জাহিদুর রহমান উজ্জ্বল
বুঝতে শেখার পর থেকে আমাদের বাড়িতে দুটি পত্রিকা আসতে দেখেছি। একটা দৈনিক ইত্তেফাক, অন্যটি সাপ্তাহিক চিত্রালী। বাবা বাজারে গেলেই বিকালে পত্রিকাটি ধরিয়ে দিতেন পত্রিকা এজেন্ট আজিজ ভাই। তিনি মাদারগঞ্জের প্রথম স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনকারী।
বাড়িতে পত্রিকা এলে বড় ভাইবোনেরা পত্রিকা পড়ার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ত। বুধবার চিত্রালী এলে তো কথাই নেই। ছোটবেলা পত্রিকার ছবি দেখতাম। একটু বড় হয়ে পত্রিকা পড়া শিখলাম। কচি-কাঁচার আসরের সদস্য হয়েছিলাম ছোট বয়সে। বাবা নানান কাজে ব্যস্ত থাকায় বড়ভাই সবসময় পত্রিকা নিয়ে আসত। প্রায় বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যায় ইত্তেফাক পৌঁছাত বাড়িতে। তখন এই অঞ্চলে বিদ্যুত্ ছিল না। হেরিকেনের আলোয় পত্রিকা পড়া হতো। পরদিন সকালে আমাদের ছয়চালা কাচারির বারান্দায় অনেকে পত্রিকা পড়তে আসতেন।
ইত্তেফাকের সঙ্গে পাঠক হিসাবে প্রেম তো দীর্ঘদিনের। আশির দশকের মাঝামাঝি বড়ভাই চাকরিতে গেল, দুলাল ভাই বিদেশে, অন্য ভাইয়েরা ঢাকায়। তখন বাড়িতে বাবা, মা ও আমি। বাজারে গিয়ে অন্যান্য জিনিসের সঙ্গে ইত্তেফাক নিয়ে আসার দায়িত্বটা আমার। প্রতি বিকালে প্রেমিকার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকার মতো আজিজ ভাইয়ের পত্রিকার স্টলে দাঁড়িয়ে থেকেছি। ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে ঐ নিমতলার ছোট্ট ঘরে বালিজুড়ি পোস্ট অফিসের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থেকেছি বাবুলাল ডাকহরকরার জন্য। কখন তিনি দু চাকার সাইকেলে ভর করে খাকি রঙের বস্তায় ডাক আনবেন। গুটি কয়েক হলুদ খামের মাঝে পত্রিকার বান্ডিল।
আজিজ ভাই খুঁড়িয়ে চলতেন; পত্রিকার বান্ডিল নিয়ে যাওয়া ছিল এক দুঃসাধ্য ব্যাপার। আমি তাঁকে সাহায্য করতাম, তিনি কাউকে পত্রিকার বান্ডিল ধরতে দিতেন না। নিজহাতে বান্ডিল খুলে পত্রিকায় চোখ বুলিয়ে পরে গ্রাহককে দিতেন। ইত্তেফাকের চাহিদা ছিল শীর্ষে। প্রতিদিন এভাবে পত্রিকা নিয়ে বাড়িতে ফিরে পুরোটা না পড়া পর্যন্ত ঘুম আসত না। কচি-কাঁচার আসরে লেখা পাঠাতাম, চিঠিপত্র বিভাগেও। ছাপা হয়েছে অনেক। ১৯৮৮ সালে মফস্সল সাংবাদিকতা শুরু করি। ইত্তেফাকে উপজেলা সংবাদদাতা হিসাবে কোনো পদ ছিল না। তাই দীর্ঘদিন এই পত্রিকায় কাজ করার আগ্রহ থাকলেও সম্ভব হয়ে ওঠেনি। ১৯৯৯ সালে সেই সুযোগ আসে। ইত্তেফাকের উপজেলা সংবাদদাতা হিসাবে নিয়োগ শুরু হলে আমি যোগ দেই। সেই থেকে পথ চলছি ইত্তেফাকের সঙ্গে। ইত্তেফাকের নিউজ করতে গিয়ে গ্রামের পর গ্রাম ঘুরেছি। তুলে এনেছি একদম পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর দিনযাপনের খবর, শিকলবন্দি গৃহবধূর মানবিক জীবন, জঙ্গির আস্তানার ভয়ংকর রিপোর্ট, কখনো যমুনার ভাঙনের ছবি, বন্যায় ভেসে যাওয়া, রাজনৈতিক সহিংসতা ইত্যাদি। পাতাকুড়ুনি, কচুপাতা তোলা কৃষানি বউয়ের ছবি। বাদ যায়নি ইঁদুরের গর্ত খুঁড়ে ধান বের করে আনা বালিকাদের খবর। মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে খবর বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে নিহত ছয় শহিদের বধ্যভূমি খুঁজে বের করার খবরটি ছাপা হলে গর্বে বুক প্রসারিত হয়। আবার খবর ছাপা হলে কখনো প্রশংসা, কখনো নিন্দাও শুনতে হয়েছে।
আগের ইয়াশিকা ক্যামেরার ফ্লিম কেড়ে নেওয়ার হুমকির মধ্যেই শাহাজামালের বাড়ি পোড়ানোর ছবি নিয়েছি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে চোখ রাঙানি দেখেছি। সার নিয়ে কৃষকের বিক্ষোভের ছবি ছাপিয়ে হুমকি পেয়েছি। এইসব দিনরাত্রির মতো স্মৃতি। আমার এই পথ চলার সঙ্গে ইত্তেফাক রয়েছে। সত্য আর নিরপেক্ষতায় একনিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। ইত্তেফাক আমার প্রথম প্রেম। ভালোবাসার ঘর-বসতি। তুমি বেঁচে থাকো হাজার বছর ইত্তেফাক।
জামালপুর
