বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ। প্রকৃতির নিয়মে একের পর এক ঋতুর পালা বদলের খেলা চলে। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরত্, হেমন্তের পর প্রকৃতিতে এসেছে শীতের ছোয়া। শীতের আগমনে কঠিন ঠান্ডা ও কুয়াশা বিরাজ করছে বাংলাদেশের সব জায়গাতেই। শীতের শুরুতেই সারাদেশে হাড় কাঁপানো ঠান্ডা বিরাজমান। অনেকের কাছে শীতটা উপভোগ্য বা রোমাঞ্চকর। কিন্তু সবার কাছে এই শীত সবসময় আনন্দদায়ক বা রোমাঞ্চকর হয়ে ওঠে না। দেশে প্রচণ্ড ঠান্ডায় বাড়ছে ঠান্ডাজনিত রোগব্যাধি। নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে জনসাধারণকে। যার মধ্যে বেশির ভাগ শিকার হচ্ছেন শিশু ও বৃদ্ধরা। শুধু শিশু ও বৃদ্ধরাই না, পাশাপাশি ঠান্ডাজনিত রোগবালাইয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন মধ্য বয়সিরাও। সম্প্রতি দেশজুড়ে শীতের প্রকোপ এতই বেশি যে, যার প্রভাব পড়ছে সবার ওপরেই। বাড়ছে নানাবিধ সমস্যা। টেলিভিশনের পর্দা বা খবরের পাতা খুললেই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে ঠান্ডাজনিত কারণে সর্বস্তরের মানুষ নানাবিধ রোগবালাইয়ে আক্রান্ত। একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে শীতের মৌসুম আসতে না আসতেই মাঝারি শৈত্যপ্রবাহে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বাড়ছে শীতজনিত নানা রোগ। পঞ্চগড়, রংপুর, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের অধিকাংশ স্থানে তাপমাত্রা ৭ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে বিরাজ করছে। প্রচণ্ড ঠান্ডায় গ্রাম ও চরাঞ্চলের ছিন্নমূল ও নিম্ন আয়ের মানুষ কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। বিশেষত শিশু ও বৃদ্ধদের কাহিল অবস্থা চলছে। ঠান্ডা থেকে বাঁচতে অনেকেই খড়কুটোয় আগুন জ্বালিয়ে শরীর গরম করার চেষ্টা করছে। এতে অগ্নিদগ্ধ হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, উত্তরাঞ্চলে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহে জনজীবনে ভোগান্তি বাড়ছে। নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, জন্ডিস, আমাশয়, জ্বর, চর্মরোগ, শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণসহ শীতজনিত নানা রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। গত কয়েক দিনের চিত্র আমরা যদি তুলে ধরি তাহলে দেখতে পাই, গত ১ নভেম্বর থেকে ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে নিউমোনিয়া ও শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ, ডায়রিয়া, আমাশয়সহ নানা রোগে ১ লাখ ৮৬ হাজার ৪৫৯ জন আক্রান্ত হওয়ার খবর। এর মধ্যে জন্ডিস, আমশয়, চোখের প্রদাহ, চর্মরোগ ও জ্বরে আক্রান্ত ৭৮ হাজার ২৯৫ জন। ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে ৭৭ হাজার ৬৬ জন। নিউমোনিয়া ও শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে আক্রান্ত ৩১ হাজার ৯৮ জন এবং গত ২১ ডিসেম্বর আরো প্রায় আড়াই হাজার শিশুসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ আক্রান্ত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, যেসব জীবাণু তাপমাত্রার সঙ্গে সম্পৃক্ত শীতকালে তারা সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে এ সময় মানুষ সর্দি-কাশি, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, হাঁপানি, টনসিলোটাইসিস, ব্রংকিওলাইটিস, সাইনোসাইটিস, বাত, আর্থাইটিস, চামড়ার শুষ্কতার মতো বিভিন্ন ধরনের রোগে আক্রান্ত হয়। এসব রোগ থেকে বাঁচতে হলে শীত এড়িয়ে চলতে হবে। তবে বেশি সমস্যা হলে চিকিত্সকের পরামর্শ নিতে হবে। তবে শুধু শিশু বা বৃদ্ধরাই নয় মধ্যবয়সিরাও আক্রান্ত হচ্ছেন শীতজনিত রোগে। নবজাতক ও শিশুরা বেশি আক্রান্ত হয় ঠান্ডাজনিত সর্দি, কাশি ও জ্বরে। এর মধ্যে আবার কোনো কোনো শিশু আক্রান্ত হয় ডায়রিয়াতে। রোটা ভাইরাসের কারণে আক্রান্ত শিশুদের ডায়রিয়া সারতে সময় লাগছে ছয় থেকে দশ দিন। শীত বাড়লে শিশুদের একিউট রেসপিরেটরি ইনফেকশন (এআরআই) বা তীব্র শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা এবং কোল্ড ডায়রিয়া এ দুটি রোগের আশঙ্কা বেড়ে যায়। তবে সামান্য চিকিত্সায় এসব রোগ ভালো হয়।
সব থেকে বড় কথা হচ্ছে, বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী করোনা ভাইরাস পুনরায় নতুনরূপে তাণ্ডব শুরু করেছে, যার ভয়াবহতায় কাঁপছে দেশ। শীতের এই তীব্রতায় করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে দ্রুত গতিতে সেই সঙ্গে মানুষের ঠান্ডাজনিত সমস্যাগুলোও বাড়ছে। যার দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে বেশি শিশু ও বৃদ্ধরা। কারণ বয়সের কারণে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক কম; যে কারণে অল্পতেই সাধারণ রোগবালাই তাদের আক্রমণ করে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। যেহেতু তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অন্যদের তুলনায় কম সেহেতু তাদেরকে এই তীব্র শীত ও করোনা ভাইরাসের থাবা থেকে রক্ষা পেতে আরো সতর্ক হতে হবে। ডাক্তারের পরামর্শ মোতাবেক চলতে হবে এবং অধিক সতর্কতার সঙ্গে থাকতে হবে। একমাত্র সতর্কতাই পারে তীব্র শীতের এই সময়ে করোনা ও ঠান্ডাজনিত সমস্যাগুলো থেকে সুরক্ষা দিতে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
