বাংলাদেশের জন্ম ও ইত্তেফাক

আপডেট : ২৩ ডিসেম্বর ২০২০, ২২:১৭

 

আজ দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই দিনটির বিশেষ গুরুত্ব আছে। কারণ, একটি পত্রিকা প্রথমে সাপ্তাহিক ও পরে দৈনিক হিসেবে একটি বিভ্রান্ত, অসংগঠিত এবং বহুপাক্ষিক বৈষম্য, বঞ্চনা, শোষণের শিকার বাঙালি মুসলমান সম্প্রদায়কে প্রথমে সচেতন করে ধীরে ধীরে সংগঠিত এবং সুস্থ জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক চেতনা ও আদর্শবাদে উদ্বুদ্ধ করে। ১৯৩০-এর দশকে কলকাতায় মওলানা আকরাম খাঁর দৈনিক আজাদের মুসলিম জাতীয়তাবাদী প্রয়াসের জায়গা থেকে ধাপে ধাপে বাঙালি মুসলমান-সমাজের রাজনৈতিক চেতনার যে নববিকাশ ঘটে, তাতে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, এ কে ফজলুল হক, আবুল হাশিম, আবুল মনসুর আহমদ ও ব্যারিস্টার আব্দুর রসুলের যে ভূমিকা ছিল তার প্রকাশ ঘটেছিল নবযুগ, গণবাণী, ইত্তেহাদ ও সাপ্তাহিক মিল্লাতের মাধ্যমে। সে সময়ে শেখ মুজিব ও মানিক মিয়া দুই অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ এসব উদ্যোগের মধ্য থেকে স্বাদেশিক বাঙালি জাতীয়তাবাদী নতুন ধারা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ঢাকায় এসে মওলানা ভাসানীকে সামনে রেখে প্রথমে প্রকাশ করেন সাপ্তাহিক ইত্তেফাক—তীব্র আকর্ষণ সৃষ্টিকারী নবচেতনার পত্রিকা, বুঝিবা কলকাতার আবুল হাশেম সম্পাদিত সোহরাওয়ার্দীর সাপ্তাহিক মিল্লাতের পরবর্তী আরো শানিত লক্ষ্যভেদী সংস্করণ। পূর্ব বাংলার নব আশা-আকাঙ্ক্ষার কতকটা সম্প্রসারিত বাঙালি মধ্যবিত্তের স্বপ্ন-কল্পনায় আগুন ঝরানো সংবাদ সাময়িকী সাপ্তাহিক ইত্তেফাক।         পাকিস্তানি স্বৈর সামরিক শাসন আমলে তাদের ধর্মীয় ও শোষণমূলক চক্রান্তে পূর্ব বাংলায় যে শোষণভিত্তিক শাসন চালু হয়েছিল, তাতে তারা ধর্মকে ব্যবহার করেছে, সামরিক শক্তিকে ব্যবহার করেছে এবং জনগণের ব্যক্তি, বাক্ ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে হরণ করেছে। নির্বাচন, গণতান্ত্রিক অধিকার ও ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে পশ্চিম পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসক শোষকেরা। এই চক্রের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন মওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং পাকিস্তানের প্রথম যুগের তরুণ জনপ্রিয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। এঁদের রাজনৈতিক লড়াইয়ের মর্মবাণী ও অন্তঃসারকে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের কাছে পৌঁছে দিয়েছে প্রথমে সাপ্তাহিক ইত্তেফাক ও পরে দৈনিক ইত্তেফাক। নানা সংবাদে ও ভাষ্যে। কিন্তু সবকিছুর ওপরে ছিল তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার নিজের কলাম ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’। এমন সরস, তীক্ষ, যুক্তি ও তথ্যপূর্ণ এবং কখনো ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের ছোপ দেওয়া তার হাত থেকে না বেরোলে ভাসানী বা মুজিবের বাণী অমন করে জনগণের প্রাণে গেঁথে যেত না। সোহরাওয়ার্দীর গণতান্ত্রিক বোধ ও নিষ্ঠার উদাহরণও মানুষকে উজ্জীবিত করতে পারত না। এমনকি শেখ সাহেবের ছয় দফা আন্দোলন বাঙালি অর্থনীতিবিদদের দুই অর্থনীতির তাত্ত্বিক ও যৌক্তিক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ এবং পূর্ব বাংলার সাংস্কৃতিক আশা-আকাঙ্ক্ষার শ্রেষ্ঠ প্রকাশ মাধ্যম হয়ে উঠেছিল দৈনিক ইত্তেফাক। আর সম্পাদক মানিক মিয়া পাকিস্তানের শাসক-শোষকদের কাছে বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক চেতনার মুখ্য প্রতিনিধি হয়ে উঠেছিলেন তিনি। প্রবল সামরিক শাসক আইয়ুব খানের মুখোমুখি হয়ে যে কজন বাঙালি সাংবাদিক সাহসের সঙ্গে নিয়মিত লড়াই করতেন তারা ছিলেন মানিক মিয়া, জহুর হোসেন চৌধুরী ও আব্দুস সালাম। এই ত্রয়ীর মধ্যে মানিক মিয়াই ছিলেন হার্ডকোর সদস্য ও নেতা। ফলে আইয়ুব খান মানিক মিয়াকে শুধু সমীহই করতেন না, কিছু ভয়ও পেতেন। এতে মানিক মিয়ার সাহস, লড়াকু মনোভাব, দেশপ্রেম ও প্রজ্ঞার পরিচয় মেলে। শুধু আইয়ুব খান নন, গোটা পাকিস্তানি সামরিক চক্র ও প্রশাসন মানিক মিয়াকে ভয় করতেন। এর একটা কারণ তার লেখার বিপুল জনপ্রিয়তা ও ইত্তেফাকের বহুল প্রচার; অন্যদিকে মানিক মিয়ার লোভ-লালসা ও প্রলোভনে অনীহা। পুরস্কার বা এনাম দিয়ে তাকে বশে আনা বা আপস করতে বাধ্য করার শক্তি কারো ছিল না। ফলে মানিক মিয়াকে জেল-জুলুম ও তার পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ করার মুখোমুখি হতে হয়েছে বারবার।

                প্রকৃতপক্ষে, মানিক মিয়া ছিলেন বাঙালি জাতীয়তাবাদের আপসহীন প্রবক্তা। তার কলাম ও ইত্তেফাকের নানা সংবাদ, সংবাদভাষ্য পূর্ব বাংলার মুসলমান বাঙালির বাঙালিত্বকে তীব্র ও ব্যাপক চেতনায় বিভাসিত করেছিল। তার এই সংগ্রাম ছিল বিরামহীন। এই সংগ্রামের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং সেই রাজনৈতিক চেতনাকে আদর্শিক ও রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে দার্শনিক পটভূমিকায় বিন্যস্ত করেছিলেন মানিক মিয়া। অতএব বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের অকুতোভয় জনতার ইচ্ছা মানিক মিয়ার লেখার মাধ্যমে তার চৈতন্যের উন্মিলন এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালির হাজার বছরের স্বপ্নের সেই স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

                আজকের দিনে আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে আমরা গভীরভাবে শ্রদ্ধা জানাই। সেই সঙ্গে অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আপেক্ষিক সংগ্রামে মানিক মিয়াকে স্মরণ করি অপরিসীম শ্রদ্ধায়।

লেখক :গবেষক, ফোকলোরবিদ ও সভাপতি, বাংলা একাডেমি