দেশের বিশিষ্ট শিল্পপতি, পারটেক্স গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও সাবেক সংসদ সদস্য এম এ হাসেম আর নেই (ইন্না লিল্লাহি...রাজিউন)। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় বুধবার দিবাগত রাতে তিনি মারা যান। তিনি স্ত্রী ও পাঁচ ছেলেসহ অসংখ্য আত্মীয়স্বজন, গুণগ্রাহী ও শুভানুধ্যায়ী রেখে গেছেন।
এম এ হাসেমের ছেলে শওকত আজিজ রাসেল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পিতার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে ফেসবুকে দেওয়া স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘রাত ১টা ২০ মিনিটে আমার বাবা ৭৮ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন।’ এম এ হাসেমের ভাগনে এস এম কাউসার গতকাল বৃহস্পতিবার ইত্তেফাককে জানান, মরদেহ এভারকেয়ার হাসপাতালের মরচুয়ারিতে রাখা হয়েছে। আজ শুক্রবার বাদ জুমা গুলশান আজাদ মসজিদে জানাজা শেষে তাকে বনানী কবরস্থানে দাফন করা হবে।
গত ১১ ডিসেম্বর কোভিড-১৯ সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পর এম এ হাসেমকে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ১৬ ডিসেম্বর থেকে তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। করোনায় আক্রান্ত হলেও দুই দিন পরেই আবার ফলাফল নেগেটিভ আসে। তবে তার ফুসফুসে সংক্রমণ ধরা পড়ে। এছাড়া বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি।এম এ হাসেমের মৃত্যুতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী ও সামাজিক সংগঠন গভীর শোক প্রকাশ করেছে। জাতীয় পার্টি-জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ও সাধারণ সম্পাদক শেখ শহীদুল ইসলাম এম এ হাসেমের ইন্তেকালে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। গতকাল এক যুক্ত শোকবার্তায় জেপির নেতৃদ্বয় বলেন, এম এ হাসেম এক জন বিশিষ্ট শিল্পোদ্যোক্তা ছিলেন। তিনি ব্যাংকিং ও বস্ত্র খাতসহ অন্যান্য শিল্প খাতে অনেক কারখানা স্থাপন করেছেন, এর ফলে বিপুল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়। তার ইন্তেকালে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের জগতে এক অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হলো। তারা মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকার্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান জি এম কাদের ও মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুও গভীর শোক জানিয়েছেন।
এম এ হাসেম ২০০১ সালে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ থেকে বিএনপির প্রার্থী হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। কথিত ওয়ান ইলেভেনের সময় তিনি গ্রেফতার হন। পরে মুক্তি পেলেও তিনি আর রাজনীতিতে যুক্ত হননি।
তিনি ১৯৫৯ সালে তামাকপণ্যের কেনাবেচার মাধ্যমে ব্যবসা শুরু করেন। ১৯৭০-এর কিছু আগে তিনি চট্টগ্রামে মেসার্স হাসেম করপোরেশন গড়ে তোলেন। দেশ স্বাধীনের পর তিনি নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের পাশাপাশি সিমেন্ট ও ইস্পাত আমদানি শুরু করেন। এরপর দেশেই বিভিন্ন কারখানা গড়ে তোলেন। এভাবেই গড়ে ওঠে পারটেক্স গ্রুপ। এম এ হাসেম বিভিন্ন ব্যবসার পাশাপাশি বেসরকারি খাতের সিটি ও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতাদেরও এক জন। ব্যাংক দুটির চেয়ারম্যান পদেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া জনতা ইনসিওরেন্স কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতাদেরও এক জন তিনি। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি ট্রাস্টেরও চেয়ারম্যান ছিলেন প্রয়াত এম এ হাসেম।
বাংলাদেশের বড় শিল্প গ্রুপগুলোর একটি পারটেক্স গ্রুপ। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিজের ব্যাবসায়িক ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনেন হাসেম। এতে পারটেক্স গ্রুপ ও পারটেক্স স্টার গ্রুপ থেকে আলাদা করে প্রতিষ্ঠা করা হয় আম্বার গ্রুপ। এসব গ্রুপের অধীনে রয়েছে ৬০টির বেশি কোম্পানি, যেগুলোর দায়িত্ব ছেলেদের হাতে দেন তিনি। হাসেমের স্ত্রী সুলতানা হাসেম ও পুত্রবধূরাও এসব কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে রয়েছেন। এম এ হাসেমের পাঁচ ছেলের মধ্যে সবার বড় আজিজ আল কায়সার টিটো পারটেক্স স্টার গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান। দ্বিতীয় ছেলে আজিজ আল মাহমুদ মিঠু পারটেক্স স্টার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও আইডিএলসি ফাইন্যান্সের চেয়ারম্যান। পারটেক্স গ্রুপের বিভিন্ন কোম্পানি দেখভাল করছেন হাসেমের দুই ছেলে আজিজ আল মাসুদ ও আশফাক আজিজ রুবেল। শওকত আজিজ রাসেল দেখছেন আম্বার গ্রুপ, এছাড়া রাসেল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক।
