গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার সুফল মিলছে :প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ২৯ ডিসেম্বর ২০২০, ২২:৩২

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আওয়ামী লীগ দেশে গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে জনগণের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করেছে বলেই দেশ উন্নয়নের ধারায় ফিরতে পেরেছে এবং জনগণ যার সুফল পাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনতার ক্ষমতা জনতার হাতে আমরা ফিরিয়ে দিতে পেরেছি। যার ফলে আমাদের উন্নয়নের গতিধারা যথেষ্ট সচল হয়েছে। সাধারণ মানুষ, গ্রামের মানুষ তার সুফল পাচ্ছে। তিনি বলেন, পঁচাত্তরে জাতির পিতাকে হত্যার পর বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা ছিল না, হত্যা, ক্যু, ষড়যন্ত্রের রাজনীতি শুরু হয়েছিল। একের পর এক সামরিক শাসকরা ক্ষমতায় এসেছে, ক্ষমতাটা ঐ ক্যান্টনমেন্টের ভেতরেই বন্দি ছিল। যে কারণে উন্নয়নের গতিধারাটা অব্যাহত থাকেনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক                 পরিষদের (এনইসি) সভায় দেওয়া প্রারম্ভিক বক্তব্যে এ কথা বলেন। গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে শেরেবাংলা নগরস্থ এনইসি সম্মেলন কেন্দ্রে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০২১-২০২৫) নিয়ে আয়োজিত সভায় প্রধানমন্ত্রী সভাপতিত্ব করেন। এ সময় তিনি আরো বলেন, জাতির পিতা যে লক্ষ্য ক্ষুধা ও দারিদ্র্য মুক্ত বাংলাদেশ গড়ার, সে লক্ষ্য নিয়েই বর্তমান সরকার কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে এবং বিশ্বের দরবারে আজ বাংলাদেশ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী এ সময় দেশের জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা ব্যক্ত করে বলেন, আমি কৃতজ্ঞতা জানাই বাংলাদেশের জনগণের প্রতি, কেননা তারা আমাদের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস রেখেছে। তারা পরপর তিন বার আমাদেরকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছে বলেই আমরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে পেরেছি। আমরা যেমন পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা নিয়েছি তেমনি ২০১০ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ১০ বছর মেয়াদি প্রেক্ষিত পরিকল্পনাও বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করি। পরবর্তী সময়ে ২০২১ থেকে ২০৪১ সাল পর্যন্ত পৃথক প্রেক্ষিত পরিকল্পনা এবং শতবর্ষ মেয়াদি ডেল্টা পরিকল্পনা-২১০০ প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ২০২১ থেকে ২০৪১ এই সময়ের মধ্যে দেশকে কীভাবে ধাপে ধাপে এগিয়ে নিয়ে যাব সেজন্য আরো কয়েকটি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা আমাদের করতে হবে। যার মধ্যে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা গ্রহণ হয়েছে। আমরা সরকারে থাকি বা যারাই থাকুক তারা যদি এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন, তাহলে বাংলাদেশকে আমরা একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে পারব।

এনইসি সভা শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান সাংবাদিকদের জানান, সরকারের উন্নয়ন রূপকল্প ও নির্বাচনি ইশতেহারের আলোকে পরিকল্পনা নীতির ধারাবাহিকতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়। এছাড়া টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টর (এসডিজি) লক্ষ্যগুলো এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। চলতি ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে শুরু হয়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত এটি বাস্তবায়ন হবে। এনইসি সভায় প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন তুলে ধরে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, তরুণরা যেন দেশের ভেতরেই চাকরি পায় সে ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা কমিয়ে দেশেই কর্মসংস্থান তৈরিতে গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। দেশে আরো অর্থনৈতিক অঞ্চল করা হবে বলেও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন। তাছাড়া আর ফসলি জমি যাতে নষ্ট না হয় সে দিকে খেয়াল রাখতে বলেছেন। এজন্য ইউনিয়নভিত্তিক ভূমি ব্যবহারের পরিকল্পনা তৈরি করতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী।

অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুুমোদন :এনইসি সভায় অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুমোদন দেওয়া হযেছে। সংবাদ সম্মেলনে জিইডির সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম পরিকল্পনার বিস্তারিত সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দ্বিতীয় প্রেক্ষিত পরিকল্পনা (২০২১-২০৪১) বাস্তবায়নের লক্ষ্যে চারটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা তৈরি করা হবে। এর প্রথম পরিকল্পনা হচ্ছে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা। এ পরিকল্পনা দ্বিতীয় প্রেক্ষিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পাশাপাশি টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) এবং বদ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০-এর অভীষ্ট লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এ পরিকল্পনা প্রণয়নে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার বাস্তবায়ন অভিজ্ঞতা এবং অর্থনীতিতে কোভিড-১৯-এর কারণে সৃষ্ট বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা বিশেষভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে (পাঁচ অর্থবছরে) প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৪ লাখ ৯৫ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি খাত হতে অর্থায়ন ধরা হয়েছে ১২ লাখ ৩০ হাজার ১২০ কোটি টাকা (১৮ দশমিক ৯ শতাংশ) এবং ব্যক্তি খাত হতে অর্থায়ন ধরা হয়েছে ৫২ লাখ ৬৫ হাজার ৮৬০ কোটি টাকা (৮১ দশমিক ১ শতাংশ)। অর্থ সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে অভ্যন্তরীণ উত্স হতে অর্থায়ন ৫৭ লাখ ৪৮ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা (৮৮ দশমিক ৫ শতাংশ) এবং বৈদেশিক উত্স হতে অর্থায়ন ধরা হয়েছে ৭ লাখ ৪৭ হাজার ৫৯০ কোটি টাকা (১১ দশমিক ৫ শতাংশ) ।

ড. শামসুল আলম জানান, অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নকালে বার্ষিক গড় জিডিপি (মোট দেশজ উত্পাদন) অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৮ শতাংশ হারে। পরিকল্পনার শেষ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে ৮ দশমিক ৫১ শতাংশ। ২০২৫ সাল নাগাদ কর জিডিপির অনুপাত বর্তমানের ৮ দশমিক ৯০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১২ দশমিক ৩০ শতাংশ করা হবে। রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং বাণিজ্য শুল্কের ওপর নির্ভরতা কমাতে এই দুই লক্ষ্য অর্জনের জন্য রাজস্ব আইন অধিকতর সংস্কার এবং কর প্রশাসনে আধুনিকায়ন ও শক্তিশালীকরণে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

পরিকল্পনার কিছু অর্থনৈতিক সূচকের বিষয়ে তিনি জানান, পাঁচ বছর পর দারিদ্র্যের হার ১৫ দশমিক ৬ শতাংশে ও অতি দারিদ্র্যের হার ৭ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে আসবে। পাঁচ বছরে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে ১ কোটি ১৩ লাখ, যার মধ্যে বৈদেশিক কর্মসংস্থান হবে ৩২ লাখ ৫ হাজার এবং দেশের শ্রমবাজারে যুক্ত হবে ৭৮ লাখ শ্রমশক্তি। মেয়াদান্তে প্রত্যাশিত গড় আয়ু ধরা হয়েছে ৭৪ বছর। এছাড়া ২০২১ সালের মধ্যে শতভাগ জনগণকে বিদ্যুত্ সেবার আওতায় আনা এবং মেয়াদান্তে ৩০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদন লক্ষ্য ধরা হয়েছে। এছাড়া অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় কোভিড-১৯-এর প্রভাব মোকাবিলায় বিভিন্ন কৌশল উল্লেখ করা হয়েছে।