কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ী চ্যানেলে প্রথম বারের মতো জাহাজ ভিড়েছে সেখানে নির্মাণাধীন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত্ প্রকল্পের নির্মাণসামগ্রী নিয়ে। এ চ্যানেল ব্যবহার করেই মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করা হবে। দেশের প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর হিসেবে মাতারবাড়ীতে মাদার ভেসেল ভেড়ার খবরে পুরো কক্সবাজার জুড়ে উচ্ছ্বাস চলছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সহকারী হারবার মাস্টার ক্যাপ্টেন মো. আতাউল হাকিম সিদ্দিকি জানান, গতকাল মঙ্গলবার সকাল সোয়া ১০টার পর পানামার পতাকাবাহী ‘ভেনাস ট্রায়াম্প’ নামের জাহাজটি মাতারবাড়ী বিদ্যুেকন্দ্রের জন্য নির্মিত জেটিতে ভিড়ে। তিনি বলেন, ৫ জানুয়ারি আরেকটি জাহাজ এই চ্যানেল ব্যবহার করে কয়লা বিদ্যুেকন্দ্রের নির্মাণসামগ্রী নিয়ে আসবে। ইন্দোনেশিয়া থেকে মাতারবাড়ীতে আসা ভেনাস ট্রায়াম্পের দৈর্ঘ্য ১২০ মিটার এবং ড্রাফট (জাহাজের ভেসে থাকা অংশের নিম্নপ্রান্ত থেকে ডুবে থাকা অংশের দৈর্ঘ্য) ৫ দশমিক ৩ মিটার। বঙ্গোপসাগর থেকে মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুেকন্দ্র পর্যন্ত চ্যানেলটির দৈর্ঘ্য প্রায় সাড়ে ১৪ কিলোমিটার।
বন্দর সচিব ওমর ফারুক জানান, চট্টগ্রাম বন্দরের সমুদ্রসীমায় অবস্থিত হওয়ায় মাতারবাড়ীর গভীর সমুদ্র এলাকায় পৌঁছানোর পর চ্যানেল ধরে জাহাজটিকে বিদ্যুেকন্দ্রের জেটিতে নিয়ে যান চট্টগ্রাম বন্দরের পাইলটরা। মাতারবাড়ী চ্যানেলে এটিই প্রথম পণ্যবাহী জাহাজ।
মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৭ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকা। এই প্রকল্পে ১২ হাজার ৮৯২ কোটি ৭৬ লাখ টাকা ঋণ দিচ্ছে জাপান। বাকি অর্থের মধ্যে সরকার দিচ্ছে ২ হাজার ৬৭১ কোটি ১৫ লাখ টাকা, পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ দিচ্ছে ২ হাজার ২১৩ কোটি ২৪ লাখ টাকা।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে নেয়া প্রকল্পটি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগ যৌথভাবে বাস্তবায়ন করছে। এর সব নকশা জাপানি বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে হচ্ছে। আগামী ২০২৬ সাল নাগাদ মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরে জাহাজ ভিড়বে বলে আশা করছেন বন্দর কর্মকর্তারা।
এই প্রকল্পের অধীনে সংযোগ সড়কসহ গভীর সমুদ্র বন্দরে ৩০০ ও ৪৬০ মিটার দীর্ঘ দুটি টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে। এর ফলে বড় জাহাজ থেকে সরাসরি পণ্য ওঠানামা সহজ হবে। প্রাথমিকভাবে মাতারবাড়ীতে একটি কনটেইনার টার্মিনাল এবং একটি বহুমুখী পণ্য ওঠানো নামানোর টার্মিনাল হবে। সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন বাড়ার সঙ্গে এই বন্দরের কার্যক্রমও ধারাবাহিকভাবে বাড়বে। গত ২৩ সেপ্টেম্বর এ সমুদ্রবন্দর নির্মাণের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে জাপানি প্রতিষ্ঠান ‘নিপ্পন কোয়ে’র সঙ্গে চুক্তি সই হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ৪০ নটিক্যাল মাইল দূরে মাতারবাড়ীর এই প্রকল্প এলাকা। ১৮০ মিটার চওড়া চট্টগ্রাম বন্দর চ্যানেল দিয়ে বর্তমানে সাড়ে ৯ মিটার ড্রাফটের জাহাজ চলাচল করতে পারে। আর ১৪ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ, ২৫০ মিটার চওড়া এবং সাড়ে ১৮ মিটার গভীরতার (ড্রাফট) মাতারবাড়ী চ্যানেল দিয়ে আট থেকে ১০ হাজার কনটেইনার পরিবহনের উপযোগী জাহাজ ভেড়ানো সম্ভব হবে। ৮০ হাজার টন ধারণক্ষমতার সাধারণ পণ্যবাহী জাহাজও সেখানে ভিড়বে।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা বলেন, একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বিশাল ভূমিকা রাখে সমুদ্রবন্দর। সেখানে গভীর সমুদ্রবন্দর মানে আরো একধাপ এগিয়ে যাওয়া। দেশের অগ্রগতির পাশাপাশি যে এলাকায় বন্দর স্থাপিত হয় সেই এলাকাও সবদিক দিয়েই সমৃদ্ধ হয়।
কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পৌর মেয়র মুজিবুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকার বাংলাদেশকে একটি উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে বিভিন্ন বাস্তবমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
