প্রস্তর-ব্রোঞ্জ-লৌহ সভ্যতা পার করিয়া আমরা অত্যাধুনিক ‘প্লাস্টিক’ সভ্যতায় পা রাখিয়াছি। সাধারণ জ্ঞানে যদি প্রশ্ন করা হয়, জৈব-অজৈবনির্বিশেষে সাগর-মহাসাগরের নিচে বিচরণশীল সর্বাধিক দৃশ্যমান বস্তুর নাম কী? উত্তরে হয়তো বলা হইবে মত্স্য জাতীয় প্রাণীর কথা। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলিতেছেন, এমন উত্তরকে এখন আর সম্পূর্ণ ‘সঠিক’ বলা যাইবে না। নূতন উত্তর হইবে—প্লাস্টিক। নূতন আরো একটি তথ্য বিজ্ঞানীদের চমকাইয়া দিয়াছে। তাহা হইল—প্লাস্টিকের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়াছে গর্ভস্থ মানবশিশুর প্লাসেন্টাতে। এমন ঘটনা বিশ্বে প্রথম। জরায়ুতে ভ্রূণকে পুষ্টি জোগান দেওয়ার এই নালিকে বাংলায় গর্ভফুল বলা হয়। অর্থাত্ গর্ভফুলেও হানা দিয়াছে প্লাস্টিক কণা! এই ঘটনায় ইতালির রোমের সান জিওভান্নি ক্যালিবিতা ফাতেবনেফ্রেতেলি হাসপাতালের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ আন্তোনিও রাগুসা বলিয়াছেন, ইহা একটি সাইবোর্গ শিশুর জন্ম দেওয়ার মতো ঘটনা। অর্থাত্ ইহা এমন মানবশিশু যে শুধু মানুষের কোষ দিয়া তৈরি নহে, বরং ইহা জৈব ও অজৈব বস্তুর মিশ্রণ। গর্ভফুলে প্লাস্টিক কণার অস্তিত্ব পাওয়ার বিষয়ে বিজ্ঞানীরা বলিতেছেন, কণাগুলি সম্ভবত মায়েরা খাবারের সঙ্গে খাইয়া ফেলেছিলেন বা তাদের নিঃশ্বাসের মাধ্যমে দেহে প্রবেশ করিয়াছে।
প্লাস্টিকের ব্যবহার শুরু হইয়াছিল ‘বিন্দু’ দিয়া, চার দশকে তাহাই ‘মহাসিন্ধু’তে পরিণত হইয়াছে। বিগত চার দশক ধরিয়া মানুষ উজাড় করিয়া উদারহস্তে যেইভাবে প্লাস্টিক ব্যবহার করিতেছে, তাহারই বাইপ্রোডাক্ট এখন সমুদ্রের নিচে ক্রমশ রাজত্ব কায়েম করিতেছে। গ্রিনল্যান্ড হইতে প্রশান্ত মহাসাগর, ব্রাজিল হইতে দক্ষিণ আফ্রিকার মহাসাগরের বিভিন্ন অংশে ভাসিয়া চলিতেছে এই প্লাস্টিকের আবর্জনা। গবেষণায় দেখা গিয়াছে, প্রশান্ত মহাসাগরে বিশাল এক এলাকা জুড়িয়া বত্সরের পর বত্সর ধরিয়া জমা হইয়া আসিতেছে এই সকল প্লাস্টিক বর্জ্য। মহাসাগরসমূহের উপরে এক পাতলা প্লাস্টিকের চাদর তৈরি হইয়াছে। সূর্য কিরণের প্রভাব এবং দিনের পর দিন ঢেউয়ের ধাক্কায় এই সকল বর্জ্য প্লাস্টিক ভাঙিয়া টুকরা টুকরা হইয়া ক্ষুদ্র টুকরায় পরিণত হয়। আর বিপদ এইখানেই। এই সকল প্লাস্টিকের অধিকাংশই ‘মাইক্রো প্লাস্টিক’ এবং তাহারা পাঁচ মিলিমিটার হইতেও ক্ষুদ্র। এই সকল খুদে প্লাস্টিককেই বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণী খাবার হিসাবে গ্রহণ করিতেছে। তাহা ছাড়া, সাগরতলায় জমিয়া উঠা প্লাস্টিক বর্জ্যের ভিতরেই ডিম পাড়িতে শুরু করিয়াছে সামুদ্রিক প্রাণীরা। প্রশান্ত মহাসাগরের কোনো কোনো এলাকায় ৯ শতাংশের বেশি সামুদ্রিক প্রাণীর পাকস্থলীতে প্লাস্টিক বর্জ্য পাওয়া গিয়াছে। ভয়াবহ কথা হইল, ফি বত্সর মাছেরা যে পরিমাণ বর্জ্য প্লাস্টিকের কণা খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করে, তাহার পরিমাণ ২৪ হাজার টনের অধিক। প্লাস্টিক বর্জ্যের কারণে প্রশান্ত মহাসাগরের উত্তরাঞ্চলে কোনো সামুদ্রিক শৈবাল বিলুপ্তির পথে।
বর্জ্য প্লাস্টিক হইতে নির্গত বিষাক্ত পদার্থ সার্বিকভাবে সমুদ্রের প্রাণীর পরিবেশ প্রতিবেশের শৃঙ্খলা ভাঙিয়া ফেলিতেছে। প্লাস্টিকের বিভাজিত অতি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশ ইতিমধ্যেই প্রকৃতপক্ষে কতটা ক্ষতি করিয়া ফেলিয়াছে, তাহা এখনো কল্পনার বাহিরে। তবে দূষণের ফলে সমুদ্রের প্রাণীদের ঘোর দুর্দিন যে আমাদের অস্তিত্বের জন্যও হুমকি হইয়া দেখা দিবে, তাহাতে সন্দেহ নাই। সম্প্রতি গর্ভফুলে পাওয়া মাইক্রো প্লাস্টিকগুলির বেশির ভাগই ১০ মাইক্রন আকারের। ইহার অর্থ, এইগুলি অনায়াসে রক্তপ্রবাহের মধ্যে ঢুকিয়া যাইতে পারে। সুতরাং ইহা স্পষ্ট যে, নীরবে নিভৃতে প্লাস্টিক সভ্যতা আমাদের ভয়াবহ পরিণতির দিকে লইয়া যাইতেছে। এই ব্যাপারে ব্যক্তি পর্যায় হইতে শুরু করিয়া রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সচেতনতা প্রয়োজন। প্রয়োজন আরো ব্যাপক গবেষণার।
