সাইবার বুলিং :চুপ থাকা যাইবে না

আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর ২০২০, ২২:৩২

 ‘প্রেমের ফাঁদ পাতা ভুবনে, কে কোথা ধরা পড়ে, কে জানে—।’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতাটি একটুখানি ঘুরাইয়া এখন বলা যায়—আন্তর্জালের ফাঁদ পাতা আছে ভুবনে। আমরা জানি না, সেই ফাঁদে কে কখন কোথায় ধরা পড়িবে। রবীন্দ্রনাথ রোমান্টিক ভঙ্গিতে কথাটি ইতিবাচকভাবে বলিলেও আন্তর্জালের ফাঁদ মোটেই সুখকর নহে। বিশেষ করিয়া টিনএজ বয়সের মেয়েদের জন্য। ইন্টারনেটের ব্যাপক সুবিধার বিপরীতে যেই সকল অসুবিধা আমাদের জন্য অত্যন্ত দুশ্চিন্তার, তাহার একটি হইল সাইবার বুলিং। এবং এই সাইবার বুলিংয়ের শিকার হইবার প্রধান কারণ অজ্ঞতা ও কৌতূহল। সিআইডির সদর দপ্তর সূত্র বলিতেছে, সম্প্রতি ১৭ হাজার অভিযোগ জমা পড়িয়াছে সাইবার পুলিশ সেন্টারের ফেসবুক পেজে। ইহা ছাড়া ফোনে অভিযোগ করিয়াছেন প্রায় ৩৮ হাজার ভুক্তভোগী। সাইবার বুলিংয়ের শিকার হইয়া অনেক টিনএজ মেয়ে আত্মহত্যা পর্যন্ত করিয়া থাকে। এই তো গত বত্সর আগস্টের কাহিনি—পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়ার ১৬ বত্সর বয়সি স্কুল শিক্ষার্থী রূপা আত্মহত্যা করে সাইবার বুলিংয়ের শিকার হইয়া। পত্রিকান্তরে জানা যায়, রূপার এক পরিচিত ছেলে তাহার সহিত প্রেম না করিলে রূপার আপত্তিকর ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়াইয়া দেওয়ার হুমকি দেয়। তাহার পর রূপার ছবি ফটোশপ করিয়া ঐ ছেলেটি বিভিন্ন জনের নিকট ছড়াইয়া দিলে রূপা আত্মহত্যা করিতে বাধ্য হয়।

এই সমস্যা এখন বৈশ্বিক। যেমন, যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনার মেসা শহরের ১০ বত্সর বয়সি মারিয়ান হার্নান্দেজ রোখাস সম্প্রতি আত্মহত্যা করিয়াছে সাইবার বুলিংয়ের শিকার হইয়া। সারা বিশ্বেই প্রতিদিন এইরকম অসংখ্য অল্প বয়সি অপার সম্ভাবনার শিশুগুলি বিকশিত হইবার পূর্বেই ঝরিয়া পড়িতেছে! ইউনিসেফ সম্প্রতি জানাইয়াছে—সাইবার বুলিংয়ের শিকার হওয়া ৩৮ শতাংশ ভুক্তভোগী ১০ হইতে ১৩ বত্সর বয়সের, ৩৬ শতাংশ ১৪-১৫ বত্সর এবং ১৬-১৭ বত্সর বয়সি ২৫ শতাংশ। তবে শুরুতে কেবল টিনএজাররাই কেবল এই ধরনের কাজে জড়িত থাকে ভাবিয়া বুলিং সংজ্ঞায়িত করা হইলেও পরে দেখা গিয়াছে, অনেক ক্ষেত্রে স্বনামে বা ফেক আইডির আড়ালে প্রাপ্তবয়স্ক অনেকেই এই ধরনের হীন কাজে জড়াইয়া থাকেন। দুশ্চিন্তার কথা হইল, সাইবার বুলিংয়ের কোনো সূত্র পাওয়া গেলে বা এই ধরনের ঘটনা একবার ঘটিলে বিকৃত ও অসুস্থ মানসিকতার লোকদের নিকট ভিকটিমের তথ্য চলিয়া যায়। ফলে ধীরে ধীরে ইহার মাত্রা বাড়িতেই থাকে। ইহারই ক্রমবর্ধমান চাপে শিশুর মধ্যে ডিপ্রেশন, পড়াশোনার প্রতি অনীহা, ইনসমনিয়া হইতে শুরু করিয়া আত্মহত্যার প্রবণতা তৈরি হইতে পারে। করোনা পরিস্থিতিতে ইন্টারনেটের ব্যবহার বাড়িয়া যাইবার কারণে সাইবার বুলিংও অনেক বৃদ্ধি পাইয়াছে। যেই কারণে ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মেয়েদের ছবি ব্যবহার করিয়া প্রতারণা, পর্নোগ্রাফি, আপত্তিকর প্রস্তাব, অশ্লীল ছবি বা ভিডিওবার্তা দিয়া হয়রানির ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটিতেছে।

সাইবার বুলিংয়ের অন্যতম প্রধান কারণ অজ্ঞতা ও আবেগ। শুধু আবেগ নিয়ন্ত্রণ করিতে পারিলেই এই ধরনের অনেক ঘটনা কমিয়া যাইবে নিঃসন্দেহে। অপরদিকে সচেতনতার বিকল্প নাই। সাইবার বুলিং এমন পর্যায়ে চলিয়া গিয়াছে যে, এখন লজ্জা আর ভয় পাইলে চলিবে না। ভুক্তভোগীদের সাহসী ও সোচ্চার হইতেই হইবে। সাইবার স্পেসে হয়রানির শিকার হইলে পুলিশের নিকট অভিযোগ করিতে দ্বিধা করা যাইবে না। অপরাধীরা যখন বুঝিবে, অপরাধ করিলে কঠিন শাস্তি পাইতে হইবে তখন অন্য অপরাধমনস্করাও খোলসের মধ্যে ঢুকিয়া থাকিবে। সাইবার বুলিংয়ের মাধ্যমে অনলাইনে অল্প বয়সি মেয়েদের প্রলুব্ধ বা হেয় প্রতিপন্ন করিয়া, ভয় দেখাইয়া মানসিক নির্যাতনের লাগাম টানিতেই হইবে।