নূর মোহাম্মাদ আরিফ
বর্তমানে বাচ্চাদের একটা গণ্ডির মধ্য আটকে ফেলা হয়েছে। লেখাপড়া থেকে খাবার, বন্ধুবান্ধব, দিন থেকে শুরু করে রাত কিভাবে কাটবে তার লম্বা লিস্ট ধরিয়ে দেওয়া হয়। বাচ্চারা কী পছন্দ করে বা না করে সেদিকে খেয়াল রাখেন না অনেক বাবা-মা। বাচ্চারা যখন কথা শোনে না তখন রাগারাগি করা হয় আর যদি কথা শোনে তাহলে ‘লক্ষ্মী বাবু’ বলে আদর করা হয়। আমরা বাচ্চাদের শাসন করি তাদের ভালোর জন্য। কেন কথা শুনছ না, বেশি বুঝ—এসব বলে কথা শুনতে বাধ্য করা হয়। এসবের ফলে বাচ্চার মনে কেমন প্রভাব পড়ছে তা বাবা-মা কখনোই খেয়াল করেন না। বাচ্চারা যখন কৌতূহলে বাবা-মাকে বিভিন্ন প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে, অনেক মা-বাবা এসবকে মনে করেন আবোল-তাবোল বকা। তাঁরা হয়তো বলবেন বোকার মতো কথা বোলো না তো বা তুচ্ছ ভেবে উড়িয়ে দেবেন। বরং তাঁরা ভাবেন বাচ্চা মানুষ ও কী বুঝবে, আমরা যা বলি তাই ঠিক। যখন কথা শুনছে না তখন শাসনের মাত্রা বাড়িয়ে দেওয়া হয়। কিন্ত অতিরিক্ত চাপিয়ে দেওয়া, বাধ্য করা, শাসন করা—এতে হিতে বিপরীত হতে পারে তা অনেক বাবা-মা ভাবেন না।
একটা গল্প শোনাই। একদিন উলবার আর অরভাইল বড়শি দিয়ে মাছ ধরছিল, তাদের মা (সুসান রাইট) পাশে বসেছিলেন। অনেক সময় হয়ে গেল একটা মাছও বড়শি ঠোকরাতে এলো না। এমন সময় একটা পাখি ছোঁ মেরে নদীতে এসে ঠোঁট ঢুকিয়ে একটা ছোট মাছ মুখে নিয়ে সটান উড়ে গেল আকাশের দিকে। উলবার জিজ্ঞেস করল: পাখি কী দিয়ে ওড়ে মা? তিনি জবাব দিলেন, ‘পাখিরা ডানা নাড়িয়ে ওড়ে’—ওতেই ওরা তাড়াতাড়ি উড়ে যায়। পুরোপুরি না বুঝতে পেরে উলবার আবার প্রশ্ন করে: আচ্ছা মা ঐ যে পাখিটা ছোঁ মেরে মাছ ধরল, ও কিন্তু একটুও ডানা নাড়ল না। ছোঁ মেরে উড়ে এলো মাছ ধরে, আবার উড়ে গেল আকাশে। এর ভেতরে ওর ডানা কিন্তু একটুও নাড়ল না। মা উত্তর দিলেন: হাওয়া শুধু তোমার দিকে অথবা তোমার দিক থেকে অন্যদিকে বয়ে যায় না। হাওয়ার স্রোত ওপর-নিচেও ওঠানামা করে, পাখির ডানাই পাখিকে শূন্যের ওপর রাখে।
আমাদের ডানা থাকলে আমরাও উড়তে পারতাম না মা? উলবার জিজ্ঞেস করল। মা হেসে উত্তর দিলেন, খোদা তো আমাদের ডানা দেননি বাবা। উলবার তবু বলতে থাকে, ডানা হয়তো আমরা নিজেরা তৈরি করেও নিতে পারি। মা বললেন, একটা ছেলে আকাশে উড়তে পারে এমন ডানা কেউ কোনোদিন তৈরি করেনি। উলবার বলল, আমি তৈরি করব একদিন। তাদের মা মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বললেন, বড় হও চেষ্টা করে দেখতে পারবে।
এটা হচ্ছে একজন মায়ের বড় গুণ। অন্য অনেক মায়ের মতো এসবকে আবোল-তাবোল বকা মনে করেননি। তিনি বলেননি বোকার মতো কথা বোলো না তো বা তুচ্ছ ভেবে উড়িয়ে দেননি। উলবারের মা কিন্তু তা কখনোই করতেন না। এগারো বছরের ছেলের মাথা থেকে এমন আইডিয়া আসছে বলে সে আইডিয়া তুচ্ছ হতে পারে না। এমন কম বয়সের ছেলেরও নিজের একটা আইডিয়া থাকতে পারে। উলবারের মা তাঁদের সন্তানের চিন্তাগুলো তাচ্ছিল্য করেননি বলেই হয়তো উলবার আর অরভাইল আকাশে ওড়ার স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিতে পেরেছে। সেই স্বপ্ন আজ উড়োজাহাজ হয়ে আকশে উড়ছে। উলবারের বাবা কাজের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সময় থাকতেন বাড়ির বাইরে, মায়ের সঙ্গেই তাদের বেশি সময় কাটত।
সন্তানের জন্য মা একটি বিশ্ব পাঠশালা।
আপনার সন্তানকে বেশি বেশি সময় দিন। তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করুন। বেশি শাসনের নামে দূরত্ব তৈরি করবেন না, যদি একবার দূরত্ব তৈরি হয়ে যায়, সহজে তা আর ঘুচবে না।
বগুড়া
