নিকলীতে জমির টপ সয়েল যাচ্ছে ইটভাটায়

আপডেট : ২৮ ডিসেম্বর ২০২০, ২১:৩৩

কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলায় অভাবে তাড়নায় ফসলি জমির টপ সয়েল (জমির ওপরের মাটি) বিক্রি করে দিচ্ছেন কৃষক। কৃষকরা জানিয়েছেন, কয়েক দফা ধানের দাম কম থাকায় তাদের লোকসান হয়েছে, যা কার্যত তাদের আর্থিক সক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। নিতান্তই বাধ্য হয়ে সংসার সচল রাখতে তারা মাটি বিক্রি করছেন। এতে অন্তত জমিটা বেঁচে যাচ্ছে। বলা বাহুল্য, এই টপ সয়েলের বেশির ভাগই চলে যাচ্ছে ইটভাটায়। সরেজমিনে নিকলী উপজেলার সদর ইউনিয়নের কুর্শা হাওর, জারুইতলা ইউনিয়নের বড় হাওর ও গুরুই ইউনিয়নের ছেত্রা হাওর ঘুরে দেখা গেছে, শীত মৌসুম থেকেই শুরু হয়েছে ফসলি জমির মাটি বিক্রি। আবাদি জমির মাটি ওপরের অংশ ১০-১৫ ফুট গর্ত করে এসকেভেটর মেশিন দিয়ে কেটে নেওয়া হচ্ছে। নিকলী সদর ইউনিয়নের কুর্শা গ্রামের মনির হোসেন জানান, এক একর বোরো জমিতে ৬০ মণ ধান হয়। ধানের দাম কম থাকায় উত্পাদন খরচ ওঠে না। আর এক একর জমির মাটি বিক্রি করে নগদ পাওয়া যায় ৫০ হাজার টাকা। এজন্য আমি আমার জমির মাটি বিক্রি করে দিয়েছি, এতে অন্যায় কী করলাম। কুর্শা গ্রামের কৃষক সুনামদ্দিন বলেন, এক মাস আগে কুর্শার এক ইটভাটার কাছে ৫০ শতাংশ জমির মাটি ২০ হাজার টাকা দিয়ে বিক্রি করেছি। তারা জমির ওপর থেকে ১০ ফুট গর্ত করে মাটি নেবে। অভাব-অনটনের কারণে মাটি বিক্রি করেছি। একই গ্রামের কাদির জানান, তিনি ১৫ হাজার টাকায় ৫০ শতাংশ ও সিরাজ মিয়া ১৬৫ শতাংশ জমির মাটি ৮৫ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন।

নিকলীতে প্রায় ১৫ বছর ধরে ফসলি জমির মাটি বিক্রি চলছে। তবে এবার হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। এখন নিকলী সদর ইউনিয়ন ও জারুইতলা ইউনিয়নের ২০ শতাংশ কৃষক নগদ টাকার লোভে পড়ে মাটি বিক্রি করছেন। ফসলি জমির মাটি বিক্রি করায় গর্তের সৃষ্টি হয়। এ গর্তের মধ্যে পাঁচ-ছয় বছর কোনো আবাদ হয় না বলে জানান, জারুইতলা গ্রামের কৃষক সাইদুল হক। তিনি বলেন, আমি পাঁচ বছর আগে ২৫ শতাংশ জমির মাটি বিক্রি করেছিলাম। এখন সেই জমিতে আগের অর্ধেক ধানও হয় না।

একটি ইটভাটার এসকেভেটর ড্রাইভার জুমন মিয়া (২৫) বলেন, নিকলীতে তিনটি ইটভাটা রয়েছে। আমরা চারটা এসকেভেটর মেশিন দিয়ে তিনটি ইটভাটার ৩০টি ট্রেইলরে মাটি ভরে দেই। প্রতিটি ট্রেইলর রাতে-দিনে ২০ বার মাটি বোঝাই করে নিয়ে যায়। এতে দৈনিক তিনটি ইটভাটায় ৬০০ ট্রেইলর মাটি নেওয়া হয়। স্থানীয় মেসার্স আলতাফ ব্রিকসের ম্যানেজার লোকমান, মেসার্স কামাল ব্রিকসের ম্যানেজার কাজল মিয়া ও মেসার্স সামিয়া ব্রিকসের ম্যানেজার আবুল হাসিম বলেন, আমরা জোর করে কৃষকের জমির মাটি আনছি না। টাকার বিনিময়ে মাটি কিনে আনছি। নিকলী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বেলায়েত হোসেন বলেন, কৃষকদের সচেতন করার পরও তারা কথা শুনছেন না। জমির উর্বরতা শক্তি মাটি ওপর থেকে ১৫-২০ ইঞ্চির মধ্যে থাকে। জমির ওপরের অংশের মাটি সরিয়ে ফেলায় ঐ জমির উর্বরতা শক্তি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। এ ধরনের জমির উর্বরতা ফিরতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। অনেক ক্ষেত্রে ১০-১৫ বছর সময় লাগে। নগদ টাকার আশায় কৃষকরা জমির মাটি বিক্রি করছেন। এতে সাময়িক তাদের অভাব দূর হলেও কৃষি উত্পাদন ব্যাহত হচ্ছে। আর এসংক্রান্ত কোনো আইন না থাকায় আমরা কিছুই করতে পারছি না। তবে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কর্মকর্তাকে অনুরোধ করা হয়েছে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য। উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আপসিয়া সিয়াত জানান, গত কয়েক দিনে বেশ কয়েকবার অভিযান চালানো হয়েছে। প্রয়োজনে এ অভিযান অব্যাহত থাকবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সামচ্ছুদ্দিন মুন্না বলেন, কোনোভাবেই ফসলি জমির মাটি বিক্রি করা যাবে না। এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে ভূমি কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।