সময়মতো বিচারকের এজলাসে না উঠার প্রতিবাদ করায় এক আইনজীবীকে কাঠগড়ায় দুই ঘণ্টা আটকে রাখার অভিযোগ উঠেছে ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম আসাদুজ্জামান নূরের বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে আইনজীবীর সনদ বাতিলের হুমকি দিয়েছিলেন ঐ বিচারক। আইনজীবীর সঙ্গে বিচারকের এই অসৌজন্যমূলক আচরণ ও দুর্ব্যবহারের বিষয়টি জানাজানি হলে গতকাল বুধবার বিক্ষোভে ফেটে পড়েন শত শত সাধারণ আইনজীবী। তারা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবনের প্রধান ফটকে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। একই সঙ্গে ঐ বিচারকের প্রত্যাহারের দাবিতে স্লোগান দেন আইনজীবীরা। এ সময় আইনজীবীরা যাতে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটান সেজন্য আদালত ভবনের প্রধান ফটকে তালা লাগিয়ে দেয় কোর্ট কর্তৃপক্ষ।
আদালত প্রাঙ্গণে বিক্ষোভের আগে একদল আইনজীবী আসাদুজ্জামান নূরের আদালত কক্ষে বেঞ্চ উলটে ফেলেন। এ সময় ঐ কোর্টসহ আরো কয়েকটি কোর্ট থেকে বিচারপ্রার্থীদের বের করে দেওয়া হয় বলে জানান আইনজীবীরা। শত শত আইনজীবীর বিক্ষোভে মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের ৩৬টির মধ্যে অধিকাংশ কোর্টে বিচারকাজ বন্ধ থাকায় দুর্ভোগে পড়েন বিচারপ্রার্থীরা। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে তাদের মধ্যে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) এস এম জুলফিকার হায়াত বৈঠক করেন আইনজীবী সমিতির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে। সেখানেই সিদ্ধান্ত হয় ঐ বিচারককে ছুটিতে পাঠানোর। এর পরই বিচারক আসাদুজ্জামান নূরকে দুই দিনের ছুটিতে পাঠান সিএমএম। বিচারককে ছুটিতে পাঠানোর বিষয়টি ঢাকা আইনজীবী সমিতির নেতৃবৃন্দ সাধারণ আইনজীবীদের অবহিত করলে তারা আন্দোলন থেকে সরে আসেন। এরপর বেলা ২টা থেকে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচারকাজ শুরু হয়।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. ইকবাল হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, উদ্ভূত পরিস্থিতি নিরসনে আমরা সমিতির নেতৃবৃন্দ চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের (সিএমএম) সঙ্গে বৈঠক করি। বৈঠকে সিএমএম ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন এবং বিচারককে বিচারকাজ থেকে সরিয়ে নেন। তিনি নেতৃবৃন্দকে বলেন, আপাতত ঐ বিচারককে কোর্ট দেওয়া হবে না। তাকে ছুটিতে পাঠিয়েছি। কিন্তু প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত আইন মন্ত্রণালয়ের বিষয়। একই সঙ্গে আইনজীবীদের অভিযোগ ও দাবির বিষয়টি আমি মন্ত্রণালয়কে অবহিত করব।
অ্যাডভোকেট ওয়ালিউল ইসলাম তুষার বলেন, এই বিচারক দীর্ঘদিন ধরে সিএমএম কোর্টে আছেন। তিনি বিভিন্ন সময় অনেক আইনজীবীর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। সময়মতো উঠেন না এজলাসে। মাঝে মাঝে মামলার ফাইল ছুড়ে ফেলেন। ঐ বিচারক প্রায়শই দাবি করেন তার খুঁটির জোর নাকি অনেক ওপরে। সেজন্য সাধারণ আইনজীবীদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছে আইনজীবীকে আদালত কক্ষে আটকে রাখার ঘটনায়।
ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম আসাদুজ্জামান নূরের বিরুদ্ধে আইনজীবীদের অভিযোগ সময়মতো এজলাসে না উঠার। মঙ্গলবার এর প্রতিবাদ করেন আইনজীবী মোহাম্মদ রুবেল আহমেদ ভূঞা। বিষয়টি বিচারকের দৃষ্টিতে আসলে মামলার শুনানিকালে ঐ আইনজীবীকে ‘লকআপে’ আটকে রাখার আদেশ দেন পুলিশকে। এ নিয়ে ঐ আইনজীবী ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন। সেখানে তিনি বলেন, মঙ্গলবার তিনি ঐ আদালতে মামলা পরিচালনা করতে যান। এ সময় সকাল সাড়ে ১০টায় বিচারক এজলাসে উঠবেন বলে পেশকার জানান। আমি নির্দিষ্ট সময় জানতে চাই। পরে আদালত মামলা ডাকলে আমি সামনে যেতেই তিনি বলেন, আমি কোর্টে বিশৃঙ্খলা করার চেষ্টা করেছি। আমি বলেছি বিশৃঙ্খলার চেষ্টা করি নাই। বিচারক বলেন, আপনার মামলা শুনব না। আপনি পরে আসবেন, পরে শুনব। আমি পরে গেলে তিনি আদালত চলাকালীন আমাকে পুলিশ দ্বারা লকআপে আটকিয়ে রাখে। এবং আমার সনদ বাতিল করে দেবেন এবং সব ম্যাজিস্ট্রেটকে বলে দেবেন আমার কোনো মামলা না শোনার জন্য।
আইনজীবী মাহবুবুল হক ভূঁইয়া বলেন, আইনজীবী রুবেল এজলাসে এলে কোনো কথা না শুনেই বিচারক এজলাসে থাকা পুলিশকে নির্দেশ দেন ঐ আইনজীবীকে আটক করার জন্য। পরে ঐ আইনজীবীকে দুই ঘণ্টা আটকে রাখেন। পরে অন্য আইনজীবীরা বিচারককে অনুরোধ করে তাকে পুলিশ হেফাজত থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসেন।
ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর গতকাল বুধবার সকাল ৯টায় বিক্ষুব্ধ শত শত আইনজীবী বিক্ষোভ প্রদর্শন করে বিচারককে প্রত্যাহারের দাবি জানান। একই সঙ্গে তাকে কোনো কোর্ট না দেওয়ার আলটিমেটাম দেন আইনজীবীরা। তারা বলেন, কোর্ট দেওয়া হলে আন্দোলন আবার শুরু হবে।
দায়ীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন :
সুপ্রিম কোর্ট বার
আদালতে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে এক আইনজীবীকে ম্যাজিস্ট্রেট আসাদুজ্জামান নূরের নির্দেশে পুলিশ কর্তৃক অবৈধভাবে দুই ঘণ্টা লকআপে আটকিয়ে রাখা ও নিগ্রহের ঘটনায় সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে নেতৃবৃন্দ বলেন, দেশের সুষ্ঠু বিচার ব্যবস্থার স্বার্থে বার ও বেঞ্চের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে এ ধরনের নিগ্রহের ঘটনা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
