বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারির কারণে বিভিন্ন শিল্পের মতো এয়ারলাইনস ইন্ডাস্ট্রির অবস্থাও শোচনীয়। ক্যাথে প্যাসিফিক, কাতার এয়ারওয়েজ, এমিরেটস প্রভৃতি বিশ্বের নামকরা বিমান সংস্থার শত শত বিমান অলস অবস্থায় পড়িয়া রহিয়াছে। ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের মতে, এই কারণে চলতি বত্সর এই শিল্পের ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াইতে পারে ৮ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। ইহারই পরিপ্রেক্ষিতে বিমান ও বিমানবন্দরের উন্নয়ন লইয়া আলোচনা করা বেমানান বলিয়া মনে হইতে পারে; কিন্তু কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখিয়াছেন, ‘মেঘ দেখে কেউ করিসনে ভয়, আড়ালে তার সূর্য হাসে,/ হারা শরীর হারা হাসি, অন্ধকারেই ফিরে আসে’। অর্থাত্ কোনো বিপদই স্থায়ী নহে। দুঃখের পর সুখ আসিবেই। বিশেষজ্ঞরা বলিতেছেন, আগামী এপ্রিলের মধ্যে করোনার বিশ্ব পরিস্থিতি স্বাভাবিক হইয়া আসিতে পারে। এই জন্য এয়ারলাইনস শিল্পের উন্নয়ন এবং নূতন নূতন রুট ও সম্ভাবনা লইয়া এখনই চিন্তাভাবনা করা প্রয়োজন। আমরা যাহাতে করোনার ক্ষয়ক্ষতি দ্রুত কাটাইয়া উঠিতে পারি, এই জন্য মহাপরিকল্পনা লইয়া অগ্রসর হইতে হইবে।
এমন প্রেক্ষাপটে অবহেলিত একটি বিমানবন্দরের উন্নয়ন লইয়া আলোচনার অবতারণা করা অপ্রাসঙ্গিক হইবে না। বিমানবন্দরটির নাম কুমিল্লা বিমানবন্দর। সূত্রমতে, এই বিমানবন্দর চালু থাকিয়াও অচল গত ৪৪ বত্সর ধরিয়া। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪১-৪২ সালে কুমিল্লা নগরীর দক্ষিণ পার্শ্বে নেউরা, ঢুলিপাড়া ও রাজাপাড়ার ৭৭ একর জমি লইয়া প্রতিষ্ঠিত হয় এই বিমানবন্দর। ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত বিমানবন্দরটি অভ্যন্তরীণ রুটে সচল ছিল। ইহার পর এইখানে কেন বিমান উঠানামা বন্ধ হইয়া গেল তাহা কেহ জানেন না। চার দশকের অধিক সময় পরও এখনো ইহা চালু হইতেছে না। অথচ সত্তরে দশকের বাংলাদেশ আর এখনকার বাংলাদেশ এক নহে। আর্থসামাজিকভাবে বাংলাদেশ অনেক দূর অগ্রসর হইয়াছে। মানুষের আয়-উপার্জন বাড়িয়াছে। তাহারা এখন যানজটনির্ভর সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা এড়াইয়া আরামদায়ক ও দ্রুতগতির আকাশপথ ব্যবহার করিতে চাহেন। এক পরিসংখ্যান মতে, শুধু কুমিল্লা জেলার প্রায় ৬০ লক্ষ মানুষের মধ্যে ১৩ শতাংশই থাকেন বিদেশে। দেশের সবচাইতে অধিক প্রবাসী এখন বৃহত্তর কুমিল্লা ও নোয়াখালী অঞ্চলের ছয় জেলার। এই বিমানবন্দরের সন্নিকটেই রহিয়াছে রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (ইপিজেড)। তাই কুমিল্লা বিমানবন্দরটি দ্রুত চালু করা দরকার, যাহাতে প্রবাসী ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সহজে আসা-যাওয়া করিতে পারেন।
আমাদের দেশে যে সাতটি শর্ট টেক অফ অ্যান্ড ল্যান্ডিং (স্টল) বিমানবন্দর রহিয়াছে, তাহার মধ্যে কুমিল্লা বিমানবন্দর একটি। প্রতিদিন এই বিমানবন্দরের সিগন্যাল ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক রুটের ৩৫ হইতে ৪০টি বিমান, যাহার মধ্যে ভারতের পাশাপাশি থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের বিমানও রহিয়াছে। ইহাতে প্রতি মাসে আয় হয় ৩০ লক্ষ টাকা। তবে এইখান হইতে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটে বিমান চলাচল পুনরায় শুরু হইলে আয় বাড়িয়া যাইবে বহুগুণ। এই বিমানবন্দরে নেভিগেশন ফ্যাসিলিটিস, কন্ট্রোল টাওয়ার, ভিএইচএফ সেট, এয়ার কমিউনিকেশন যন্ত্রপাতি, ফায়ার স্টেশন, ফায়ার সার্ভিসসহ সকল সুবিধাই আছে। আছে যাত্রীদের জন্য পৃথক রুম ও বন্দরের অনেক জমিজমা। এখন রানওয়ে মেরামত ও কিছু জনবল নিয়োগ করিলেই কুমিল্লা বিমানবন্দর হইতে অভ্যন্তরীণ রুটের পাশাপাশি কলকাতা, আগরতলাসহ বিভিন্ন রুটেও বিমান চলাচল করিতে পারে। এইজন্য প্রয়োজন মাত্র ২০ হইতে ২৫ কোটি টাকা। এই সামান্য অর্থের জন্য সম্ভাবনাময় একটি বিমানবন্দর কেন অচল অবস্থায় পড়িয়া রহিবে তাহা আমাদের বোধগম্য নহে। যখন বাংলাদেশ এয়ারলাইনস বহরে নূতন ও অত্যাধুনিক যাত্রীবাহী বিমান যোগ হইতেছে এবং বিভিন্ন বিমানবন্দরের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড চলিতেছে, তখন কুমিল্লাবাসীর বহু দিনের দাবি এই বিমানবন্দর শিগিগরই চালুর উদ্যোগ লওয়া হইবে বলিয়া আমরা আশা করি।
