ভাইরাল হওয়ার সংস্কৃতি, সামাজিক মাধ্যম ও কিছু কথা

আপডেট : ২৩ ডিসেম্বর ২০২০, ২১:৪১

কিছু দিন আগে ফেসবুকে একটা ভিডিওচিত্র দেখেছিলাম। সেটিতে একজন ব্যক্তি নির্দিষ্ট একটি বিষয়ের ওপর একটি ভিডিও কনটেন্ট তৈরি করে তাতে লাইক, কমেন্ট দিয়ে ও শেয়ার করে উক্ত ভিডিওটি ভাইরাল করে দিতে করজোড় অনুরোধ করেছিল। সেখানে সে এমনভাবে অনুরোধ করেছে যে, তা দেখে মনে হলো, ভিউয়ার বা দর্শকরা যদি তার সামনে থাকত, তাহলে তার ভিডিওটি ভাইরাল করার জন্য তাদের পায়ে ধরতেও যেন দ্বিধাবোধ করত না।

আবার ভাইরাল হওয়াটাই অনেকের জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হয় থাকে। একবার শুনেছিলাম, কাকে যেন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে, ‘তোমার জীবনের লক্ষ্য কী?’ উত্তরে সে বলেছিল, ‘ভাইরাল হওয়া।’

এভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, আমাদের সমাজের অনেক মানুষই, বিশেষ করে, তরুণ প্রজন্মের বড় একটা অংশই এই ভাইরাল হওয়ার সংগ্রামে নিমজ্জিত। এদের মধ্যে কেউ কেউ রয়েছেন, যারা তাদের চুলের কাটিং, পোশাকের ভিন্নতা, কথা বলার ধরনসহ বিভিন্ন রকম অনন্য সব  অঙ্গভঙ্গিতে লেখা, ছবি, অডিও ও বিভিন্ন ভিডিও কনটেন্ট তৈরি করে ভাইরাল হতে চায়। কেউ কেউ অশ্লীলতাকেও বেছে নেয় এ কাজে। এই ভাইরাল হওয়ার জন্য অনেকেই নিজের জীবন, পরিবার, সমাজ এমনকি দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হওয়ার ব্যাপারে বিন্দুমাত্র আশঙ্কাও যেন করছে না। ভালো হোক, মন্দ হোক তারা যেন তাদের পথেই অবিচল।

আবার বিনোদন কিংবা মজার ছলে এবং কৌতূহল বা বিভিন্ন কারণবশত ইদানীং আমাদের মতো সাধারণ মানুষও অনেক বেশি পরিমাণে তাদের করা ঐসব কন্টেন্ট দেখছে বা গ্রহণ করছে। এজন্য, তারা এদিকে আরো বেশি উত্সুক হয়ে পড়ছে। কারণ, তাদের কোনো ভিডিওর যখন ভিউয়ার, লাইক, কমেন্ট, শেয়ার ও ফলোয়ারের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়, তখন তাদের মোটা অঙ্কের অর্থ এবং রাতারাতি সেলিব্রিটি বনে যাওয়ার স্বপ্ন পূরণ হতে থাকে। একেই তারা জীবনের পরিপূর্ণ সফলতা হিসেবে দেখতে থাকে এবং পেশা হিসেবে অনেকেই এ ভাইরাল হওয়ার সংগ্রামকেই বেছে নেয়। কে কী বলে সেটি দেখার মতো সময় বা মনোভাব তাদের আর থাকে না। এভাবে একজনের দেখাদেখি অনেকেই এ পথে পা বাড়াচ্ছে প্রতিনিয়ত। এটি যেন একটি সংস্কৃতিতে পরিণত হচ্ছে।

যদি গভীরভাবে চিন্তা করা হয়, তাহলে দেখা যাবে যে, যাচ্ছেতাই করে ভাইরাল হওয়ার এই সংস্কৃতি আমাদের তরুণ প্রজন্মকে ধীরে ধীরে একগুঁয়ে করে তুলছে, ভিন্ন এক সংস্কৃতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে এবং অশ্লীলতার পথে পা বাড়াতে সহযোগিতা করছে। বিশেষ করে, ক্রমেই পড়াশোনা, পরিবার ও সভ্য সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

অন্যদিকে, ভাইরাল হওয়া সংস্কৃতিতে অনেক ভালো দিকও রয়েছে। এমন অনেক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যাদের ভাইরাল হওয়া অথবা নেটিজেন পাড়ায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া সামাজিক মাধ্যমগুলোর অ্যাকাউন্ট বা পেজ থেকে গরিব-দুঃখীদের পাশে দাঁড়ানোর ভিডিও, বিভিন্ন শিক্ষামূলক ভিডিও কনটেন্ট ও লাইভ সেশন পরিচালনা, হলুদমুক্ত সংবাদ প্রচার এবং সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে বিনোদন প্রদানসহ অসংখ্য প্রয়োজনীয় ও কল্যাণমূলক ভিডিও, আর্টিকেল বা তথ্যাদি প্রচারিত হয়ে থাকে, যা অবশ্যই ভালো দিক এবং ডিজিটাল ও যন্ত্রনির্ভর এই যুগে এক ধরনের অগ্রগতিরই লক্ষণ বলে মনে করা যায়।

আবার, ইদানীং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসমূহে সংঘটিত বিভিন্ন রকম অপরাধও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। করোনাসংকটে মানুষ এই সামাজিক মাধ্যমগুলোর ওপরে বেশি নির্ভর হওয়ার কারণে অপরাধের পরিমাণ দিন দিন আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। এগুলোর মধ্যে ব্যক্তিগত কোনো তথ্য, ছবি বা ভিডিও ফাঁস করা, গুজব ছড়ানো, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, হত্যা বা প্রাণনাশের হুমকি, হ্যাকিং, অশ্লীলতা প্রচার, বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণা ও অনলাইন ব্যবসার ব্যানারে মানুষের সঙ্গে ধোঁকাবাজিসহ সংঘটিত এরকম আরো অনেক অপরাধই উল্লেখযোগ্য। নিশ্চয়ই এগুলো কোনো দেশ বা সমাজের জন্য ভালো দিক নয়।

ভাইরাল হওয়ার অপ্রীতিকর, অশ্লীল, অকল্যাণকর ও অসামাজিক সব ধরনের লেখা, ছবি, অডিও ও ভিডিওর কুপ্রভাব থেকে বর্তমান ও ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে বাঁচাতে হলে, আমাদের সবাইকে সম্মিলিতভাবে এ ধরনের সবকিছুই সরাসরি বর্জন করা উচিত। পাশাপাশি প্রশাসনকেও এদিকে তদারকি বৃদ্ধি করতে হবে এবং আইনানুযায়ী কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগ, হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়