যাংক। ঠিকাদার নিয়োগে তাদের পছন্দনীয় গ্রুপকে কাজ পাইয়ে দিতে প্রভাব বিস্তারও করে তারা। যখন তাদের পছন্দের ঠিকাদার নিয়োগদানে বাংলাদেশ অস্বীকৃতি জানায়, তখন তাদের ষড়যন্ত্রের জাল আরো শক্ত হতে থাকে। এমনকি শেষ পর্যন্ত বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু নির্মাণে অর্থায়ন করতে অনীহা প্রকাশ করে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চেয়েছিলেন ২০১৩ সালের ডিসেম্বর মাসে সরকারের প্রথম মেয়াদেই সেতুর নির্মাণকাজ শেষ করতে এবং যানচলাচল নিশ্চিত করতে। পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভবও ছিল। কিন্তু বিশ্বব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক চক্র খুব দ্রুত সেতু নির্মাণের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। এর পেছনে দুটি সুনির্দিষ্ট ষড়যন্ত্র বিদ্যমান ছিল—১. বিশ্বব্যাংক গড়িমসি করছিল সেতু নির্মাণে। তারা ভেবেছিল ২০১৪ সালের নির্বাচনে স্বাধীনতাবিরোধীরা ক্ষমতায় আসবে। তখন এ সেতু নির্মাণের সুফল ঘরে তুলত স্বাধীনতাবিরোধীরা। আওয়ামী লীগকে একটি মিথ্যা অপবাদ দিয়ে পুনরায় ক্ষমতায় না আসতে দেওয়া ছিল প্রধান ষড়যন্ত্র। ২. আওয়ামী লীগ যদি ২০১৩ সালের মধ্যে সেতু নির্মাণ শেষ করে, তাহলে তাদের জনপ্রিয়তা আগের চেয়ে আরো বৃদ্ধি পাবে—এমন ভয় থেকে দেশীয় উসকানি মাথায় নেয় বিশ্বব্যাংক।
বিশ্বব্যাংক শুরুতে বলেছিল, পদ্মা সেতু নির্মাণে দুর্নীতি হয়েছে। প্রকাশ থাকে, অভিযোগকালীন বাংলাদেশ সরকারকে সেতু নির্মাণ বাবদ কোনো অর্থই হস্তান্তর করেনি বিশ্বব্যাংক। এমন মিথ্যা অভিযোগ আমলে টেকেনি বিশ্বব্যাংকের। তখন কথা ঘুরিয়ে বলতে চেষ্টা করে। তারা নতুন করে বলে, দুর্নীতি হয়নি, দুর্নীতির চেষ্টা হয়েছে। এরপর বলে, দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। একের পর এক গালগল্প তৈরি করতে থাকে বিশ্বব্যাংক, যার পেছনে শক্তি জোগাতে থাকে ১/১১-এর পরাজিত শক্তিরা। বিশ্বব্যাংকের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তত্কালীন প্রকল্প পরিচালক রফিকুল ইসলামকে ২০১১ সালের ৯ অক্টোবর অপসারণ এবং সেতু বিভাগের সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়াকে ১৮ অক্টোবর বদলি করা হয়। অভিযোগ ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তদন্তের স্বচ্ছতার জন্য সরকার এমন পদক্ষেপ নেয়। তবুও বিশ্বব্যাংক ঋণ-সহায়তা না দিয়ে স্থগিতের ঘোষণা দেয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং সরকার শতভাগ সততার উদারণ সৃষ্টি করেন পদ্মা সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র টের পাওয়ার পরও প্রধানমন্ত্রী শতভাগ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করেন। নানা সন্দেহের ঊর্ধ্বে তোলেন সরকারকে। ২০১২ সালের ৫ জানুয়ারি যোগাযোগমন্ত্রীকে সরিয়ে অন্য মন্ত্রণালয়ে দেন। এরপর বিশ্বব্যাংকের অভিযোগে দুদক অনুসন্ধান দল গঠন করে। শেষ পর্যন্ত দুদকের তদন্ত দল কোনো ধরনের দুর্নীতির প্রমাণ পায়নি পদ্মা সেতু প্রকল্পে, যা কানাডার আদালতেও পুনরায় প্রমাণিত হয়।
নানা ধরনের ষড়যন্ত্র, মিথ্যাচারের পরও বাংলাদেশ সরকার বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ নিতে আগ্রহী ছিল। তবুও তাদের টালবাহনা থেমে থাকে না। বিশ্বব্যাংকের অনেক নাটকের পর, তাদেরকে বাংলাদেশ সরকার দম্ভের সঙ্গে জানিয়ে দেয় নিজেদের শক্ত সিদ্ধান্ত। ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসের মধ্যে কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত না পেলে বিকল্প অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করবে বাংলাদেশ সরকার। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সততা, জনপ্রিয়তা, দেশপ্রেম, জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার জন্য নিজ অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। কারণ, সততার সর্বোচ্চ পরীক্ষা দেওয়ার পরও দেশীয় ষড়যন্ত্রকারীদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের পথে হাঁটে বিশ্বব্যাংক। শুরু হয় নিজেদের অর্থায়নে স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজ। গত ১০ ডিসেম্বর এই বিজয়ের মাসেই ৪১তম স্প্যান বসানোর কাজ শেষ হয়। এর মাধ্যমে ৬.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতু এখন পুরোপুরি দৃশ্যমান। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়া নানাবিধ ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে নিজেদের অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করা সম্ভব হতো না। তার উন্নয়ন ভাবনা, সততা, দক্ষ নেতৃত্বের কারণেই ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা ব্যয় করে স্বপ্নের সেতু নির্মাণ করা বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে। স্বাধীনতাবিরোধীরা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েও ষড়যন্ত্র থামিয়ে দেয়নি। ২০১৯ সালে পদ্মা সেতুতে মানুষের মাথা লাগবে বলে গুজব তোলে। এমন গুজব ডিজিটাল বাংলাদেশে শেষ পর্যন্ত টেকেনি। দেশের সচেতন জনগণ এর জবাব দিয়েছিল বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তা দিয়ে।
বাংলাদেশে নির্মাণাধীন একটি বহুমুখী সড়ক ও রেলসেতুর নাম হলো পদ্মা সেতু। এর মাধ্যমে লৌহজং, মুন্সীগঞ্জের সঙ্গে শরীয়তপুর ও মাদারীপুর যুক্ত হচ্ছে। ফলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের সঙ্গে উত্তর-পূর্ব অংশের সংযোগ ঘটবে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য পদ্মা সেতু হতে যাচ্ছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জিং নির্মাণ প্রকল্প। এটি নির্মাণ শেষ হলে দেশের অর্থনীতিতে মোট দেশজ উত্পাদন (জিডিপি) ১ দশমিক ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। আমাদের টাকায় আমাদের সেতু নির্মাণ করা সম্ভব হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অদম্য নেতৃত্বের গুণেই।
n লেখক :সদস্য, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এবং পরিচালক, বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিএল)
