অমিত ইমতিয়াজ
পৃথিবীর বিবর্তনে সবচেয়ে শক্তিশালী অলিখিত ইতিহাস হচ্ছে স্থাপত্য। অনেকক্ষেত্রে বইয়ের পাতায় যে ইতিহাস-ঐতিহ্যের কথা পাই তা হারিয়েও যেতে পারে। কিন্তু ইট-চুন-সুরকিতে লেখা ইতিহাস সহজে হারায় না। সভ্যতার প্রয়োজনে তারা কথা বলে ওঠে। এর সত্যতা জানতে বহুদূর যাবার দরকার নেই, পাহাড়পুর কিংবা ময়নামতিতেই আমরা খুঁজে পাব। পানাম নগরীর ইতিহাস বই খুলে না পড়লেও ঐ মৃত নগরীর সরু রাস্তা ধরে হেঁটে গেলেই যে কেউ শুনতে পাবে এই নগরীর গল্প।
এই মাটি, এই দেশ কী বুঝতে হলে এর ক্রমবিকাশ, ঐতিহ্যের ধারা, স্বকীয়তার টানাপোড়েন, জাতি হিসেবে চারিত্রিক গুণাবলি আর রুচি বুঝতে হবে। অনেকক্ষেত্রে আমরা কতটুকু এগিয়েছি তা বুঝতে হলেও এই অলিখিত ইতিহাসের দিকে চোখ ফেরাতে হয়। গত এক বা দুই দশকে আমাদের স্থপতিরা নিজস্ব ধারার স্থাপনা পৃথিবীর বুকে তুলে ধরেছেন। তবে এই প্রক্রিয়াটা কিন্তু হঠাত্ শুরু হয়েছে তা না, শুরু হয়েছিল যখন স্থপতি মাজহারুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৫৪ সালে চারুকলা ইন্সটিটিউটের নকশা করেন। তিনি কালজয়ী স্থপতি লুই আই কান-কে নিয়ে এসেছেন জাতীয় সংসদ ভবনের নকশার জন্য। ষাটের দশকে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বাংলাদেশে তৈরি হয়—যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র, কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন, বুয়েট স্থাপত্য বিভাগ ভবন, ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটসহ নানা কালজয়ী স্থাপনা, যেগুলো এখনো আন্তর্জাতিকভাবে পড়াশোনা ও গবেষণার বিষয়।
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র ভেঙে বহুতল ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাকে আত্মঘাতী বলব। এর পূর্ব দিকে রয়েছে ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দান বা সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। দক্ষিণে বাংলা একাডেমি, আরো দক্ষিণে মুঘল স্থাপনা; ঢাকার প্রবেশদ্বার খ্যাত মির জুমলার তোরণ বা রমনা গেইট, যার উলটো পাশে তিন নেতার মাজার। কিছুদূর গেলেই দোয়েল চত্বর, যাকে ঘিরে আছে শিশু একাডেমি আর কার্জন হল। কার্জন হল থেকে পশ্চিমে শহিদ মিনার। আর উত্তরে শাহবাগ। এসব কিছুর নিউক্লিয়াস হলো ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র। উল্লিখিত ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো যে সাংস্কৃতিক বলয় তৈরি করেছে তা এই রাষ্ট্রের অলিখিত ইতিহাস। এই স্থাপনাগুলোই আমাদের ঐতিহ্যের কথা বলবে। এবার আসি এই স্থাপনার নির্মাণশৈলিতে, যার মূল ভবন নকশা করেন গ্রিক স্থপতি কন্সটেন্টিনোস এপোস্তলো ডক্সিয়াডিস। একটি অভ্যন্তরীণ উঠানকে কেন্দ্র করে তৈরি এই নকশা। ঢুকতেই যে ভবন তাতে ‘বাটারফ্লাই ক্যানপি’ দেখতে পাওয়া যায়, যা আসলে ছাদের কাঠামোকে অনেকটা প্রজাপতির পাখার মতো করে তুলেছে। এর ভেতরে পাওয়া যাবে ছাত্রসংগঠনগুলোর মূল কক্ষ, পাঠাগার, অডিটোরিয়াম, খাবারের জায়গা, খেলার জন্য নির্ধারিত কক্ষ, সুইমিং পুলসহ আরো কিছু সুবিধা সম্বলিত কক্ষ। অডিটোরিয়াম লম্বায় প্রায় ১৭০ ফিট আর চওড়ায় ৮৫ ফিট, যার ছাদ অর্ধ বৃত্তাকার বা প্যারাবলিক ভল্ট আকারে তৈরি। এই ছাদের নির্মাণশৈলী এখনো অনুকরণীয়। ভবনে জালির ব্যবহার যেমন আলো-বাতাসকে ঢুকতে দিচ্ছে, তেমনি অভ্যন্তরীণ পরিসরকে আড়ালও দিচ্ছে। চত্বরের সবগুলো ভবন স্টিলের কলামে তৈরি করিডোর দিয়ে সংযুক্ত যা করিডোরের অস্তিত্বকে বিলীন করে দিয়েছে। সর্বোপরি বাইরের সঙ্গে দৃশ্যত যে যোগাযোগ তা অটুট রেখেছে। কেন্দ্রীয় উঠানের দক্ষিণ-পূর্ব কোনায় আছে দেশের একমাত্র গ্রিক স্থাপনা, চৌকো একটি সমাধি, নির্মাণশৈলীতে গ্রিক স্থাপত্যের ছাপ সুস্পষ্ট। আর আছে দুটো শিব মন্দির। সবগুলো স্থাপনা যে সাম্য আর সামঞ্জস্যে একে অপরকে ধারণ করেছে তা এখনো আমাদের কাছে একটা ধাঁধার মতো। কেউ যদি একবার ভেতরে ঢোকে যেন নতুন আরেকটা শহর খুঁজে পাবে!
আমরা অবশ্যই চাই দেশের সবচেয়ে পুরনো আর ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসর বাড়ুক। কিন্তু ইতিহাস বিসর্জন দিয়ে নয়। আমরা কি এতই নির্বোধ হয়ে গেছি যে ইতিহাস, শহরের গল্প, নাগরিক মনন বিসর্জন দিয়ে এমন একটা স্থাপনা ভেঙে ফেলব?
স্থপতি ও সহকারী অধ্যাপক, স্থাপত্য বিভাগ,
চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়
