বিষণ্নতা :কারণ ও করণীয়

আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০২০, ২১:৪৯

বিষণ্নতা বা ডিপ্রেশন বর্তমানে একটি প্রচলিত মানসিক সমস্যা। কারো মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি বিষণ্নতা চলতে থাকলে এটি পরবর্তীকালে জটিল মানসিক সমস্যা তৈরি করতে পারে। হুটহাট মন খারাপ হয়ে যাওয়া, দুঃখ বা ক্লেশ একজন মানুষকে পেয়ে বসতেই পারে; কিন্তু সেটা দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকলে ভয়াবহতার দিকে যেতে বাধ্য করে ও ব্যাধি হিসেবে জরাগ্রস্ত করে মনকে। মন ও দেহ যেহেতু অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই মনের সঙ্গে সঙ্গে মানবদেহেও এর লক্ষণ পরিলক্ষিত হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে পৃথিবীর প্রায় ৩০ কোটি মানুষ বিষণ্নতায় ভুগছে। অর্থাত্ আমাদের আশপাশের প্রতি ২৫ জন মানুষের মধ্যে অন্তত এক জন মানুষ পাওয়া যাবে; যে কি না বিষণ্নতায় ভুগছে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই সমস্যাটা জটিলতার দিকে ধাবিত হচ্ছে। বিশেষ করে এই বিষয়টি বিশেষজ্ঞ বা চিন্তাবিদদের নজরে আসে বর্তমানে আরো বেশি। কারণ হিসেবে বলতে পারি, করোনাকালীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বন্ধ। তার সঙ্গে দৈনন্দিন কার্যসূচির ব্যাপক রদবদলের জন্য এমনটা হয়েছে।

তাই প্রথমেই, বিষণ্নতার কারণ শনাক্ত করা প্রয়োজন। সঙ্গে কোনো বিষয় নিয়ে দ্বিধা বা দ্বন্দ্ব থাকলে তা নিরসন করা প্রয়োজন। এরপরে যেদিকে লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন সেটা হলো—যে কোনো মূল্যে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখা। নচেত্ কিছুতেই বিষণ্নতা থেকে মুক্তিলাভ সম্ভব নয়। এ অবস্থায় বিশেষ করে ঘুম, খাওয়া ও শারীরিক ব্যায়ামের প্রতি মনোযোগী থাকতে হবে। নেশা বা বেশি রাতজাগার অভ্যাস সাধারণত বিষণ্নতা বাড়িয়ে তোলে। তাই চেষ্টা করতে হবে এগুলো পরিহার করা। সঙ্গে পরিমিত পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ ও পর্যাপ্ত ঘুমের প্রয়োজন। আর প্রতিদিন অন্তত ২০-৩০ মিনিটের ব্যায়াম তাত্ক্ষণিকভাবে বিষণ্নতাকে দূরে ঠেলে দেয়। এ কাজটি নিয়মিত কয়েক সপ্তাহ করা গেলে বিষণ্নতা উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসার কথা। জোরে হাঁটা বা দৌড়ানো কিংবা সাঁতার কাটা, অথবা সাইকেল চালানো যেতে পারে। শারীরিক পরিশ্রমের পর মানুষের দেহে ‘এন্ডোরফিন’ নামক হরমোনের প্রভাব বেড়ে যায়, যা মানুষের ভালো লাগাকে নিয়ন্ত্রণ করে। নতুন কিছু করার চিন্তা বা সৃজনশীল চিন্তায় নিমগ্ন থাকা; যা থেকে পাওয়া যেতে পারে সুখানুভূতি। নতুন কোনো কাজ শেখার আগ্রহ কিংবা নিত্যনতুন অভিজ্ঞতা অর্জনের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়াও হতে পারে। প্রত্যেকটা নতুন অভিজ্ঞতাই মানুষকে নতুন আঙ্গিকে ভাবতে শেখায়। বাঁচতে শেখায়। মাঝেমধ্যে এসব ভাবনা থেকে প্রাপ্ত অনুপ্রেরণা, যা নিশ্চিতভাবেই বিষণ্নতা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে। এর বাইরেও মেডিটেশন বা ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী উপাসনা বা প্রার্থনা করা। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনে যুক্ত থাকা। সঙ্গে ভ্রমণে বেরিয়ে পড়াও বেশ কাজে লাগতে পারে। বন্ধুদেরকে সময় দেওয়া, ডায়েরি লেখা, তিক্ত অনুভূতিগুলোকে ভুলে চলমান সমস্যা পুষে না রেখে মোকাবিলা করা ও অতীতের ভালো মুহূর্তের কথা সবসময় স্মরণ করা গেলে বিষণ্নতা থেকে কিছুটা পরিত্রাণ পাওয়া যেতে পারে। এর বাইরেও সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করলে চিকিত্সকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। সবিশেষ বলা বাহুল্য, আমরা মানুষ; সৃষ্টির সেরা জীব ও মানব সম্পদ। বিষণ্নতা কাটিয়ে সুস্থ সুন্দর পরিবেশে সুস্থভাবে সামাজিক হয়ে একে অপরের সঙ্গে বসবাস করব, আগামীর সমাজ, দেশ তথা বিশ্ব সভ্যতা বিনির্মাণে নিজেকে নিয়োজিত করব—এটাই প্রত্যাশা।

n লেখক :শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়