ভাসানচরের পথে চট্টগ্রামে ১৭৭২ রোহিঙ্গা

আপডেট : ২৮ ডিসেম্বর ২০২০, ২৩:০৩

নোয়াখালীর ভাসানচরে যাওয়ার উদ্দেশে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত ১ হাজার ৭৭২ জন রোহিঙ্গা চট্টগ্রামে পৌঁছেছে। নগরীর পতেঙ্গায় বিএএফ শাহীন কলেজের মাঠে তাদের রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। গতকাল সোমবার রাত পৌনে ৮টায় ৩০টি বাসে করে ভাসানচরগামী রোহিঙ্গাদের দ্বিতীয় দল চট্টগ্রাম নগরীর পতেঙ্গায় এসে পৌঁছায়। আজ মঙ্গলবার সকাল ৯টায় তাদের নৌপথে নোয়াখালীর ভাসানচরে নিয়ে যাওয়া হবে বলে জানিয়েছেন নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (বন্দর) অলক বিশ্বাস।

এর আগে প্রথম দফায় গত ৪ ডিসেম্বর কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়া আশ্রয়কেন্দ্র থেকে ১ হাজার ৬৪২ রোহিঙ্গাকে ভাসানচর দ্বীপে নিয়ে যাওয়া হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় দফায় একই আশ্রয়কেন্দ্র থেকে ৪২৭টি পরিবারকে ভাসানচরে নেওয়া হচ্ছে। ভাসানচরগামী ১ হাজার ৭৭২ জন রোহিঙ্গার মধ্যে ১৩০ জন প্রথম দলে যাওয়া রোহিঙ্গাদের আত্মীয়স্বজন।

নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (বন্দর) অলক বিশ্বাস বলেন, কক্সবাজার থেকে ৩০টি বাসে করে রোহিঙ্গারা এসে পৌঁছে। বিএএফ শাহীন কলেজের মাঠে রোহিঙ্গাদের রাতে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার সকাল ৯টায় পতেঙ্গা বোট ক্লাব থেকে তাদের নিয়ে জাহাজ ভাসানচরের উদ্দেশে রওনা দেবে।

এর আগে সোমবার দুপুরে কক্সবাজারের উখিয়া ডিগ্রি কলেজের মাঠ থেকে প্রথম পর্যায়ে রোহিঙ্গাদের বহনকারী ১৩টি এবং দ্বিতীয় ধাপে আরো ১৭টি বাস চট্টগ্রামের উদ্দেশে যাত্রা করে। বাসগুলোর সামনে ও পেছনে র্যাব, পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া পাহারা ছিল।

এ ব্যাপারে নোয়াখালীর পুলিশ সুপার মো. আলমগীর হোসেন জানান, রোহিঙ্গাদের দ্বিতীয় দলের নিরাপত্তায় ভাসানচরে তিন শতাধিক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা আগে থেকেই সেখানে দায়িত্ব পালন করছেন। পর্যাপ্ত সংখ্যক নারী পুলিশও রাখা হয়েছে। দ্বিতীয় দল আসার পর ভাসানচরে ৩ হাজারের মতো রোহিঙ্গা বসবাস করবেন। ৩ হাজার মানুষের জন্য যতটুকু নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা দরকার হবে, আমরা ততটুকু করেছি।

জানা গেছে, আগের মতো উখিয়া ডিগ্রি কলেজ মাঠ এলাকা থেকে বাসগুলো চট্টগ্রামের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। উখিয়ার মূল ক্যাম্প ছাড়াও ৩৪ ক্যাম্প থেকেই ভাসানচরে যেতে ইচ্ছুক রোহিঙ্গারা ট্রানজিট পয়েন্টে রবিবার বিকাল থেকে আসতে শুরু করে। বাকিরা সোমবার সকাল ও দুুুপুরে এসে পৌঁছায়।

টেকনাফ নয়াপাড়া ও উখিয়ার কুতুপালংয়ের নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত ক্যাম্পের মাঝিরা বলেন, এবারে প্রথম যাত্রার উলটো চিত্র দেখা গেছে। আগের বার রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে নিতে অনেক বোঝাতে হয়েছে। কিন্তু ২০ দিনের মধ্যে পালটেছে চিত্র। এবার রোহিঙ্গারা ভাসানচরে যেতে নিজেরাই তালিকায় নাম লিখিয়েছে। ভাসানচরে গত ৪ ডিসেম্বর যাদের আত্মীয়স্বজন গেছে, তাদের কাছে সুযোগসুবিধার খবর শুনেই অনেকেই সেখানে যেতে উতলা।

উখিয়ার লম্বাশিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মাঝি আবুল কালাম বলেন, আমার ব্লক থেকে কয়েকটি পরিবার ভাসানচরে যাচ্ছে। তাদের কাউকে জোর করা হয়নি।

লম্বাশিয়া ক্যাম্পের (ইস্ট) সাবেক মাঝি নুর মোহাম্মদ বলেন, এ ক্যাম্প থেকে বেশকিছু পরিবার ভাসানচরে যাচ্ছে। প্রথম দফায় যারা ওখানে গেছে, তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন সুযোগসুবিধার খবর জেনেছে এরা। এ কারণেই নতুন করে অনেকেই ওখানে যেতে আগ্রহী হয়েছে। তিনি বলেন, যারা যাচ্ছে তারা বলছেন, মিয়ানমার যে তালবাহানা শুরু করেছে তাতে অতিসহসা নিজ দেশে ফেরার কোনো সম্ভাবনা নেই।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে বাংলাদেশের কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ ও বান্দরবানের তমব্রু সীমান্ত দিয়ে মায়ানমারের বাস্তচ্যুত রোহিঙ্গারা প্রবেশ শুরু করেন। সেসময় কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতার শিকার হয়ে ৭ লাখ ৪০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে চলে আসে। নতুন-পুরোনো মিলিয়ে বাংলাদেশে বর্তমানে ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার বসবাস।

রোহিঙ্গাদের নিয়ে ২০১৭ সালের ২১ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘে ৫ দফা প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ২৯ সেপ্টেম্বর নিরাপত্তা পরিষদে প্রথম বারের মতো আলোচনা হয়। ২৩ নভেম্বর বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে প্রত্যাবাসন চুক্তি সই হয়।