সাত কারণে হালদার পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে

আপডেট : ২৮ ডিসেম্বর ২০২০, ২২:৫৭

দেশের একমাত্র কার্প-জাতীয় মাছের প্রজননস্থল হালদা নদীর পরিবেশ মূলত সাতটি কারণে ধ্বংসপ্রাপ্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন হালদা বিশেষজ্ঞগণ। তবে সম্প্রতি সরকার এই নদীকে ‘বঙ্গবন্ধু মত্স্য হেরিটেজ’ ঘোষণা করায় নদীর পরিবেশ ধ্বংসের সেই সাত কারণ স্থায়ীভাবে দূর হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। বিগত প্রায় দুই দশক ধরে হালদা বিনাশী এই সাত ধরনের অপতত্পরতার বিরুদ্ধে সর্বাত্মক চেষ্টা করছেন চট্টগ্রামের হালদা রক্ষা কমিটি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হালদা রিসার্চ ল্যাবরেটরির বিশেষজ্ঞগণ, পরিবেশবাদী নেতৃবৃন্দ, প্রাণিবিজ্ঞানী ও নদী বিশেষজ্ঞরা। সরকার হালদা নদীকে বঙ্গবন্ধু মত্স্য হেরিটেজ ঘোষণার প্রেক্ষাপটে এ বিষয়ে গত ২২ ডিসেম্বর প্রজ্ঞাপন জারি করেছে মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, এখন থেকে সরকারি গেজেট অনুসারে হালদা নদী ব্যবহারে ১২টি শর্ত কার্যকর হবে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক, হালদা রক্ষা কমিটির সভাপতি এবং চবি হালদা রিসার্চ ল্যাবরেটরির সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. মঞ্জুরুল কিবরিয়া ইত্তেফাককে বলেন, ‘হালদা নদী ধ্বংসের পেছনে যে সাতটি গুরুতর কারণ চিহ্নিত করে প্রশাসনের সহায়তায় সেগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে আসছিলাম, আশা করি হেরিটেজ পরিচালনা কমিটি বা অথরিটি সেগুলো বন্ধ করতে সক্ষম হবে। এতে আমাদেরও সার্বিক সহযোগিতা থাকবে। সরকারি প্রজ্ঞাপনে হালদা নদী ব্যবহারে ১২টি শর্ত কার্যকরের কথা বলা হয়েছে। আমি               মনে করি, এসব শর্তের পাশাপাশি হালদা নদী এবং এই নদীর মাছ, ডলফিন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আরো কিছু আইন প্রণয়নেরও প্রয়োজন পড়বে। ড. কিবরিয়া বলেন, হালদা নদী, মাছ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের জন্য যে সাতটি গুরুতর কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে, সেগুলো হচ্ছে নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, নদীতে বিচরণকারী বিশেষ প্রজাতির ডলফিন মাছ নির্বিচারে নিধন, চুরি করে মা-মাছ শিকার, নদীর উজানে রাবার ড্যামসহ নানাভাবে পানির স্বাভাবিক প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি, নগরী ও উপজেলাসহ নানা স্থান থেকে সংযোগ খালের মাধ্যমে শিল্প ও গৃহস্থালি পদার্থের দূষণ বিস্তার, নদীর পাড়ে মানিকছড়িতে তামাকের চাষ, হালদা থেকে মিঠাপানি উত্তোলন এবং নদীর বুকে ইঞ্জিনচালিত নৌকার বেপরোয়া চলাচল। আশা করা যায়, এসব কারণ এবার নির্মূল হবে। বঙ্গবন্ধু হেরিটেজ হিসেবে হালদা নদী তার আগের রূপ ও পরিবেশ ফিরে পাবে। 

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হালদা নদীকে বঙ্গবন্ধু হেরিটেজ ঘোষণা করে জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ এবং পরিবেশগত মানোন্নয়নের মাধ্যমে রুইজাতীয় মাছের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং গাঙ্গেয় ডলফিনের আবাসস্থল সংরক্ষণের লক্ষ্যে খাগড়াছড়ি জেলার রামগড় ও মানিকছড়ি উপজেলা, চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি, রাউজান, হাটহাজারী উপজেলা এবং নগরীর পাঁচলাইশ থানার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হালদা নদী এবং নদীতীরবর্তী ৯৩ হাজার ৬১২টি দাগের ২৩ হাজার ৪২২ একর জমিকে বঙ্গবন্ধু মত্স্য হেরিটেজ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু মত্স্য হেরিটেজ এলাকায় ১২টি শর্ত কার্যকর হবে। শর্তগুলো হলো :এ নদী থেকে কোনো প্রকার মাছ ও জলজ প্রাণী ধরা বা শিকার করা যাবে না। তবে মত্স্য অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে প্রতি বছর প্রজনন মৌসুমে নির্দিষ্ট সময়ে মাছের নিষিক্ত ডিম আহরণ করা যাবে। প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থল ধ্বংসকারী কোনো প্রকার কার্যকলাপ করা যাবে না। ভূমি ও পানির প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য নষ্ট বা পরিবর্তন করতে পারে এমন সব কাজ করা যাবে না। মত্স্য ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর জন্য ক্ষতিকর কোনো ধরনের কার্যাবলি করা যাবে না। নদীর চারপাশের বসতবাড়ি, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের পয়োপ্রণালি সৃষ্ট বর্জ্য ও তরল বর্জ্য নির্গমণ করা যাবে না। কোনো অবস্থাতেই নদীর বাঁক কেটে সোজা করা যাবে না। হালদা নদীর সঙ্গে সংযুক্ত ১৭টি খালে প্রজনন মৌসুমে (ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই) মত্স্য আহরণ করা যাবে না। হালদা নদী ও এর সংযোগ খালের ওপর নতুন করে কোনো রাবার ড্যাম ও কংক্রিট ড্যাম নির্মাণ করা যাবে না। বঙ্গবন্ধু মত্স্য হেরিটেজ তদারক কমিটির অনুমতি ছাড়া হালদা নদীতে নতুন পানি শোধনাগার, সেচ প্রকল্প স্থাপনের মাধ্যমে পানি উত্তোলন করা যাবে না। পানি, মত্স্যসহ জলজ প্রাণীর গবেষণার ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু মত্স্য হেরিটেজ তদারক কমিটির অনুমতিক্রমে হালদা নদী ব্যবহার করা যাবে। মাছের প্রাক্প্রজনন পরিভ্রমণ সচল রাখার স্বার্থে হালদা নদী ও সংযোগ খালের পানির প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা যাবে না। রুইজাতীয় মাছের প্রাক্প্রজনন এবং প্রজনন মৌসুমে (মার্চ-জুলাই) নদীতে ইঞ্জিনচালিত নৌকা চলাচল করতে পারবে না।