আজ মায়ের চতুর্দশতম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০০৬-এর ২৫শে ডিসেম্বর ৯২ বছর বয়সে সকলের মায়া ত্যাগ করে তিনি এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। পৃথিবীতে প্রতিটি সন্তানের কাছে মা পরমারাধ্য। আমার জীবনেও মা প্রিয় মানুষ, শ্রেষ্ঠ সম্পদ। মায়ের স্নেহ-আদরে বড় হয়েছি। মায়ের পবিত্র মুখখানি যখনই চোখের সামনে ভেসে ওঠে, মনে হয়—এখুনি মায়ের কাছে ছুটে যাই। জন্ম থেকে পরিণত বয়স পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে মা যত্ন করে আমায় গড়ে তুলেছেন। মাকে ছাড়া এক মুহূর্তও থাকতে পারতাম না। শৈশব আর কৈশোরের সেই দিনগুলোর কথা ভাবলে দুচোখ ভিজে আসে।
মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান আমি। তিন ভাই, চার বোনের মধ্যে আমার অবস্থান পঞ্চম। বিদ্যালয় জীবনের সূচনাতে নিজ বাড়িতে থেকে গ্রামের স্কুল কোড়ালিয়া ফ্রি প্রাইমারি স্কুলে লেখাপড়ায় হাতেখড়ি। এরপর বাড়িতে থেকে খায়েরহাট জুনিয়র হাই স্কুল থেকে ষষ্ঠ শ্রেণি পাশ করে বোরহানউদ্দিন হাই স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হই। তখনকার দিনে এত হাইস্কুল ছিল না। আমাদের এলাকা বোরহানউদ্দিনে একটি মাত্র হাইস্কুল ছিল, সেখানে ভর্তি হই। স্কুলে তখন কোনো হোস্টেল ছিল না। সেই ছোট্টকালেই যখন আমার বয়স মাত্র ১৩, তখন আত্মীয়স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীর বাড়িতে থেকে পড়ালেখা করতে হয়েছে। কষ্ট হলেও মা আমাকে আদর করে লেখাপড়ায় নিয়মিত উত্সাহ জোগাতেন। ১৯৫৭-এর জানুয়ারি মাসে ভোলা সরকারি স্কুলে ভর্তি হয়ে স্কুল হোস্টেলে থাকতে শুরু করি। শুরু হয় হোস্টেলে থেকে লেখাপড়ার পালা। স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে মোট ১৪টি বছর হোস্টেলে ছিলাম। মা আমাকে আদর করে ‘মনু’ বলে ডাকতেন। সব সময় বলতেন, ‘মনু, মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া করো।’ মায়ের নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করতাম। মাকে ছেড়ে জীবনের প্রথম হোস্টেল-জীবন। মন পড়ে থাকত মায়ের কাছে। অপেক্ষায় থাকতাম কখন মায়ের কাছে যাব। প্রতি সপ্তাহে ছুটির আগের দিন মায়ের কাছে চলে যেতাম। স্কুলের শিক্ষকগণ স্নেহ করতেন। মনে পড়ে, স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রী, রাজনৈতিক সচিব হিসেবে বরিশালে তার সফরসঙ্গী হয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধুকে অভ্যর্থনা জানাবার জন্য জেলা প্রশাসক থেকে শুরু করে সব গণ্যমান্য ব্যক্তি সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো। প্রেজেন্টেশন লাইনে আমার স্কুলের শিক্ষক তসীর আহমেদ স্যার দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি তখন বরিশাল জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে বললাম, ‘বঙ্গবন্ধু, আমার স্যার।’ বঙ্গবন্ধু সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ‘তুমি এখনো সালাম করো নাই।’ আমি দ্রুত তার পা ছুঁয়ে সালাম করলাম। পরিবার, বিশেষ করে মা, শিক্ষালয় এবং বঙ্গবন্ধুর থেকে অর্জিত মূল্যবোধ দিয়েই গড়ে উঠেছে আমার জীবন ও আচরণ।
পঁচাত্তরের পর চরম দুঃসময়। আমি তখন কারাগারে। দেশ জুড়ে কারফিউ, হত্যা, গুম, গ্রেফতার আর ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলা। আমার এপিএস ছিল শফিকুল ইসলাম মিন্টু। ১৫ই আগস্টের পর আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য খুনি ক্যাপ্টেন মাজেদের নেতৃত্বে কতিপয় সেনাসদস্য তাকে ধরে নিয়ে যায়। কিন্তু মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে রাজি না হওয়ায় মিন্টুকে হত্যা করে। তার মৃতদেহ পাওয়া যায়নি। আমার মেজো ভাইকে গ্রামের বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে ’৭৫-এর ৫ই অক্টোবর খুনি ক্যাপ্টেন মাজেদের নির্দেশে গুলি করে হত্যা করা হয়। আমি তখন ময়মনসিংহ কারাগারে ফাঁসির আসামির কনডেম সেলে বন্দি। তিন ছেলের দুজন মৃত একজন কারাগারে। মায়ের তখন করুণ অবস্থা। এই অসহায় অবস্থায় মা জীবন কাটিয়েছেন।
পঁচাত্তরের জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর আমি ৩৩ মাস ময়মনসিংহ ও কুষ্টিয়া কারাগারে বন্দি ছিলাম। জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় এলে ’৮৩-এর ১৫ই ফেব্রুয়ারি আমাকে গ্রেফতার করে প্রথমে সেনানিবাসে পরে সিলেট কারাগারে পাঠায়। সিলেট কারাগারে গিয়ে মা আমার সঙ্গে দেখা করেছেন। ২০০২-এ সিঙ্গাপুর থেকে চিকিত্সা শেষে ঢাকা বিমানবন্দরে অবতরণের পর আমাকে গ্রেফতার করে কাশিমপুর কারাগারে ফাঁসির আসামির কনডেম সেলে রাখে। পরে কুষ্টিয়া কারাগারে পাঠায়। ২০০২-এ মায়ের বয়স তখন ৮৮ বছর। অসুস্থ শরীরে তিনি আমাকে দেখতে কুষ্টিয়া কারাগারে ছুটে গিয়েছেন। একনজর মায়ের মুখখানি দেখে মনে অনাবিল শান্তি অনুভব করেছি। স্বাধীন বাংলাদেশে সর্বমোট সাত বার আমাকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং প্রত্যেকটি কারাগারে আমার বৃদ্ধা মা ছেলেকে দেখার জন্য ছুটে গিয়েছেন। সে কী কষ্ট! জেলগেটে যখন মা আমার সঙ্গে দেখা করতেন সর্বক্ষণ আমার মাথা মায়ের বুকে থাকত। যখন তিনি আমাকে রেখে বিদায় নিতেন, তখন তার দুচোখে অশ্রুর নদী। দুই ছেলে মৃত্যুবরণ করেছে। এক ছেলে কারান্তরালে। কী নিঃস্ব রিক্ত আমার মা!
’৯৬-এ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারে আমি শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী। বেইলি রোডে অবস্থিত বাসভবন ‘তন্ময়’-এ থাকি। মা আমার সঙ্গে থাকতেন। প্রতিদিন মায়ের আদর নিয়ে দিনের কাজ শুরু করতাম। বনানীর বাড়িতে আমার শয়নকক্ষের পাশেই মায়ের ঘর। সকালে ঘুম ভাঙার পর মায়ের স্নেহের আলিঙ্গন ছিল নিত্যদিনের পাথেয়। মাকে চুমু দিয়ে সকালে বের হতাম, না ফেরা পর্যন্ত জানালার কাছে তসবিহ হাতে নিয়ে মা পথের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। ঘরে প্রবেশ করেই মাকে চুমু দিয়ে শয়নকক্ষে যেতাম। আমার বন্ধুবান্ধব-স্বজন প্রত্যেককেই মা অন্তর থেকে ভালোবাসতেন। মা যখন অসুস্থ, প্রত্যেকেই তার সেবা-শুশ্রূষা করেছেন।
n লেখক :আওয়ামী লীগ নেতা; সংসদ সদস্য; সভাপতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি, জাতীয় সংসদ।
