মাধব রায়
সহকারী অধ্যাপক
ব্লুবার্ড হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ, সিলেট
বাংলাদেশের এই বীরের জন্ম পুরান ঢাকার ১০৯ আগাসাদেক রোডের পৈত্রিক নিবাস মোবারক লজ এ ১৯৪১ সালের ২৯ অক্টোবর। পিতা মৌলভী আব্দুস সামাদ, মাতা সৈয়দা মোবারকুন্নেসা খাতুন। ঢাকার সদরঘাটের কলিজিয়েট স্কুলে ৬ষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেন তিনি।। আরও ভালো লেখাপড়ার জন্য পিতা তাঁকে পাকিস্তান বিমান বাহিনীর পাবলিক স্কুল সারগোদায় ভর্তি করেন ১৯৫৬ সালে। সেখান থেকে ১৯৬০ সালে মেট্রিক পাশ করেন প্রথম বিভাগে। সেখান থেকেই দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেন। এরপর তিনি ১৯৬২ সালে বিমান বাহিনীর ফ্লাইং ক্যাডেট হিসেবে শর্ট কোর্সে যোগদান করেন। । পড়াশুনা, খেলাধুলাই শুধু নয়, দুষ্টোমি-দস্যিপনাতেও তাঁর জুড়ি মেলা ভার।
প্রশিক্ষণ শেষে ১৯৬৩ সালের ২৩ জুন রিসালপুরে পোস্টিং হয়। জিডি পাইলট হিসেবে কমিশন লাভ করেন তিনি। এরপর উচ্চতর প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন। মতিউর রহমান বাল্যকাল থেকেই সাহসী ও মেধাবি ছিলেন। বড় হয়েও তাঁর এই বৈশিষ্ট্য বজায় থাকে। মতিউর ১৯৬৫ সালে পাকভারত যুদ্ধে ফ্লাইং অফিসার হিসেবে কৃতিত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করেন। এই কৃতিত্বের জন্য পাকিস্তান সরকার তাঁকে সিতারা-ই-হারব খেতাব দেয়। কিন্তু সেই যুদ্ধে তার জন্মস্থান পূর্ব পাকিস্তান একেবারে অরক্ষিত থাকে। ভারত ইচ্ছা করলে একেবারে কোনও বাধা ছাড়াই পূর্ব পাকিস্তান দখল করে ফেলতে পারত। পাকিস্তান সর্বশক্তি নিয়োগ করে পশ্চিম পাকিস্তানকে রক্ষা করে। পূর্ব পাকিস্তান যে তার দেশের অংশ, সেই রকম কোনও দায়িত্বেরই পরিচয় দেয়নি তারা। এই ঘটনায় মতিউর পশ্চিম পাকিস্তানিদের প্রতি মনে মনে ঘৃণা পোষণ করতেন।
১৯৬৮ সালের ১৯ এপ্রিল তিনি ঢাকার হলিক্রস কলেজের ছাত্রী মিলি খান এর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৬৯ সালের ২৩ এপ্রিল প্রথম কন্যা মাহিন ও ১৯৭০ সালের ১৪ ডিসেম্বর দ্বিতীয় কন্যা তুহিনের জন্ম হয়। এরপর পরিবারসহ তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে বাস করতে থাকেন। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানিদের তিনি মনে প্রাণে ঘৃণা করতেন। বন্ধু-বান্ধব, অন্যান্য সহকর্মীদের প্ররোচনা এবং লোভনীয় প্রস্তাব সত্ত্বেও তিনি কোনও পাকিস্তানি মেয়েকে বিয়ে করেননি। এমনকি বন্ধুবান্ধবদেরও এই কর্ম করা থেকে বিরত থাকতে পরামর্শ দিতেন। সন্তান রাযাতে উর্দুভাষী না হয় এবং উর্দু সংস্কৃতির শিক্ষা না পায়, এর জন্য তিনি টাকা পয়সার দিকে না চেয়ে পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাঙালি কাজের লোক নিয়ে গেছেন। রিসালপুরে দুইবছর প্রশিক্ষক পাইলট হিসেবে কাজ করার পর ১৯৭০ সালে জেট ফ্লাইং প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেন মতিউর।
এদিকে পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি ক্রমেই ভিন্ ্নদিকে মোড় নিতে থাকে। সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে রাজি হয় না। নানান টালবাহানায় সময়েক্ষেপন করতে থাকে আর সামান্যতম ছলছুতায়ও বাঙালির ওপর গুলি চালিয়ে মানুষ হত্যা করতে থাকে। ১৯৭১ সালের জানুয়ারি মাসে মতিউর স্ত্রী-কন্যাদের পূর্ব পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেন। জানুয়ারির শেষ দিকে তিনিও এক মাসের ছুটি নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন। ছুটি শেষ হলেও তিনি ১ মার্চ পশ্চিম পাকিস্তানে ফিরে যেতে অনীহা প্রকাশ করেন।
৩ মার্চ বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে পল্টন ময়দানের এক বিশাল সমাবেশে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করা হয়, বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে ভাষণ দেবেন বলে ঘোষণা দেন। মতিউর রহমান সিদ্ধান্ত নেন ৭ মার্চের এই সভায় উপস্থিত থাকবেন এবং পরবর্তীতে ভেবে করণীয় ঠিক করবেন।
পশ্চিম পাকিস্তানিরা গোপনে পূর্ব পাকিস্তানে সৈন্য সংখ্যা বৃদ্ধি করতে থাকে। অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ মজুদ করতে থাকে। ২৬ মার্চ শেখ মুজিব স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ২৭ মার্চ রাতে রেডিওতে একটা ঘোষণা শুনে তাঁর মন আনন্দে নেচে উঠল। চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণাটি আবার পাঠ করেছেন।
পরের অংশ আগামীকাল
