সবুজ বনবীথিকায় টিলা-পাহাড়ে ঘেরা সিলেট। সিলেট শহরের উপকণ্ঠে রয়েছে অনেকগুলো চা-বাগান। ১৮৫৪ সালে সিলেটের শহরতলিতে গড়ে ওঠে বাংলাদেশের প্রথম চা-বাগান মালনীছড়া। চারদিকে অনেকগুলো চা-বাগান— লাক্কাতুরা, আলীবাহার, খাদিমনগর, দলদলি, তারাপুর ইত্যাদি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে শহিদ হয়েছেন চা-বাগানের অসংখ্য মানুষ।
চা-বাগানের মালিক-শ্রমিক-কর্মচারীদের দিকে ছিল পাকিস্তানি সৈন্যদের শ্যেনদৃষ্টি। তারাপুর চা-বাগানে হানা দিয়ে গণহত্যা ঘটায় তারা। ১৯৭১ সালের ১৮ এপ্রিল সকাল ১১টায় ৬০-৭০ জনের পাকিস্তানিবাহিনী তারাপুর চা-বাগানে ঢুকে পড়ে। তখন বাগানটির নাম ছিল ‘দ্যা স্টার টি গার্ডেন’। আগের দিন তিনজন সুবেদার এসে বাগানের মালিক রাজেন্দ্র গুপ্তের সঙ্গে দেখা করে; বাগানের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালু রাখার নির্দেশ দিয়ে যায়। ১৮ এপ্রিল সেই সুবেদারসহ পাকিস্তানি সৈন্যরা বাগানে আসে। ওরা রাজেন্দ্র গুপ্তের সঙ্গে কথা বলে নির্বিঘ্নে চলাচলের জন্য ‘ডান্ডিকার্ড’ আনতে সিলেট রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুলে তাদের ক্যাম্পে যেতে হবে বলে জানায়। সৈন্যরা বাগানের বস্তিতে চৌকিদার পাঠিয়ে যুবক ও বয়স্ক শ্রমিকদের বাংলোতে এনে জড়ো করে। পরিবারের জায়া-কন্যাদের দেখাশোনার জন্য রাজেন্দ্র গুপ্ত তাঁর ১৭ বছর বয়সি ছেলে পঙ্কজ গুপ্তকে রেখে যাওয়ার অনুরোধ করলে সৈন্যরা তাকে ছেড়ে দেয়। গুপ্ত পরিবারের সদস্যদের একটি জিপে এবং শ্রমিক-কর্মচারীদেরকে ট্রাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রায় ৪০-৪৫ জনকে ধরে নিয়ে মালনীছড়ার টিলার ওপরে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করে। ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান বাগানের শ্রমিক সদানন্দ ও গণেশ। সদানন্দের হাঁটুতে গুলি লাগলেও গণেশ অক্ষত ছিলেন। তাঁরা বাগানে ফিরে এসে সেই নৃশংস ঘটনা বর্ণনা করেন।
গণহত্যার পর পুরো বাগান পুরুষশূন্য হয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানি সেনারা আবার বাগানে এসে নারীদের খোঁজ করে। কাউকে না পেয়ে ওরা আক্রোশে গুলি করে হত্যা করে বাংলোর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা নেপালি নবী রামকে। বন্দি করে নিয়ে যায় পঙ্কজ গুপ্ত, নরেশ চক্রবর্তী, নারায়ণ চক্রবর্তী, শ্রমিক দুর্গেশ দাস, মহেন্দ্র পালকে। তারাপুর বাগানের পাশের এলাকা ঘোষপাড়ায় একটি ছনের ঘরে একে একে হত্যা করা হয় সবাইকে। অলৌকিকভাবে বেঁচে যান পঙ্কজ গুপ্ত।
তারাপুর চা-বাগানে এই গণহত্যায় শহিদদের স্মরণে ১৯৮৮ সালে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়। শহিদদের নামের তালিকা খচিত স্মৃতিস্তম্ভটি অত্যন্ত ছোট পরিসরে নির্মিত। বাগানের বুক চিরে যে রাস্তা তৈরি হয়েছে, সেই ব্যস্ত রাস্তার পাশে শীর্ণকায় স্মৃতিস্তম্ভটি দাঁড়িয়ে আছে।
