বাণিজ্য মেলায় একদিন

আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০১৯, ১৬:৫১

 

তারেকুর রহমান

মতি ভাই ইদানীং চুপচাপ থাকে। স্ত্রী কিছু বললেও তা না শোনার ভান করে। স্ত্রীও কম না। সে মতি ভাইয়ের মতিগতি বুঝে ফেলেছে। তাই আগের চেয়ে বেশি পরিমাণ ঘ্যানঘ্যান করতে থাকে। দুপুরের খাবার খেয়ে একটু আয়েশ করে শুতে গেল মতি ভাই। স্ত্রী পাশে এসে বসল। চুপচাপ বসে আছে। মতি ভাই বুঝতে পারল স্ত্রী কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়েই এখানে এসেছে। স্ত্রীকে মতি ভাই বলল, ‘কী বলতে চাচ্ছ দ্রুত বলে ফেল?’

‘এই তুমি এমন কেন?’

‘কেমন?’

‘তুমি বুঝো না আমি কী বলতে চাই?’

‘না, বুঝি না।’

‘আসলে বলছি কি, চলো না একটু বাণিজ্য মেলা থেকে ঘুরে আসি।’

মতি ভাই পরিস্থিতি বুঝে উত্তর দিল, ‘আসলে আমার শরীরটা ভালো না। বাণিজ্য মেলায় না গেলে হয় না?’

‘তোমার শরীরের আবার কী হলো?’

‘একটু খারাপ লাগছে।’

‘এসব আমি বুঝি, এগুলো তোমার ঢঙের অসুখ। তাড়াতাড়ি রাজি হয়ে যাও না হলে খবর আছে।’

মতি ভাই কিছুক্ষণ ভাবল। সে জানে স্ত্রীকে কিছুতেই আটকে রাখা যাবে না। বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর স্ত্রী বলল, ‘কোনো ডিসিশন জানাচ্ছ না কেন?’

‘আমি রাজি না।’

‘দাঁড়াও, দেখাচ্ছি মজা।’

এ কথা বলেই এক জগ পানি মতি ভাইয়ের গায়ে ঢেলে দিল। মতি ভাই ‘ও মাগো আমি গেলাম রে’ বলে চিত্কার করতে লাগল। স্ত্রী খুব জোরে ধমক দিয়ে বলল, ‘বেশি কথা বললে আরও পানি ঢালব।’ মতি ভাই অবস্থা বেগতিক দেখে বাণিজ্য মেলায় যাওয়ার জন্য রাজি হয়ে গেল।

দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা হলো। মতি ভাই বেশ মনমরা হয়ে বসে আছে। স্ত্রী এসে মতি ভাইকে বলল, ‘তাহলে কাল কখন আমরা যাচ্ছি?’

‘কাল! কাল কী? কোথায় যাওয়ার কথা বলছ?’

‘বেশি অভিনয় কোরো না। দুপুরের কথা ভুলে গেছ?’

‘ও আচ্ছা আচ্ছা, বাণিজ্য মেলার কথা বলছ, এখন বুঝলাম।’

‘তাহলে কখন বের হচ্ছি?’

‘বিকেলে বের হবো।’

‘টাকা-পয়সা রেডি রেখো।’

‘তুমি তো ঘুরতে যাবে, তুমি কি কিনতে যাবে নাকি?’

‘কী কও এসব? কিনব মানে? দাঁড়াও আমি লিস্ট করে দিচ্ছি...’

এ কথা বলেই মতি ভাইয়ের স্ত্রী লিস্ট করতে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর বিশাল একটা লিস্ট নিয়ে এল। মতি ভাইয়ের হাতে দিতেই মতি ভাই মাথা ঘুরে পড়ে গেল। এই সময় স্ত্রী কোথায় সেবা করবে তা না, হুংকার দিয়ে বলে উঠল, ‘তাড়াতাড়ি ওঠো। তোমার এসব আমি বুঝি। আর একটু দেরি হলে আবার পানি ঢেলে দেব।’ মতি ভাই এই কথা শুনেই তাড়াতাড়ি উঠে বসল। স্ত্রীকে খুব অনুনয়-বিনয় করেও লিস্ট থেকে কোনো আইটেম কমাতে পারল না।

মতি ভাই রেডি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এদিকে স্ত্রী এখনো মেকআপ নিয়েই ব্যস্ত। স্ত্রীকে এই কাজই খুব মনোযোগ দিয়ে করতে দেখেছে মতি ভাই। মুখের ওপর কয়েক আস্তর মেকআপ লাগিয়ে স্ত্রী মতি ভাইকে জিজ্ঞেস করল, ‘কেমন লাগছে আমাকে?’

মতি ভাই ভালো করেই জানে স্ত্রীদের পেত্নির মতো লাগলেও সুন্দর বলতে হয়।

‘সুন্দর, বেশ সুন্দর লাগছে।’

মতি ভাইয়ের কথা শুনে স্ত্রী খুশিতে গদগদ হয়ে গেল।

স্ত্রীকে নিয়ে মেলায় প্রবেশ করল মতি ভাই। স্ত্রী একবার এটা দেখছে তো আরেকবার ওটা দেখছে। একবার এ স্টলে ঢুকছে তো আরেকবার ও স্টলে ঢুকছে। স্ত্রীর কর্মকাণ্ডে মতি ভাই বেশ বিরক্ত। স্ত্রী এতক্ষণ ঘুরে একটা শাড়ি পছন্দ করল। স্ত্রী বলল, ‘টাকা-পয়সা ঠিকমতো এনেছ নাকি?’

‘ভয় নাই, এনেছি।’

‘দেখি দেখি, মানিব্যাগ দেখি।’

মানিব্যাগে পর্যাপ্ত টাকা দেখে স্ত্রী তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে লাগল। আজ যত ইচ্ছে তত কেনাকাটা করা যাবে। মতি ভাই মনে মনে বলছে, দাঁড়াও তোমাকে কেনাকাটা থেকে কিভাবে বিরত রাখা যায়, তা আমি ভালো করেই জানি। একটা স্টলে ঢুকেই একটা গয়না পছন্দ হওয়ায় মতি ভাইয়ের স্ত্রী বায়না ধরেছে কিনে দিতে হবে। মতি ভাই রাজি হয়ে গেল। কিন্তু পকেটে হাত দিয়ে দেখল মানিব্যাগ নেই। ঘটনা কী? মানিব্যাগ কি তাহলে পকেটমার মেরে দিল? মতি ভাইয়ের অবস্থা দেখে তার স্ত্রীও আফসোস করতে লাগল। স্ত্রীর কাছে থাকা অল্প কিছু টাকা দিয়ে বাসায় এল তারা। বাসায় এসে মতি ভাই একা একা হাসছে। স্ত্রীকে একটা ধোঁকা দেওয়া গেল। মতি ভাইয়ের মানিব্যাগ পুরোনো হয়ে গিয়েছিল। তাই মানিব্যাগ ফেলে দিয়ে টাকাগুলো প্যান্টের ভাঁজের মধ্যে লুকিয়ে ফেলেছিল। আর স্ত্রীকে বুঝিয়েছিল পকেটমার তার মানিব্যাগ মেরে দিয়েছে।

বাণিজ্য মেলায় ঘুরে বেড়ানোর কারণে জামাকাপড় ময়লা হয়ে গেছে। মতি ভাই স্ত্রীকে জামাকাপড়গুলো ধুয়ে দিল। স্ত্রী প্যান্ট ধুতে গিয়ে প্যান্টের পায়ের দিকের ভাঁজগুলো খুলতে লাগল। হঠাত্ দেখল ভাঁজের ভিতর টাকা। তার মানে মতি ভাই তার স্ত্রীর সঙ্গে প্রতারণা করেছে? স্ত্রী মতি ভাইয়ের ফন্দি বুঝে ফেলল। সে টাকাগুলো রেখে দিয়ে চুপচাপ থাকল। হঠাত্ মতি ভাইয়ের মনে হলো আরে প্যান্টের ভাঁজে তো টাকা আছে। তাড়াতাড়ি বারান্দায় গেল প্যান্টটা দেখতে। গিয়ে দেখে টাকা নেই। কিন্তু স্ত্রীকে এ কথা কিভাবে বলবে? বললেই তো ধরা পড়ে যাবে। তারপরও সাহস করে বলল, ‘তুমি কি আমার প্যান্টে কোনো টাকা পেয়েছ?’

‘কীসের টাকা? তোমার কাছে তো টাকা ছিল না।’

‘না মানে...’

‘মানে মানে করো কেন?’

এরপর ‘প্রতারক, ভণ্ড...’ বলে মতি ভাইকে তাড়া শুরু করল।   g