করোনা ভাইরাস। খালি চোখে দেখার উপায় নেই। কিন্তু সেই ভাইরাসই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে মানুষ কি করতে পারবে আর কি করতে পারবে না। কীভাবে জীবন চালালে মানুষ এই সুন্দর পৃথিবীর আলো-বাতাসের স্বাদ পাবে এবং না করলে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে তা জানিয়ে দিয়েছে করোনা।
সংক্রামণের এক বছর হতে চললেও অজানা এই ভাইরাসের সম্পর্কে এখনো অনেক কিছুই অজানা বিজ্ঞানীদের কাছে। অকল্পনীয় ধস নামিয়েছে অর্থনীতিতে। যেন দানবের মতো মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর চেপে বসে আছে। কবে যাবে এবং কোথায় যাবে তার ঠিকানা বা সময় কোনোটাই নেই। তবে ভাইরাস আসার পর প্রকৃতিকে সুন্দর করা বা সামাজিক জীবনে শৃঙ্খলা ফেরার যে আশা ছিল তাও নিঃশেষ হতে চলেছে। এই ভাইরাসের ইতিহাস হয়তো লেখা থাকবে শোক আর কালো কালির মিশ্রণে তৈরি এক নতুন কালিতে, কেবল প্রযুক্তিখাত ছাড়া।
দানবের হানা যেভাবে
স্মরণকালে এমন মহামারির মুখোমুখি হয়নি মানুষ। ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর উহানের স্বাস্থ্য কমিশন নিউমোনিয়া ছড়িয়ে পড়ার কথা জানায়। ৫ জানুয়ারি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই সংক্রান্ত প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সংস্থাটি নতুন এই করোনা ভাইরাসের নাম দেয় সার্স-কোভ-টু। এর থেকে সৃষ্ট রোগের নাম কোভিড-১৯। ১২ জানুয়ারি ভাইরাসটির জিন রহস্য প্রকাশ করে চীন। তখন পর্যন্ত সেটি কিন্তু চীনবন্দিই ছিল। একদিন পরই প্রথমবারের মতো ধরা পড়ে থাইল্যান্ডে। এরপর আর আটকে রাখা যায়নি খুদে সেই দানবকে। বর্তমানে বিশ্বের সব স্থানেই এই ভাইরাসের খবরদারি। এতে গতকাল পর্যন্ত প্রায় ১৮ লাখ মানুষের প্রাণ গেছে। আক্রান্ত হয়েছে ৮ কোটির বেশি।
একটা ব্যাপার পৃথিবীর সবার জন্যই সমান। আমাজনের জঙ্গলে থাকুন বা সিঙ্গাপুরের আকাশছোঁয়া ভবনে থাকুন অথবা গ্রীষ্মকালে যুক্তরাজ্যের রাস্তায় থাকুন। মানুষ মানুষের কাছাকাছি আসলেই ভাইরাসের রমরমা, এই ভাইরাস বাঁচে এক মানুষ থেকে অন্য মানুষের দেহে বাসা বেঁধে। ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের সেন্ট জর্জেসের ড. এলিসাবেটা গ্রোপেল্লি বলেন, এই ভাইরাসের গতিবিধির ওপর নজর রাখা বেশ দুষড়র। কারণ ভাইরাসে আক্রান্ত বহু মানুষের মধ্যে কোনো লক্ষণই দেখা যায় না।
আরো পড়ুন: ‘স্পুটনিক ভি’ ভ্যাকসিন নেবেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন
ভয়াবহ বিশ্বমন্দা, জীবিকায় কুঠারাঘাত
চলতি বছরের মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকে বিশ্বের প্রায় সব প্রধান অর্থনীতিতে বিরাট ধস নেমেছে, যেটাকে বলা হচ্ছে ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের চাইতেও ভয়াবহ। কেউ কেউ বলছেন, ১৯৩০-এর দশকে যে বিশ্ব মহামন্দার সূচনা হয়েছিল, এবারের অর্থনৈতিক সংকট সেটাকেও ছাড়িয়ে যাবে। এর আগের দুটি সংকটে শেয়ার বাজারে দর পড়ে গিয়েছিল ৫০ শতাংশ। ক্রেডিট মার্কেট প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাপক হারে দেউলিয়া হতে শুরু করেছিল। বেকারত্ব ১০ শতাংশ ছাড়িয়েছিল। এই পুরো ব্যাপারটা ঘটেছিল তিন বছর ধরে। কিন্তু করোনার কারণে এমন অর্থনৈতিক ধস নেমেছে মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে। মার্কিন শেয়ার বাজার ২০ ভাগ পড়তে সময় লেগেছে মাত্র ১৫ দিন। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি পাঁচ জনে এক জন কাজ হারিয়েছেন। বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বেই কোটি কোটি মানুষ চাকরি হারিয়ে পথে বসেছেন। অনেকে সন্তানের মুখে খাবার দিতে না পেরে আত্মহত্যাও করেছেন। শিক্ষিত মানুষকে জীবিকার জন্য পথে মানুষের কাছে সাহায্য চাইতে হচ্ছে। মানুষের শিক্ষা জীবন তো অন্তত এক বছরের জন্য হলেও ধ্বংস করে দিয়েছে। শারীরিক দূরত্ব মানুষের মধ্যে সামাজিক দূরত্বও তৈরি করেছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ পূর্বাভাস দিয়েছিল, এবছর বিশ্ব অর্থনীতি সংকুচিত হবে তিন শতাংশ। কিন্তু এর আগে তারা ঠিক পুরো উলটো ধারণা করে বলেছিল যে, এ বছর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটবে তিন শতাংশ। মহামারি দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ব জুড়ে বিভিন্ন দেশের সরকার আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো পরিস্থিতি সামলাতে গিয়ে অগ্নিপরীক্ষার মুখে পড়বে। আর ধনী দেশগুলোর অর্থনীতি ২০২২ সালের আগে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনা যাবে না। নিউ ইয়র্কে অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান মুডির সর্বশেষ অর্থনৈতিক পূর্বাভাস হচ্ছে, করোনা ভাইরাসের ক্ষত ২০২১ সালের অর্থনীতি জুড়েও রয়ে যাবে।
ব্রিটেনের ইউনিভার্সিটি অব সারের গবেষক সাইমন মেয়ারের মতে, আগের অর্থনৈতিক সংকটগুলোর সঙ্গে এবারের সংকটের একটা বড় তফাত্ আছে। অর্থনীতিতে সংকট তৈরি হলে সরকার নিজেই বেশি করে অর্থ খরচ করতে শুরু করে যাতে মানুষের পকেটে টাকা যায় এবং লোকে বেশি জিনিসপত্র কেনা শুরু করে। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙ্গা হয়, মন্দা কাটতে শুরু করে। জন মেনার্ড কিনসের এই অর্থনৈতিক তত্ত্বের সফল প্রয়োগ অতীতে অনেক মন্দার সময় করা হয়েছে। কিন্তু এবারের সংকটের কারণটাই হচ্ছে সরকার নিজেই সব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করে দিয়েছে লকডাউনের মাধ্যমে। প্রধান লক্ষ্য জীবন বাঁচানো।
বিশ্বায়নের কফিনে শেষ পেরেক?
এই মহামারিকে বিশ্বায়নের কফিনে শেষ পেরেক বলে বর্ণনা করছেন কেউ কেউ। ইতিহাসবিদ ইয়োভাল নোয়া হারারির মতে, করোনা ভাইরাস পরবর্তী বিশ্বে আরেকটি বড় প্রবণতা হবে কট্টর জাতীয়তাবাদের উত্থান। প্রত্যেকটি দেশ নিজেকে সুরক্ষিত করতে চাইবে অন্যের মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিয়ে। এরই মধ্যে এরকম ঘটনা অনেক ঘটেছে। ইতালি তো সরাসরি অভিযোগ করেছিল, তার দুর্যোগের দিনে অন্য ইউরোপীয় দেশ পাশে দাঁড়ায়নি। গরিব দেশগুলোর কথা চিন্তা না করে ধনী দেশগুলোর করোনা পরীক্ষার কিট ও ভ্যাকসিন কেনাই এর বড় উদাহরণ। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক স্টিফেন এম ওয়াল্ট ‘ফরেন পলিসি’তে প্রকাশিত এক নিবন্ধে লিখেছেন, এই মহামারি জাতীয়তাবাদকে আরো উসকে দেবে। করোনা পরবর্তী বিশ্ব হবে আগের চেয়ে কম খোলামেলা, কম সমৃদ্ধ এবং কম স্বাধীন।
আরো পড়ুন: আর্জেন্টিনায় পৌঁছেছে রুশ ভ্যাকসিন ‘স্পুটনিক ভি’
প্রকৃতি হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে!
অনেকেই বলেছেন, করোনার কারণে প্রকৃতিই সবচেয়ে লাভবান। আরো বাসযোগ্য হয়েছে পৃথিবী। প্রকৃতির ভাইরাস ধারাই প্রকৃতি নির্মল হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২০ সালে কার্বন নিঃসারণ সাত ভাগ কমেছে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে নতুন রেকর্ড। মানুষের যাতায়াত, বিমানযাত্রা, পর্যটন ইত্যাদি বন্ধ থাকাসহ নানা কারণে কার্বন নিঃসারণ কম হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে ব্যাপক কাজ হলেও প্রকৃতির খুব একটা কাজে আসেনি, যা অবশেষে করতে বাধ্য করেছে করোনা ভাইরাস। মানুষ বাইরে না আসায় অনেক বন্যপ্রাণীকেও বাইরে দেখা গেছে। সমুদ্রের অনেক প্রাণীকে তীরে আসতে দেখা গেছে। তবে লকডাউন খুলে দেওয়ার পর পরিস্থিতি আবার পূর্বের অবস্থায় ফিরে যেতে শুরু করেছে।
ইত্তেফাক/এএইচপি
