করোনা ভাইরাস এমন একটি মহামারি যেটি বিগত সব মহামারিকে ছাপিয়ে গেছে। বিশ্ব জুড়ে করোনার দাপট নাজেহাল করে চলেছে সবাইকে। সর্বপ্রথম এই ভাইরাস শনাক্ত হয় চীনের উহাং প্রদেশে গত বছরের ৮ নভেম্বর। পরবর্তী সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনায়াসে ছড়িয়ে পড়ে। এই ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে লকডাউন, কারফিউ জারি করা হয় পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে। জনসাধারণের স্বার্থে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন নিজ নিজ দেশের সরকার। দুর্ধর্ষ এই ভাইরাস দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সর্বত্র। সংক্রমিত লাখ লাখ মানুষ এবং শেষ পরিণতি মৃত্যু এসবই এই ভাইরাসের কারসাজি। ছোট থেকে বুড়ো কেউই রেহাই পাচ্ছে না এর কবল থেকে।
যেই সময়ে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছিল ঠিক সেই সময়েই দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথম এই নতুন প্রজাতির ভাইরাস দ্বিতীয় দফায় শনাক্তকরণ হয়। আর যুক্তরাজ্যে এই ভাইরাস নতুন রূপে দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়েছে। যুক্তরাজ্যের গবেষক যারা লন্ডন ও আশপাশের এলাকায় যে ভাইরাস সংক্রমণ হতে দেখেছেন, তা করোনা ভাইরাসের নতুন প্রজাতি বলে দাবি করেছেন। বিজ্ঞানিরা বলেন, করোনা ভাইরাস এই পর্যন্ত নিম্নে ১৭ বার পরিবর্তিত হয়েছে মিউটেশনের মাধ্যমে। এসব প্রজাতি অতটা ক্ষতিকারক নয় বলেও জানিয়েছেন। তবে এই নতুন জাতের করোনা ভাইরাস যেটি মিউটেশনের ফলেই রূপান্তরিত হয়েছে, এটি অন্যান্য জাতের থেকে তুলনামূলক বেশি ছোঁয়াচে ও দ্রুতগামী সংক্রামক। এই সম্পর্কে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বলেছেন, ‘নতুন ধরনের করোনা ভাইরাস আগের তুলনায় ৭০ শতাংশ বেশি দ্রুতগতিতে ছড়াচ্ছে। সম্প্রতি দক্ষিণ ইংল্যান্ডে এই ভাইরাস প্রবল বেগে ছড়াচ্ছে। তবে এই ভাইরাসের ভয়াবহতা সম্পর্কে এখনো কিছু জানা যায়নি।’ বরিস জনসন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে সতর্ক করে বলেছেন, ‘ভাইরাস খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। লন্ডনের নতুন করে যারা করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের ৬০ শতাংশই নতুন ভাইরাসের কবলে পড়েছেন।’ জনস্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, রবিবার অর্থাত্ ২০ ডিসেম্বর, ২০২০ সালে এ ভাইরাসে ১ হাজার ১০০ জন আক্রান্ত হয়েছেন। এই ভাইরাসকে প্রতিরোধ করতে বরিস জনসন ঘোষণা করেছেন, ‘লন্ডন এবং দক্ষিণ-পূর্ব ইংল্যান্ডে আগামী ৩০ জানুয়ারি পর্যন্ত লকডাউন থাকবে। শনিবার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘যত দিন যাচ্ছে, ততই এই ভাইরাস সম্পর্কে আমরা বেশি করে জানছি। ভাইরাস যদি চরিত্র বদল করে আক্রমণ করে, তবে আমাদেরও আত্মরক্ষার চরিত্র বদল করতে হবে।’
এরই মধ্যে ইতালি, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানিসহ কয়েকটি দেশে এই নতুন ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। যুক্তরাজ্যফেরত এক জন ইতালিয়ান নাগরিকের দেহে এ ভাইরাস শনাক্ত হয়। পরবর্তী সময় ঐ নাগরিককে কঠোর নজরদারিতে রাখা হয়। ইতালি ও যুক্তরাজ্যফেরত জার্মানি কয়েক নাগরিকের দেহে এ ভাইরাস শনাক্ত হয়।
এই সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ইতালি, ফ্রান্স, কুয়েত, ভারত, জার্মানি, ফিনল্যান্ড, কলম্ব্বিয়া, হংকং, পোল্যান্ড, বুলগেরিয়া, তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশের ফ্লাইট স্থগিত করা হয়েছে। এসব দেশ বিভিন্ন মেয়াদে ফ্লাইট বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে।
যেহেতু এই ভাইরাস তুলনামূলকভাবে বেশি সংক্রমিত হচ্ছে তাই ব্রিটিশ গবেষক, প্রধানমন্ত্রী, স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং অন্যান্য সবাই এ নিয়ে উদ্বিগ্ন। এরই মধ্যে তৈরিকৃত টিকা এই ভাইরাসের ক্ষেত্রে কতটুকু কার্যকর হবে বা আদৌ হবে কিনা তা এই পরিস্থিতিতে বড় প্রশ্ন।
যুক্তরাজ্যে ছড়িয়ে পড়া নতুন প্রজাতির ভাইরাস যে হারে সংক্রমিত হচ্ছে সেই পরিপ্রেক্ষিতে সেই দেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ম্যাট হ্যানকক স্বীকার করেছেন যে, এই ভাইরাসকে নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। যে কারণে নতুন করে প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন লকডাউন ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছেন। যিনি কিছুদিন আগেই বিভিন্ন পরিস্থিতির অনুকূলে আইন শিথিল করার কথা বলেছেন ক্রিসমাসের কথা মাথায় রেখে। অথচ তার ঠিক তিন দিন পরেই বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা শিথিলের পরিবর্তে আরো কঠোর আইন জারি করলেন। ধারণা করা হচ্ছে, এই লকডাউনের মেয়াদ দুই মাস পর্যন্ত বর্ধিত হতে পারে। এই সিদ্ধান্তের পিছনে সবচেয়ে বেশি যেই কারণটি ক্রিয়াশীল তা হলো এই নতুন প্রজাতির করোনা ভাইরাসের দ্রুত সংক্রমণ বিস্তার।
যখন জনজীবন প্রায় স্বাভাবিক অবস্থানে উপনীত হলো, পরিস্থিতি অনুকূল তখন আবার নতুন করে নতুন রূপে এই করোনা ভাইরাসের আগমন সত্যিই উদ্বিগ্নের বিষয়। সামনে এই পরিস্থিতি কীরূপ ধারণ করবে আর তা আমরা কীভাবে প্রতিরোধ করব তা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। নিশ্চয়ই আল্লাহই এর পরিণাম সম্পর্কে অবগত। ইনশাআল্লাহ যাই হবে ভালোই হবে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
