১৯৬৩ সালের কথা। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের নয়ারহাটে বংশী নদীর ওপর এবং গাবতলীর সেতু তখনো নির্মিত হয়নি। ফেরিতে এ দুটি নদী পার হয়ে দুটি বাস বদল করে তৃতীয় বাসে চড়ে বাড়ি থেকে ঢাকায় পৌঁছাতে হতো। ঢাকা বলতে তখন গুলিস্তানকেই বোঝাত। গুলিস্তান থেকে নারায়ণগঞ্জে যাতায়াত ব্যবস্থার কথা না হয় না-ই বললাম। ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জে গমন অনেকটা বিদেশযাত্রার মতোই মনে হতো। সেই নারায়ণগঞ্জে মেজো ভাই জালাল উদ্দিনের ছিল পাটের বিশাল ব্যবসা। সপ্তাহ কিংবা দুই সপ্তাহান্তে তিনি বাড়ি আসতেন। প্রতিদিন তিনি যে পত্রিকা কিনতেন, বাড়ি আসার সময় সবগুলো পত্রিকা গুছিয়ে নিয়ে আসতেন। একদিন ভাইয়ের আনা পত্রিকাগুলো থেকে একটি পত্রিকা পড়ি। পত্রিকাটির নাম ছিল দৈনিক ইত্তেফাক। ঐ পত্রিকার একটা লেখা পড়ে আমার খুব ভালো লাগে। সেই ভালোলাগা থেকে আমার মধ্যে পত্রিকা পাঠের প্রবল একটা আগ্রহ সৃষ্টি হয়। মেজো ভাই বিষয়টা বুঝতে পেরে প্রতিবার বাড়ি আসার সময় আর যাই হোক, আমার জন্য পত্রিকা আনতে ভুল করতেন না। আমিও আগ্রহ আর উদ্বিগ্নতা নিয়েই ভাইয়ের বাড়ি আসার অপেক্ষায় থাকতাম। মেজো ভাইয়ের বাড়ি আসাটা আমার কাছে ভীষণ একটা আনন্দ উত্সবের মতোই মনে হতো। এভাবেই আমি দৈনিক ইত্তেফাকের একজন নিয়মিত পাঠক ও ভক্ত বনে যাই। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার সেই ভাই ব্যবসা ছেড়ে বাড়ি চলে আসেন। মুক্তিযুদ্ধকালে বেশ দীর্ঘ সময়ের জন্য আমার ইত্তেফাক পাঠ ব্যাহত হয়। তবে ইত্তেফাকের প্রতি আকর্ষণ ও আগ্রহের কোনো কমতি হয়নি। যুদ্ধকালীন বিরতীর পর আবার শুরু হয় ইত্তেফাক পাঠ। শিক্ষাজীবনের শেষের দিকে ১৯৭৩ সালে সমাজকর্মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লেও ইত্তেফাকের সঙ্গে সখ্য বিচ্ছিন্ন হয়নি। অদ্যাবধি অব্যাহত ধারায় ইত্তেফাক পড়ছি। ইত্তেফাক আর এক কাপ চা না হলে সকালটা যেন জমেই ওঠে না। ইত্তেফাক আমার জীবনে অনেক উপকারে এসেছে। ইত্তেফাক পড়ে অনেক নির্দেশনা পেয়েছি, যা আমার শিক্ষা ও কর্মজীবনে অনেক কাজে লেগেছে। বর্তমানে আমি একটি সামাজিক সংগঠনের প্রধান হিসেবে সমাজসেবা করছি। দেশের বিভিন্ন স্থানে আমাদের ৮০টি আঞ্চলিক ও শাখা কার্যালয় রয়েছে। প্রধান কার্যালয়সহ প্রতিটি কার্যালয়ে শুরু থেকেই নিয়মিত ইত্তেফাক রাখছি। ইত্তেফাক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে সংবাদ প্রচার করে আমাদের অনুপ্রাণিত করছে। আমরা ইত্তেফাক শুধু পাঠই করছি না, নানা ধরনের বিজ্ঞাপন, সার্কুলার এবং ঘোষণাও আমরা এই পত্রিকার মাধ্যমে প্রচার করে আসছি।
প্রথিতযশা ও কিংবদন্তি সাংবাদিক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এদেশের প্রাচীন ও ঐহিত্যবাহী পত্রিকা দৈনিক ইত্তেফাক এদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। এমন একটি কালজীয় পত্রিকা প্রতিষ্ঠা ও সম্পাদনার মাধ্যমে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার জগতে অসামান্য অবদানের জন্য প্রয়াত সাংবাদিক ও সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি। সেই সঙ্গে ইত্তেফাক গ্রুপের সফলতা কামনা করে জ্ঞাপন করছি আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা।
ইত্তেফাক আরো তথ্যবহুল সংবাদ প্রচার করবে, আরো সমৃদ্ধি অর্জন করে সংবাদপত্রের জগতে সগৌরবে অনন্তকাল মাথা উঁচু করে টিকে থাকবে, একজন ভক্ত ও পাঠক হিসেবে এটা আমার মুজিববর্ষের প্রত্যাশা।
n লেখক :শিল্প উদ্যোক্তা ও সমাজ সেবক
