শিশুশ্রমে ঝুঁকছে শিক্ষার্থীরা

আপডেট : ২৯ ডিসেম্বর ২০২০, ২১:৫৫

করোনায় স্কুল বন্ধ

অনিল চন্দ্র রায়, ফুলবাড়ী (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা

বিগত বছরগুলোতে শিশু শিক্ষার্থীরা নিয়মিত স্কুলে আসা-যাওয়া ও খেলাধুলা করে ব্যস্ত সময় কাটালেও গত ৯ মাস ধরে করোনা মহামারিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়েছে শিক্ষার্থীরা। অন্যদিকে করোনার কারণে উপার্জন কমে যাওয়ায় ফুলবাড়ীর হতদরিদ্র পরিবারগুলো তাদের শিশুদের বিভিন্ন কাজে যুক্ত করছেন। এতে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানের মালিকরা কম পারিশ্রমিকে তাদেরকে নানা কাজে যুক্ত করছেন। এতে প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঝরে পড়া শিশুর সংখ্যা বাড়বে অভিমত শিক্ষকসহ সচেতন মহলের।

দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী হাফিজুর রহমান। উপজেলার দাসিয়ারছড়ার বটতলা এলাকার দিনমজুর ইজ্জত আলীর ছেলে। দুই ভাইয়ের মধ্যে হাফিজুর সবার বড়। ছেলের স্কুল বন্ধ থাকায় পরিবারের আয় বাড়াতে তাকে কালিরহাট বাজারে একটি চায়ের দোকানে দৈনিক ১০০ টাকা মজুরির বিনিময়ে কাজে নিয়োজিত করেছেন। হাফিজুর জানায়, আমি কালিরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ি। করোনায় স্কুল বন্ধ থাকায় গত ১৫ দিন ধরে চায়ের দোকানে কাজ করছি। এখানে মালিক দুই বেলা খাওয়া-দাওয়া দেয়। সঙ্গে দৈনিক ১০০ টাকা দেয়। আমার উপার্জনের টাকা বাবার হাতে তুলে দেই। স্কুল খুললে স্কুলে যাব। হাফিজুরের বাবা ইজ্জত আলী জানান, ‘বাহে আমরা খুবেই গরিব মানুষ। করোনার কারণে আয় কমেছে। তাই ছেলেটাকে মানুষের দোকানে রেখে দিয়েছি। স্কুল খুললে ছেলেকে স্কুলে পাঠানো হবে।’

সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার সীমান্তবর্তী নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের কুরুষাফেরুষা গ্রামে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী এরশাদুল বাদাম বিক্রি করছে। সে জানায়, সংসারে দিনমজুর বাবাই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। সব সময় তার কাজ থাকে না। তাই সে বাদাম বিক্রি করছে। গড়ে দৈনিক ১৫০-২০০ টাকা আয় হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুললে যাবে কি না—এমন প্রশ্নের উত্তরে সে জানায়, স্কুল খুললে স্কুলে যাব। এরশাদুলের বাবা মফিজুর জানান, একজনের আয়ে সংসার চলে না। ছেলের স্কুল বন্ধ তাই ছেলেকে কাজে লাগিয়েছি। উপজেলার বালারহাট বাজারে দেখা গেছে, বাঁশের তৈরি কুলা বিক্রি করছেন বালারহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫ম শ্রেণির শিক্ষার্থী সোহাগ চন্দ্র দাস। বাবা ফজর আলীর মাছের দোকানে মাছ বিক্রি করছেন নাওডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থী রুবেল মিয়া। তার পাশেই মামা সাহেব আলীর মাছের দোকানে মাছ বিক্রি করছেন কাশিয়াবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী খাজা মইনুদ্দিন।

ফুলবাড়ী জছিমিয়া সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক আমিনুল ইসলাম জানান, করোনাকালে কাজের ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে পড়ায় নিম্ন আয়ের মানুষের উপার্জন কমে গেছে। এজন্য তাদের অনেকেই তাদের স্কুল পড়ুয়া সন্তানদের বাড়তি আয়ের আশায় কাজে দিচ্ছে। এসব শিশুদের বিভিন্ন পেশা থেকে ফিরিয়ে আনতে শিক্ষকসহ অভিভাবকদেরও বিশেষ ভূমিকা রাখতে হবে। না হলে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়বে।

এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এরশাদুল হক জানান, বিষয়টি সংশ্লিষ্ট প্রধান শিক্ষকরা আমাকে জানায়নি। কোনো শিশু যদি শিশুশ্রমে নিয়োজিত থাকে তবে সংশ্লিষ্ট প্রাধান শিক্ষকদের দ্বারা মনিটরিং করে তাদেরকে ফিরিয়ে আনা হবে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. তৌহিদুর রহমান জানান, বিষয়টি শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে মনিটরিং করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।