ডিসেম্বরে নিউইয়র্কের জমাটি শীত আর উত্সব উত্সব আমেজটাকে বরাবরই নিজেদের মতো করে উপভোগ করে শাম্মী-অসীম দম্পতি। হিমাংকের এত নিচে তাপমাত্রাতেও শাম্মীর উচ্ছল, প্রাণবন্ত উপস্থিতি বরাবর উষ্ণ করে রেখেছে অসীমের জীবনটাকে।
ভার্সিটিতে রেকর্ড মার্ক পাওয়া অসীমের ভদ্র, নম্র স্বভাবের বিপরীতে শাম্মী যেন পুরো একটা ফুলঝুরি। সারাক্ষণ পুটুরপুটুর কথা, কাজের সঙ্গে সমান তালে গান, কখনো খিলখিল হাসিতে ভরিয়ে তুলত চারপাশ। প্রথম দিনেই অসীমের মায়ের ‘বৌমা’ ডাকাতে ঘোর আপত্তি করে বসে শাম্মী। সবাই এক মুহূর্তের জন্য থমকে গিয়েছিল, পরক্ষণেই শাশুড়িকে জাপটে ধরে বলেছিল, ‘আমি অতশত বুঝি না, আমি কারো বৌমা টৌমা হতে পারব না, মেয়ে আমি তোমার মেয়ে...বুঝছো!’
অনাবিল আনন্দে ভরে উঠেছিল ওদের ছোট্ট সংসার। তারপর স্কলারশিপ নিয়ে অসীমের নিউইয়র্ক আসা, সঙ্গে সংসারে আনকোরা, আনাড়ি শাম্মী। এখানে আসার পর প্রথম ক্রিসমাসের সন্ধ্যায় তার সে কী কান্না! কিছুতেই সে কান্না থামে না। পরে জানা গেল—নিজে নিজে কেক বানাতে গিয়ে পুড়িয়ে ফেলেছে। অগত্যা সুলতান ডাইন-এর ম্যাক্সিকান ট্যাকিউ বেল, চিকেন, গ্রিক স্যালাড।
তবে পরের দিনগুলোতে শাম্মী নিজেকে তৈরি করেছিল অসীমের আর এই সদা ব্যস্ত মস্ত শহরটির উপযোগী করে। স্কলারশিপের টাকায় সব দিক সামলানো সম্ভব ছিল না, শাম্মী বিভিন্ন অড জব করে অসীমের পাশে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি নিজের পড়াশোনা চালিয়ে গেছে।
অসীম আমেরিকান এক্সপ্রেস ব্যাংকে চাকরিটা পেয়ে গেল।
তারপর এমনি এক ক্রিসমাসের সন্ধ্যায় নিজের বানানো কেক অসীমের পছন্দের ডিশ চিকেন গাইরো, আফগানি কাবাব দিয়ে টেবিল সাজায় শাম্মী। আর অসীমেরই প্রিয় গোলাপি সাদা শাড়ি কালো টিপ আর খোলা চুলে হিম শীতল বারান্দায় এসে দাঁড়ায়।
অসীম কিছুটা অবাক হলেও ওর পিছে পিছে বারান্দায় আসে। ওর বিস্ময় আকাশ ছোঁয় যখন দেখে শাম্মী বারান্দায় দুটো লাল মোজা বেঁধে দিচ্ছে। (ক্রিসমাসে মোজা ঝোলানো রীতি। বলা হয় স্যান্টাক্লজ সেই মোজাতে কাঙ্ক্ষিত জিনিসটি রেখে যান) এবার বিস্ময় ছাপিয়ে অসীম হো হো করে হেসে ওঠে। এতদিন এসব আচার দেখে শাম্মী নিজেই হেসে কুটিকুটি হতো। কিন্তু হঠাত্ শাম্মীর চোখের দিকে তাকিয়ে অসীম থতমত খেয়ে থেমে যায়। কী অদ্ভুত মায়া জড়ানো চোখের চাহনি। শাম্মী অসীমের বুকে মিশে যেতে যেতে বলে, আমার একটা ছোট্ট অসীম চাই।
হুম...ছোট্ট অসীম আসছে শুনে শাম্মীর সে কী উচ্ছ্বাস!
কিন্তু প্রেগনেন্সির পঞ্চম মাসে অসীম যখন ব্যাংকের ডেবিট-ক্রেডিট মেলাতে ব্যস্ত—ফোন এলো মাথা ঘুরে পড়ে গেছে শাম্মী।
সেই থেকে আজ অবধি জীবনের ডেবিট-ক্রেডিট এলোমেলো অসীমের।
শাম্মীর ছোট্ট অসীম, আদি, ছয়ে পড়েছে দুয়েক মাস হলো।
আজ ক্রিসমাস।
সারা নিউইয়র্ক ক্রিসমাস ট্রি, নীল নীল টুনি বাতিতে সাজানো। প্রবল ঠান্ডা আর উত্সবের প্রাণপণ প্রতিযোগিতা। আদির হাতে দুটো লাল মোজা, বাচ্চাটা ঘুমিয়ে পড়েছে না জানি কখন। বিকেলে বলেছিল সন্ধ্যায় বাপি যেন মোজা দুটো বেঁধে দিতে ওকে হেল্প করে। কিন্তু সন্ধ্যার ঠিক মুখেই ফোনটা এলো আর অসীমকে তড়িঘড়ি বেরিয়ে যেতে হলো। City of hope-এ পৌঁছুতে আধ ঘণ্টা লেগে গেল ওর। অংকোলোজিস্ট ডা. ফ্রেডরিক জেরোমি বিষণ্ন্ন মুখে জানালেন শাম্মী এই কেমোটায় মোটেই রেসপন্ড করছে না। সো দেয়ার ইজ নো মোর হোপ...অসীম কোনোমতে কেবিন পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছিল।
শাম্মী, ওর আদরের শাম্মী, সেই উচ্ছল শাম্মী, আজ নিস্তেজ, নীরব, ওর টোল পড়া গালের টোল হারিয়েছে কবেই! চামড়ার নিচে শুধু হাড়ের আভাস। শাম্মীর সেই একঢাল কোঁকড়ানো চুল, শাড়ি তো বটেই এমনকি জিন্স টপসের সঙ্গে ও যখন চুল ছেড়ে রাস্তায় বের হতো, কেউ দ্বিতীয়বার না তাকিয়ে পারত না। আজ সেখানে শুধু চকচকে খুলি...
আজ ছয়টি বছর ব্রেইন ক্যান্সারের সঙ্গে লড়ে চলেছে শাম্মী। অসীম লড়ছে ঘরে বাইরে।
এতদিন তবু টিমটিমে আলোর মতো একটু আশা ছিল, আজ বুঝি তাও শেষ হয়ে গেল। আদির টানে একসময় ঘরে ফেরে অসীম। ঘুমন্ত আদির হাত থেকে মোজাজোড়া নিয়ে বারান্দায় আসে। জীবনে এই প্রথম নিজের যুক্তির বাইরে, বিশ্বাসের বাইরে গিয়ে মোজাদুটো ঝুলিয়ে দেয়। নিজেকে আর আটকাতে পারে না। হু হু করে কান্নায় ভেঙে পড়ে অসীম...দূরে কোথাও অনবরত বেজে চলে, জিংগেল বেল জিংগেল বেল জিংগেল অল দা ওয়ে...
অলংকরণ :অবিনাশ আচার্য
